নীহারিকা সরকার
আমরা সস্তায় বিশ্বাসী। সস্তার বাড়ি, সস্তার ইট, সস্তার চাল, আর সবশেষে—সস্তার শ্রম। সকালবেলা চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার সময় বা শহরের বুকে মাথা তোলা বহুতল ফ্ল্যাটের দিকে তাকিয়ে আমরা কি একবারও ভাবি, এই ‘সস্তা’র পিছনে আসলে কতটা চড়া দাম চোকাতে হয়েছে কাউকে? সেই দাম টাকার অঙ্কে নয়, চোকানো হয়েছে মানুষের ঘাম, রক্ত আর আজীবনের পরাধীনতা দিয়ে। খাতায়-কলমে আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক, সংবিধান আমাদের অধিকার দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবটা হল, ২০২৬ সালের ঝকঝকে ভারতেও লক্ষ লক্ষ মানুষ মহাজনের ‘অ্যাডভান্স’ বা ‘দাদন’-এর অদৃশ্য শিকলে বাঁধা। তাঁদের স্বাধীনতা মহাজনের খাতায় বন্দি, আর তাঁদের শ্রম বিক্রি হয় জলের দরে।
সম্প্রতি আইনি বিশেষজ্ঞ টিনা কুরিয়াকোস জেকব যা তুলে ধরেছেন, তা আমাদের তথাকথিত ‘সভ্য’ সমাজের গালে সপাটে এক চড়। তিনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন, ব্রিটিশ আমল আর আজকের ভারতের মধ্যে তফাতটা কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায়। আইন পালটাচ্ছে, আইপিসি বদলে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা আসছে, কিন্তু শ্রমিকের কপালে লেখা ‘ক্রীতদাস’ তকমাটা মুছছে না।
দাদনের মরণফাঁদ : উত্তরবঙ্গ থেকে দিল্লি
আমাদের উত্তরবঙ্গের কথাই ধরুন। তরাই-ডুয়ার্সের ধুঁকতে থাকা চা বাগান হোক বা মালদা-দিনাজপুরের প্রত্যন্ত গ্রাম—গল্পটা সব জায়গায় এক। অভাবের সংসার। হঠাৎ কারও অসুখ, মেয়ের বিয়ে বা উৎসবের খরচ। মহাজন বা ফড়ে এসে হাতে গুঁজে দিল দশ-বিশ হাজার টাকা। ব্যাস! ওটাই তার পায়ে পরিয়ে দিল অদৃশ্য শিকল। এরপর সেই টাকা শোধ করতে তাকে পাড়ি দিতে হবে ভিনরাজ্যে—কেরল, তামিলনাডু বা দিল্লির সীমানায় কোনও এক অন্ধকার ইটের ভাটায় বা কারখানায়।
টিনা জেকবের গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, এই দাদন শ্রমিকদের ৯০ শতাংশই আসেন তপশিলি জাতি ও উপজাতি সম্প্রদায় থেকে। অর্থাৎ, আঘাতটা সরাসরি সমাজের সেই অংশের ওপর, যাঁদের আমরা বরাবরই প্রান্তিক করে রেখেছি। অভাবের সুযোগ নিয়ে দালালরা তাঁদের ‘শহরের ভালো চাকরি’র স্বপ্ন দেখায়। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর পর দেখা যায়, স্বপ্নটা আসলে এক ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন। দিনে ১৪-১৫ ঘণ্টা হাড়ভাঙা খাটুনি, জুট মিলের ধুলো বা কেমিকেল কারখানার বিষাক্ত বাতাস—বিনিময়ে মেলে সামান্য খোরাকি আর অকথ্য গালাগাল। পালাবার পথ নেই, কারণ আপনি তো ‘ঋণী’। মহাজনের খাতায় সুদের অঙ্ক বাড়তে থাকে চক্রবৃদ্ধি হারে, যা শোধ করতে গিয়ে বাবার ঋণ ছেলের ঘাড়ে, ছেলের ঋণ নাতির ঘাড়ে গিয়ে পড়ে। একেই বলে বংশানুক্রমিক দাসত্ব।
আইনের গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাওয়া বিচার
এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, দেশে তো আইন আছে। নতুন ভারতীয় ন্যায় সংহিতা এসেছে। সরকার দাবি করছে, মানব পাচার বা ট্রাফিকিং রুখতে বিএনএস-এর ১৪৩ ধারা অনেক বেশি শক্তিশালী। কিন্তু সমস্যাটা আইনের ধারায় নয়, সমস্যাটা আইনের প্রয়োগে এবং মানসিকতায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুলিশ বা প্রশাসন অনেক সময়ই ‘বন্ডেড লেবার’ বা দাদন শ্রমিকদের মামলা নিতে চায় না। কেন জানেন? কারণ ‘বন্ডেড লেবার সিস্টেম (অ্যাবলিসন) অ্যাক্ট, ১৯৭৬’ অনুযায়ী মামলা হলে জেলা প্রশাসনকে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হয়, উদ্ধার হওয়া শ্রমিককে তৎক্ষণাৎ আর্থিক সাহায্য দিতে হয় এবং তার পুনর্বাসনের দায়িত্ব নিতে হয়। প্রশাসনের কাছে এটা একটা ‘ঝামেলা’। তার চেয়ে সোজা হল, মারামারি বা সাধারণ পাচারের মামলা ঠুকে দেওয়া। এতে খাতায়-কলমে কাজও হল, আবার প্রশাসনের ওপর আর্থিক চাপও পড়ল না। টিনা জেকবের কথায়, আমাদের বিচার ব্যবস্থা এই মানুষগুলোর প্রতি সংবেদনশীলই নয়। একজন গরিব শ্রমিক যখন পুলিশের কাছে যায়, তখন পুলিশ তাঁকে ‘ভুক্তভোগী’ হিসেবে না দেখে, অনেক সময় আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখে। নতুন আইনে ‘শোষণ’-এর সংজ্ঞা বিস্তৃত করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু মাঠপর্যায়ে পুলিশ অফিসারের কাছে সেই ব্যাখ্যা কতটা পরিষ্কার, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
পুনর্বাসনের নামে প্রহসন
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি এবং এই লেখার শিরোনামের সার্থকতা লুকিয়ে আছে ‘পুনর্বাসন’ বা রিহ্যাবিলিটেশন-এর বাস্তব চিত্রে। ধরা যাক, কোনও এনজিও বা আদালতের নির্দেশে একদল শ্রমিককে ইটের ভাটা থেকে উদ্ধার করা হল। তাঁদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হল একটা ‘রিলিজ সার্টিফিকেট’ বা মুক্তির শংসাপত্র। সরকার নিয়ম করেছে, উদ্ধারের সঙ্গে সঙ্গে ৩০ হাজার টাকা তাৎক্ষণিক সাহায্য দেওয়া হবে এবং পরে আরও ১ থেকে ২ লক্ষ টাকা পুনর্বাসনের জন্য দেওয়া হবে।
কিন্তু বাস্তব চিত্রটা শুনলে শিউরে উঠবেন। সরকারি তথ্যই বলছে, গত কয়েক বছরে উদ্ধার হওয়া শ্রমিকদের একটা বড় অংশ এক পয়সাও ক্ষতিপূরণ পাননি। অনেকে ৫-৬ বছর ধরে আদালতের চক্কর কাটছেন সেই প্রতিশ্রুত টাকার জন্য। ভাবুন তো, যে লোকটা আজ নরক থেকে উদ্ধার পেল, কাল তাঁর পেটে ভাত জুটবে কোথা থেকে? হাতে টাকা নেই, কাজ নেই, সমাজ তাঁকে গ্রহণ করতে দ্বিধাগ্রস্ত। ফল যা হওয়ার তাই হয়—পেটের তাগিদে সেই শ্রমিক আবার পুরোনো মহাজনের কাছেই হাত পাততে বাধ্য হন। আবার সেই দাদনের ফাঁদ। আবার সেই ক্রীতদাস জীবন। উদ্ধার হওয়ার পরেও যদি খিদে মেটানোর জন্য আবার নিজেকেই বিক্রি করতে হয়, তবে সেই স্বাধীনতার দাম কত? বড়ই সস্তা নয় কি?
আমাদের দায় এবং আগামীর পথ
উত্তরবঙ্গের যে তরুণটি কাজের খোঁজে ভিনরাজ্যে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে গেল, বা যে মেয়েটি পরিচারিকার কাজ করতে গিয়ে আর ফিরল না—তাদের দায় কি আমাদের নয়? ১৯৭৬ সালে আইন তৈরি করে বলা হয়েছিল, বন্ডেড লেবার নিষিদ্ধ। আজ ২০২৬। পঞ্চাশ বছর পার করেও আমরা কেন মাত্র ৩ লক্ষ মানুষকে উদ্ধার করতে পারলাম? যেখানে বেসরকারি হিসেবে সংখ্যাটা কোটির ঘরে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের মজ্জাগত উদাসীনতায়। আমরা সস্তা শ্রম চাই, তাই আমরা প্রশ্ন করি না।
আইনের নতুন মোড়ক বা বিএনএস-এর নতুন ধারা দিয়ে এই গভীর অসুখ সারানো যাবে না। রিলিজ সার্টিফিকেট নামের কাগজটা হয়তো তাকে আইনি স্বাধীনতা দেয়, কিন্তু পেটের খিদে তাকে আবার সেই পুরোনো মহাজনের কাছেই ফিরিয়ে নিয়ে যায়। যতক্ষণ না এই ঘামের সঠিক দাম আমরা দিতে পারছি, যতক্ষণ না ‘পুনর্বাসন’ মানে কেবল কাগুজে প্রতিশ্রুতি থেকে বেরিয়ে এসে মাথা গোঁজার ঠাঁই আর নিশ্চিত রোজগার হচ্ছে—ততক্ষণ এই স্বাধীনতা বড়ই ঠুনকো।
মালের চা শ্রমিক মহল্লা থেকে মানিকচকের নদীবাঁধ—মানুষ মুক্তি চায়। কিন্তু সেই মুক্তি যদি হয় কেবলই অনাহারে দিন কাটানোর স্বাধীনতা, তবে সেই স্বাধীনতার কোনও অর্থ নেই। ঘামের দামে কেনা এই সস্তা স্বাধীনতার দিন শেষ হওয়া দরকার। না হলে, আমরা যতই ‘বিশ্বগুরু’ হওয়ার স্বপ্ন দেখি না কেন, আয়নায় নিজেদের মুখ দেখলে সেখানে এক আদিম, অমানবিক সমাজের ছবিই ফুটে উঠবে—যেখানে মানুষের জীবনের চেয়ে ইটের ভাটার ইটের দাম বেশি।
(লেখক সমাজতত্ত্ববিদ)
