হককথাটা বলেছেন প্রকাশ কারাত। নামে কমিউনিস্ট পার্টি হলেও তৎপরতা নিতান্তই ভোটমুখী। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) মতো শতবর্ষ পুরোনো হলেও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি তুলনায় পিছিয়ে যাচ্ছে বলে মানছেন কারাত। ২৪তম পার্টি কংগ্রেসের আগে দলের ক্ষয়রোগের কারণটা চিহ্নিত করেছেন সিপিএমের এই তাত্ত্বিক নেতা। বিজেপি ও আরএসএসের বিরোধিতাকে নির্বাচনি লড়াইয়ের সঙ্গে এক করে ফেলার জন্য বাম দলগুলির এমন শোচনীয় দশা হয়েছে।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে প্রকাশ সঠিকভাবে বলেছেন, সংঘের কাজ শুধু নির্বাচনকেন্দ্রিক নয়। স্বয়ংসেবকরা এবং সংঘ পরিবারের বিভিন্ন সংগঠন ভোট থাকুক না থাকুক, নিরবচ্ছিন্ন কাজ করে চলে বছরভর। সেই কাজ মূলত সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে। কোথাও কোথাও অর্থনীতির কিছু বিকল্প ক্ষেত্র প্রস্তুতেও তাদের তৎপরতা আছে। এই কাজের মধ্যে দিয়ে গোদা বাংলায় যাকে মগজধোলাই বলে, সেটাই করে চলেছে আরএসএস।
ধর্মীয় অনুশাসন শুধু নয়, হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে জনমত সংগঠিত করে চলেছে প্রতিদিন। দেশজুড়ে বিস্তৃত আরএসএসের শাখা ছাড়াও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, হিন্দু জাগরণ মঞ্চ ইত্যাদি সংগঠনগুলি সেই কাজে নিযুক্ত। কাজটির প্রধান লক্ষ্য সাধারণ মানুষের চেতনার সঙ্গে হিন্দুত্ব জুড়ে দেওয়া। সিপিএম শুধু নয়, সব বাম দল অতীতে বাম মতাদর্শকে মানুষের চেতনার সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার কাজ করত বছরভর। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে সেই চেতনায় শান দেওয়ার কাজটা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে ছিল।
বাম দলগুলির ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া, বিভিন্ন রাজ্যে ক্ষমতাসীন হওয়া শুরু হতে সেই কাজে ভাটা পড়েছিল। সিপিআই একসময় ইউপিএ সরকারের শরিক হল। সিপিএমের একাংশ জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী করার জন্য মরিয়া ছিল। সংসদীয় গণতন্ত্রের আবর্তে নিজেদের ঠাঁই করে নিতে গিয়ে বাম দলগুলি হয়ে গেল নির্বাচনকেন্দ্রিক। প্রকাশ কারাত যথার্থ বলেছেন, নির্বাচন এলেই শুধু বাম দলগুলি বিজেপি, আরএসএসের বিরুদ্ধাচরণ করে।
সাংস্কৃতিক, সামাজিক কাজের মধ্যে দিয়ে সংঘ পরিবার সমাজে যে মনন তৈরি করছে, তা বিজেপির নির্বাচনি লাভের ক্ষেত্র তৈরি করে। অতীতে থাকলেও বাম দলগুলির এমন কর্মসূচি আজকাল আর চোখে পড়ে না। ফলে সংঘ মানুষের চেতনায় যা ঢুকিয়ে দিচ্ছে, তার মোকাবিলায় বামেদের অস্ত্র বলে কিছু আর নেই। যে কারণে অতীতে এগিয়ে থাকলেও সংঘের সমবয়সি কমিউনিস্ট দল এখন বহু যোজন পিছিয়ে।
এই পিছিয়ে পড়ার কারণে বাংলায় তৃণমূলের মোকাবিলার নামে রাম-বাম ঘনিষ্ঠতার মানসিকতা তৈরি হয় নীচুতলায়। যে কারণে বাম ভোট চলে যায় বিজেপির ঝুলিতে। সেই চলে যাওয়া ভোটের সবটা আর ফেরাতে পারেনি বামেরা। বরং সেই সমর্থনের কিছু অংশ এখন রামনামে বিভোর। বামেদের পায়ের তলার জমি ফেরত আনতে সেটা অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা। চেতনার গোড়ায় ধাক্কা দিতে না পারলে সেই অন্তরায় দূর করা খুব কঠিন।
সিপিএমের ২৪তম পার্টি কংগ্রেসে মূল আলোচ্যর অন্যতম সর্বভারতীয় রাজনীতিতে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা ফেরানো। ভোটসর্বস্ব রাজনীতিতে যে সেই লক্ষ্যসাধন সম্ভব নয়, প্রকাশ কারাত সোজা ভাষায় সেকথা বলে দিয়েছেন। তাঁর কথায় সংঘের বিরোধিতা কতখানি অন্তঃসারশূন্য, তা বেআব্রু হয়ে গেল। নেতা হিসেবে ভুলত্রুটি ধরিয়ে প্রকাশ দলকে সতর্ক করলেন বটে, কিন্তু এর সংশোধন কোন পথে?
বাস্তবে পথ হাতড়াচ্ছে সিপিএম। ইন্টারনেট যুগে কালস্রোতে গা ভাসিয়ে অন্য অনেক দলের মতো সিপিএম নেতা-কর্মীদের রাগ, ক্ষোভ, বিদ্রোহ যতটা সোশ্যাল মিডিয়ায় ধ্বনিত হয়, পথে ততটা নেই। মাছ যেমন জলে থাকে, বামেদের তেমনই মানুষের মধ্যে থাকার আপ্তবাক্যটি অসার হয়ে আছে। মাদুরাইয়ের পার্টি কংগ্রেসে যতই আলোচনা হোক, নেতা-কর্মীদের মনন জগতে বিলাসী রাজনীতি গেড়ে বসে থাকলে, সিপিএমের সাধ্য নেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার। গলদ যে গোড়াতেই।
