হুমায়ুন, তুমি কোথা হইতে আসিয়াছ? আদতে গঙ্গাকে করা এই প্রশ্নটা শুনতে বেশ নিরামিষ হলেও উত্তর দিতে মাথা চুলকোতে হবে। কারণ তাঁর উৎসমুখ গঙ্গার মতো একটা নয়, এক গন্ডা। তিনি মোটামুটি বাংলার প্রায় সব দলে পর্যটন করা এক রাজনৈতিক অভিযাত্রী। কংগ্রেস, কংগ্রেস থেকে তৃণমূল, সেখান থেকে বিজেপি, বিজেপি থেকে ফের তৃণমূল। সেখানের একদা মন্ত্রী থেকে অধুনা বিধায়ক। ফলে তাঁর গোড়া খুঁজতে গেলে লোকে হিমসিম খাবে।
২০১১ সালের ভোটে হুমায়ুন জিতেছিলেন কংগ্রেসের টিকিটে। এক বছরের মাথায় তৃণমূল তাঁকে ভাঙিয়ে নিয়ে যায়। ২০১৯ সালে মুকুল রায় তাঁকে নিয়ে যান বিজেপিতে। সেবারের লোকসভা ভোটে তিনি পদ্ম প্রতীকে মুর্শিদাবাদের প্রার্থী হন। তারপরের বছর আবার তিনি তৃণমূলে। এমএলএ হন জোড়াফুলের।
হুমায়ুন, তুমি কার? এ প্রশ্নেও এক কথায় জবাব হয় না। রাজনীতির খেলায় তিনি কখন কার হয়ে ময়দানে নেমেছেন, তা নিয়ে বিস্তর ধন্দ। এ বলছে ও অন্যের হয়ে নেমেছে। কেবল জার্সিটা খুলে রেখে। ও বলছে, তাদের ভোট কাটবে বলে অন্যেরা পিছন থেকে খেলাচ্ছে। যতই হুমায়ুন বলছেন, আমি কারও নই। আমি ২২ তারিখ নতুন দল ঘোষণা করব, ততই তারস্বরে দু’পক্ষ চ্যাঁচাচ্ছে, ওসব মতলব আমরা বুঝি।
আপাতত যুযুধান দুই পক্ষের কাছেই তিনি ঘোর সন্দেহের পাত্র। যত হাঁকডাক করছেন ভরতপুরের এমএলএ, ততটা দম তাঁর আছে কি না, তা নিয়েও জল মাপা চলছে। সবমিলিয়ে অবস্থা গোলমেলে। বাবরি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করার পর হুমায়ুন এখন মিডিয়ার হটকেক। বেশ কিছুদিন ধরে তিনি হুংকার দিচ্ছিলেন, এবার এসপার নয়তো ওসপার করে ছাড়বেন। নানারকম পার্টিবিরোধী কথা বলে আগে তিন-তিনবার শোকজ এবং ক্ষমাপ্রার্থনার পর এবার সেভাবেই ব্যাপারটার ইতি হবে কি না- সবাই যখন ভাবছে, তখন দ্বিগুণ তেজে তিনি সব আসনে প্রার্থী দিয়ে নিজের দলকে ডুবিয়ে দেবেন বলে ঘোষণা করেছেন।
অবস্থা যা দাঁড়াল, তাতে মনে হচ্ছিল শহিদ হওয়ার তাগিদটা তাঁরই বেশি। শেষপর্যন্ত মুর্শিদাবাদে দাঁড়িয়ে নাম না করে নেত্রীকে বলতেই হল হুমায়ুন গদ্দার, বিজেপির তাঁবেদার। কলকাতায় সেই একই সময় সাংবাদিকদের জানানো হল, হুমায়ুন কবীর দল থেকে বহিষ্কৃত। নেত্রীর সভায় এসে সেকথা জানতে পেরে তিনি ফিরে গিয়েছেন। ফিরে গিয়ে তিনি জোরকদমে বাবরি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছিলেন।
৬ ডিসেম্বর তারিখটা যে তাঁর পছন্দের, সেকথা আগেই জানিয়ে রেখেছিলেন। কলকাতা থেকে ৯০২ কিলোমিটার দূরে অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভাঙা হয়েছিল ওইদিনেই। ১৯৯২ সালে। সেই ক্ষত খুঁচিয়ে তুলতেই যে এইদিনটি বাছাই করা হয়েছে, তা নিয়ে সন্দেহের বিশেষ অবকাশ ছিল না। বেশ ঘটা করে লোকজন জড়ো করে অনুষ্ঠান হল।
বাইরের হুজুররা এলেন, কোরান পাঠ হল। রাম মন্দির প্রতিষ্ঠার সময় যেমন মাথায় করে ইট বয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন করসেবকরা, তেমনই হুমায়ুনের সমর্থকরা মাথায় ইট বয়েছেন। হুমায়ুন জানিয়েছেন, প্রোজেক্ট তিনশো কোটির। সে টাকা তাঁর কাছে কোনও ব্যাপারই নয়। সেদিন টাকা উঠেছে। তিন হাজার প্যাকেট বিরিয়ানি খাওয়ানো হয়েছে।
এখন কথা হল, হুমায়ুনের এই কাজে ফায়দা কার? হুমায়ুন তৃণমূলের হয়ে নেমেছেন বলে আঙুল তুলছে গেরুয়া শিবির। বিরোধীদের ভোট কাটতে মুসলিমপ্রধান এই জেলায় এটা তৃণমূলের কৌশল। যাতে সরকারি কাজে ক্ষুব্ধ সংখ্যালঘুদের ভোট কোনও অবস্থায় অন্যদিকে না যায়। সাসপেন্ড হওয়া হুমায়ুনকে নিয়ে তাই মোটেই হইচই করেনি বিজেপি। একেই হিন্দুভোট একত্রে জড়ো করা তাদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। তার উপর বাবরি মসজিদ নিয়ে মাতামাতি করা হুমায়ুন তাদের ঘাড়ে চাপলে সাড়ে সর্বনাশ! উলটো ফল হবে। তাই হুমায়ুনকে তৃণমূলের দিকে ঠেলে দিচ্ছে তারা। প্রচার করছে, হুমায়ুন তৃণমূলের সিক্রেট এজেন্ট।
তৃণমূলের আবার পালটা যুক্তি, যে সংখ্যালঘু ভোটের প্রায় সবটা তাদের দিকে, আগ বাড়িয়ে তাতে ভাগ বসাতে দেবে কেন তারা? বরং মুসলিম ভোট ভাগ করলে লাভ তো বিজেপির। তার উপর বাবরি নিয়ে বেফাঁস বলে সংখ্যালঘু তোষণের অভিযোগ আর নতুন করে গায়ে লাগাতে চায় না তারা। ফলে আগে বারবার নরম মনোভাব দেখালেও এবার আর তিলমাত্র দেরি করেনি তারা। ঘাড় থেকে হুমায়ুনকে নামিয়ে দিয়েছে তড়িঘড়ি।
এ দল সে দল করে বেড়ানো এই নেতাকে মাঝেমধ্যে শোকজ করে রেহাই দেওয়ায় লোকের মনে হয়েছে, হুমায়ুন তাহলে বেশ ক্ষমতা ধরেন। তাঁর নিশ্চয়ই বিরাট প্রভাব। এর আগে হুমায়ুন খোলাখুলি বলেছিলেন, মুর্শিদাবাদে সত্তর ভাগ মুসলিম। তিনি হিন্দুদের তুলে ভাগীরথীতে ছুড়ে ফেলে দেবেন। তারপরেও তাঁকে বেমালুম হজম করেছে তৃণমূল।
আগে পদ ছেড়ে দেওয়ার হুমকি দিলেও হুমায়ুন এখন পুরো ৩৮০ ডিগ্রি ঘুরে জানিয়ে দিয়েছেন, জনতার অনুরোধে তিনি বিধায়ক পদ ছাড়বেন না। কোনওমতেই না। আসলে একটা মসজিদ তৈরির খোলাখুলি বিরোধিতা করা সবার পক্ষেই কঠিন। সংখ্যালঘুদের কোপে কে-ই বা পড়তে চায়। আপত্তি প্রস্তাবিত ওই মসজিদের নাম নিয়ে। নামটা বাবরি কেন? মোগল বংশের আদিপুরুষ জহিরুদ্দিন বাবর পশ্চিমবঙ্গ পর্যন্ত এসেছিলেন এমন কোনও তথ্য তো ইতিহাসের বইতে নেই। তবে এখানে ফৈজাবাদের সেই বিতর্কিত মসজিদ এল কী করে, প্রশ্ন থেকেই যায়। বোঝা যায়, বাবরের নামে মুসলিমদের ভাবাবেগ উসকে দেওয়ার একটা চেষ্টা হয়েছে।
কিন্তু তাতে কাজ হবে কতটা? বাবরের সন্তান হুমায়ুন সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়েছিলেন। মুর্শিদাবাদের হুমায়ুনেরও উচ্চাকাঙ্ক্ষার সিঁড়িতে উঠতে গিয়ে পা হড়কে কীভাবে এবং কবে পতন হয়, নজর থাকবে সেদিকে।
