সুরের মোহনায় লুকিয়ে থাকে প্রকৃতির কঠোর নিয়ম, পরজীবী মাতৃত্বের নির্দয় বাস্তবতা।
সঞ্চারী ভট্টাচার্য
বসন্তের প্রকৃতিতে যখন পলাশ, শিমুল আর কৃষ্ণচূড়া রঙের আগুন ছড়ায়, তখন তার নেপথ্য সংগীতশিল্পী হয়ে ওঠে কোকিল। নাগরিক ক্লান্তি হোক বা গ্রামের উদাস দুপুর, কোকিলের ‘কুহু’ ডাক বরাবরই বাঙালির রোমান্টিক মনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু কবির ভাবাবেগ যেখানে শেষ, জীববিজ্ঞানের নির্মম বাস্তবতা ঠিক সেখান থেকেই শুরু। সুরের জাদুতে যে পাখি আমাদের মুগ্ধ করে রাখে, প্রকৃতির রঙ্গমঞ্চে সে কিন্তু এক নিপুণ খলনায়ক, এক মিষ্টি প্রতারক। বিজ্ঞানের ভাষায় এই আচরণের নাম ‘ব্রুড প্যারাসাইটিজম’ বা বংশ পরজীবিতা। সহজ কথায়, মাতৃত্বের দায়িত্ব এড়িয়ে অন্যের ঘাড়ে নিজের বংশরক্ষার ভার চাপিয়ে দেওয়া। তাই কোকিল আসলে প্রকৃতির এক ঘরছাড়া বাউন্ডুলে, যার জীবনে নিজস্ব ‘নীড়’ বা ‘বাসা’ বলে কিছুই নেই।
প্রশ্ন জাগতে পারে, কেন এই গৃহহীনতা? কেন অন্যের বাসায় চুপিসারে নিজের ডিম রেখে আসার এই চতুর কৌশল? এর উত্তর লুকিয়ে আছে জীবদেহের এক অদ্ভুত রাসায়নিক সমীকরণে। মাতৃত্ব শুধু আবেগ নয়, এর পেছনে রয়েছে হরমোনের জটিল খেলা। পাখিজগতে বাসা বানানো, ডিমে তা দেওয়া বা ছানা বড় করার কাজটি নিয়ন্ত্রণ করে ‘প্রোলাক্টিন’ নামের একটি হরমোন। প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়ালে কোকিলের শরীরে এই হরমোনের পরিমাণ খুবই কম। প্রজননের সময়েও এদের প্রোলাক্টিন এতই সামান্য থাকে যে, বাসা বানানোর পরিশ্রম বা ডিমে তা দেওয়ার ধৈর্য— কোনওটাই এদের থাকে না। ডিমে উত্তাপ দেওয়ার জন্য পাখির পেটের কাছে পালকহীন যে ‘ব্রুড প্যাচ’ তৈরি হয়, হরমোনের অভাবে কোকিলের তা-ও থাকে না। ফলে শারীরিকভাবে কোকিলের পক্ষে ‘মা’ হয়ে ওঠা প্রায় অসম্ভব। এই অক্ষমতাই তাদের এমন কৌশলী ও পরজীবী হতে বাধ্য করেছে।
টিকে থাকার এই লড়াইয়ে কোকিলের প্রধান লক্ষ্য হল কাক। পরিশ্রমী এবং আপাতদৃষ্টিতে চতুর এই পাখিটিই কোকিলের কাছে সবচেয়ে বেশি বোকা বনে। প্রতারণার এই চিত্রনাট্য সাজানো হয় খুব নিখুঁতভাবে। এক্ষেত্রে পুরুষ কোকিল অন্যের মনোযোগ ঘোরানোর কাজটি করে। সে কাকের বাসার আশপাশে উড়ে, চিৎকার করে তাকে বিরক্ত করতে থাকে। নিজের এলাকা বাঁচাতে কাক যখন পুরুষ কোকিলকে তাড়া করতে যায়, ঠিক সেই সুযোগটাই কাজে লাগায় স্ত্রী কোকিল। চোখের নিমেষে কাকের অরক্ষিত বাসায় নিজের ডিম পেড়ে সে উধাও হয়ে যায়। কাকের ডিমের সঙ্গে কোকিলের ডিমের রং ও আকারের এতটাই মিল থাকে যে, কাক বিভ্রান্ত হয়। নিজের অজান্তেই সে পালন করতে থাকে তার চরম শত্রুকে। শুধু কাক নয়, ছাতারে, হাঁড়িচাচা বা ফিঙের মতো পাখিরাও মাঝেমধ্যে কোকিলের এই চাতুরির শিকার হয়।
গল্পের চমক কিন্তু এখানেই শেষ নয়। কোকিলের ডিমে টেস্টোস্টেরন ও কর্টিকোস্টেরনের মতো হরমোন সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি থাকে। তাই এরা জন্ম থেকেই খুব আগ্রাসী হয়। এই হরমোনের প্রভাবেই কোকিলের ছানা অন্য ছানাগুলির আগেই ডিম ফুটে বেরোয় এবং পালক মায়ের আনা খাবারের বেশিরভাগটাই নিজে ছিনিয়ে নেয়। অনেক সময় চোখ না-ফোটা এই সদ্যোজাত কোকিল ছানারা অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে বাসার অন্য ডিম বা ছানাগুলিকে ঠেলে নীচে ফেলে দেয়। নিজের আধিপত্য বজায় রাখার এ এক ভয়ংকর অথচ কার্যকর কৌশল। মানুষের চোখে এটা চরম স্বার্থপরতা বা নিষ্ঠুরতা মনে হলেও, বিজ্ঞানের যুক্তিতে এটাই হল যোগ্যতমের টিকে থাকার লড়াই। বসন্তের দুপুরে যে সুরেলা ডাক আমাদের আনমনা করে তোলে, তার পেছনে যে অস্তিত্ব রক্ষার এমন এক অবিরাম যুদ্ধ চলছে, তা ক’জনই বা জানে! আসলে নৈতিকতার মাপকাঠিতে প্রকৃতিকে বিচার করা যায় না, সেখানে যে কোনও মূল্যে টিকে থাকাই হল শেষ কথা।
(লেখক মাটিগাড়া বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা)
