লেখক শংকরকে চেনে আপামর বাঙালি। কিন্তু তাঁর কর্পোরেট পরিচয় আর স্নেহময় অভিভাবক সত্তার কথা অনেকেরই অজানা। কঠিন সংগ্রাম পেরিয়ে সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছোনো এক কিংবদন্তির সেই না-বলা জীবনের কথা লিখলেন তাঁরই একসময়ের সহকর্মী ডঃ আশিসকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। শংকরের কালজয়ী ‘ব্যান্ডো’ চরিত্রের আসল মানুষের কলমে এ যেন তাঁর পরম শ্রদ্ধেয় ‘বারওয়েল সাহেব’-এর প্রতি এক অকৃত্রিম শ্রদ্ধার্ঘ্য।
প্রখ্যাত সাহিত্যিক মণিশংকর মুখোপাধ্যায় (Mani Sankar Mukherjee), পাঠকসমাজের কাছে যিনি চির আদরের ‘শংকর’ (Shankar), আজ তিনি প্রয়াত। ৯২ বছর বয়সে তাঁর এই প্রয়াণ বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির আকাশে এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করল। এক বর্ণময় জীবনের অবসান ঘটল, যে জীবন নিজেই ছিল আস্ত এক উপন্যাসের চেয়েও রোমাঞ্চকর, ঘাত-প্রতিঘাতে পূর্ণ এবং সাফল্যের চূড়ান্ত শিখরে আসীন। তাঁর এই চলে যাওয়ায় শুধু সাহিত্যজগৎ নয়, কর্পোরেট দুনিয়াও হারাল এক প্রখর পর্যবেক্ষককে। আর ব্যক্তিগতভাবে আমি হারালাম আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ এক অভিভাবককে। সারাজীবন তিনি তাঁর লেখায় বারওয়েল সাহেবের কাছে ঋণের কথা সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করেছেন। আজ এই শোকের দিনে, আমি তাঁকে স্মরণ করছি আমার জীবনের অকৃত্রিম ‘বারওয়েল সাহেব’ হিসেবেই।
শংকরের জীবনসংগ্রামের গল্প রূপকথাকেও হার মানায়। ১৯৩৩ সালে বনগাঁর এক সাধারণ পরিবারে তাঁর জন্ম। পরে বাবার কর্মসূত্রে সপরিবারে চলে আসেন হাওড়ার ব্যাঁটরায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালো মেঘ তখন ঘনিয়ে আসছে। জাপানি বোমারু বিমানের আক্রমণের আতঙ্কে পরিবার ফিরে গেল বনগাঁর নিরাপদ আশ্রয়ে। কিন্তু কিশোর শংকর থেকে গেলেন হাওড়ায়, বাবার কাছে। এরপর এল ১৯৪৭ সাল। একদিকে দেশভাগের যন্ত্রণা আর স্বাধীনতার উন্মাদনা, অন্যদিকে শংকরের জীবনে নেমে এল এক ঘোর অন্ধকার। স্বাধীনতার বছরেই অপ্রত্যাশিতভাবে পিতৃবিয়োগ ঘটে তাঁর। সম্বলহীন, কপর্দকশূন্য এক কিশোরের সামনে তখন রুক্ষ, কঠিন বাস্তব। জীবন তাঁকে খুব অল্প বয়সেই অভাব আর সংগ্রামের সবচেয়ে কঠোর পাঠটি শিখিয়েছিল।
বেঁচে থাকার তাগিদে এবং পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার জন্য সেই কিশোর বয়স থেকেই শুরু হয় তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম। কখনও টাইপরাইটার পরিষ্কার করা, কখনও ছোটখাটো করণিকের কাজ, আবার কখনও হকার্স কর্নারে ঘুরে ঘুরে কাজ খোঁজা। এই প্রবল দারিদ্র্য আর অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের দিনগুলোতেই রিপন কলেজে (বর্তমান সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) পড়ার পাশাপাশি তিনি কাজ নেন কলকাতা হাইকোর্টের শেষ ব্রিটিশ ব্যারিস্টার ফ্রেডরিক নোয়েল বারওয়েলের কাছে। এই বারওয়েল সাহেবই ছিলেন শংকরের জীবনের আসল জাদুকর। এক সাধারণ কেরানি থেকে তাঁকে তিনি সাহিত্যের রাজপথে হাঁটার প্রেরণা জুগিয়েছিলেন। বারওয়েল সাহেবের অকালমৃত্যু শংকরকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। সেই শোক আর সাহেবকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকেই জন্ম নেয় তাঁর প্রথম কালজয়ী উপন্যাস ‘কত অজানারে’। সাহিত্যের জগতে সেটাই তাঁর রাজকীয় আত্মপ্রকাশ। এরপর আর তাঁকে কখনও পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
শংকরের কলম থেকে এরপর একে একে বেরিয়ে এসেছে বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সব রত্ন। তাঁর লেখনীর জাদুতে কর্পোরেট জগতের চেনা ছক, শহুরে মধ্যবিত্তের জীবনসংগ্রাম আর হোটেলের বিলাসবহুল অন্তরালের অন্ধকার দিকগুলো জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ‘চৌরঙ্গী’, ‘সীমাবদ্ধ’, ‘জন অরণ্য’ বা ‘বোধোদয়’-এর মতো অমর সৃষ্টি তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে জনপ্রিয়তার এক অবিসংবাদিত শিখরে। সত্যজিৎ রায়ের মতো কিংবদন্তি পরিচালক তাঁর ‘সীমাবদ্ধ’ এবং ‘জন অরণ্য’ নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। আবার ‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি সিনেমায় স্যাটা বোসের চরিত্রে অভিনয় করে মহানায়ক উত্তমকুমার ইতিহাস তৈরি করেছেন। এই সিনেমাগুলি প্রসঙ্গে শংকর নিজেই একবার বিনীতভাবে বলেছিলেন, ‘সত্যজিৎই আমাকে সকলের কাছে পৌঁছে দিয়েছে, ছড়িয়ে দিয়েছে।’
তবে সাহিত্যিক শংকরের এই সুবিশাল পরিচিতির আড়ালেও তাঁর একটি প্রখর কর্পোরেট পরিচিতি ছিল। সাহিত্যের পাতায় কর্পোরেট দুনিয়ার, সাহেব কোম্পানিগুলোর অন্দরমহলের যে নিখুঁত, বাস্তবসম্মত এবং কখনো-কখনো নির্মম ছবি তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন, তা তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতারই নির্যাস। আর এই কর্পোরেট জগতেই তাঁর সঙ্গে আমার পথ চলা শুরু। আজ এই শোকের দিনে একটা কথা বলতে আর কোনও বাধা নেই। শংকরের বেশ কিছু লেখায় ‘ব্যান্ডো’ নামক যে এক কর্পোরেট চরিত্রের উপস্থিতি পাঠকরা উপভোগ করেছেন, তা আদতে আমার আদলেই গড়া। আমার পেশাগত জীবনের নানা দিক, আমার স্বভাবের নানা রূপ তিনি সুনিপুণভাবে ওই চরিত্রের মধ্যে মিশিয়ে দিয়েছিলেন।
তাঁর সঙ্গে আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত। লেখক হিসেবে তাঁকে জানতাম স্কুলজীবন থেকেই। এমএ পড়ার সময় তাঁর ভাই পিনাকী আমার ব্যাচমেট ছিল। তবে তাঁর সঙ্গে প্রথম চাক্ষুষ আলাপ ১৯৭৯ সালের গ্রীষ্মকালে। সিএমএ-র তরফ থেকে সাহাগঞ্জে একটি বক্তৃতা দিতে গিয়ে তাঁকে প্রথম দেখি। প্রথম আলাপেই তাঁর সেই ভুবনভোলানো হাসি দিয়ে তিনি আমাকে কাছে টেনে নিয়েছিলেন। কিছুদিন পর আমি অর্থনীতিবিদ হিসেবে ডানলপ সংস্থায় যোগ দিই। আমার বসার চেম্বারটি তৈরি হতে সময় লাগবে বলে, আমাকে সাময়িকভাবে ৬২এ ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের দোতলায় পি গুহ সাহেবের চেম্বারে বসতে দেওয়া হয়। পরম সৌভাগ্য, একই ফ্লোরে বসতেন শংকরবাবু। প্রথম দিনই আদর করে চা খাওয়ালেন, আর বললেন লাঞ্চের সময় তাঁর ঘরে যেতে। ডানলপে দুপুরে এক ঘণ্টার লাঞ্চ ব্রেক থাকত। অনেকেই বাড়ি চলে যেতেন, কিন্তু তিনি যেতেন না। তাঁর ঘরে আমার ‘স্ট্যান্ডিং ইনভিটেশন’ ছিল। মাঝে মাঝে অফিসের কাজে বা এমনিই আমাকে নিয়ে রেস্তোরাঁয় খেতে যেতেন। তাঁর সৌজন্যেই সেই সময় কত বিশিষ্ট মানুষের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পেয়েছিলাম! দিব্যেন্দু পালিত, ডঃ সুব্রত সেন, বাদল বসু, সুধাংশু দে, হারাধন চক্রবর্তীর মতো দিকপালরা আসতেন তাঁর কাছে। সাহিত্য ও কর্পোরেট দুনিয়ার এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটত তাঁর ওই চেম্বারে।
তাঁর বিশাল হৃদয়ের ও আশ্চর্য মানবিকতার পরিচয় আমি পেয়েছিলাম ডানলপে যোগ দেওয়ার প্রথম কয়েক দিনের মধ্যেই। আমার একটি মেলের খামের মধ্যে সিনিয়ার সহকর্মী মিস্টার গুহর স্যালারি স্লিপ ছিল, যা আমি নিজের অজান্তেই ভুল করে খুলে ফেলি। পরের দিনই মিস্টার গুহর নিজের চেম্বারে ফেরার কথা। কর্পোরেট জগতে একজন জুনিয়ারের হাতে সিনিয়ারের বেতনের খাম খোলা অবস্থায় থাকাটা কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তা ভেবে আমি চরম অস্বস্তিতে পড়ে যাই। তিনি সবটা শুনলেন এবং আমাকে বিন্দুমাত্র চিন্তা করতে বারণ করলেন। পরদিন আমাকে সঙ্গে করে মিস্টার গুহর কাছে গিয়ে খামটা দিয়ে নির্দ্বিধায় বললেন, ‘খামটা আমি ভুল করে খুলে ফেলেছিলাম।’ মিস্টার গুহ স্বভাবতই তা মেনে নিলেন। আমায় এক চরম অপ্রস্তুত অবস্থা থেকে বাঁচাতে অনায়াসে নিজের ঘাড়ে দোষ নিতে তাঁর একবারও বাধল না! সেই মুহূর্ত থেকে তাঁর প্রতি আমার মনে যে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জন্ম নিয়েছিল, তা আজও বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি।
শুধু অফিসে নয়, সংসার জীবনেও তিনি এক নিবিড় অভিভাবকের মতো আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন। সঞ্চয়ের গুরুত্ব বুঝিয়ে ১৯৮০ সালে আমাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে স্টেট ব্যাংকে পিপিএফ অ্যাকাউন্ট খুলিয়ে দিয়েছিলেন। সাহেব কোম্পানিতে কাজ করার অনেক নিয়মকানুন ছিল, যেমন লাউঞ্জ সুট পরা ছিল আবশ্যিক। সেখানেও তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে একটি মোক্ষম বুদ্ধি দিয়েছিলেন- কোটের তুলনায় প্যান্ট তাড়াতাড়ি ছিঁড়ে যায়, তাই একটি কোটের সঙ্গে একই কাপড়ের দুটো প্যান্ট বানানো দীর্ঘমেয়াদে অনেক বেশি লাভজনক। এমন ছোট ছোট বাস্তবসম্মত পরামর্শ তিনি দিতেন, যা জীবনের অনেকটা পথ মসৃণ করে দিত। মেয়ের নামকরণ, বাবার পারলৌকিক কাজ, নতুন ফ্ল্যাট কেনা- জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপে তাঁর সদর্থক ভূমিকা ছিল।
অফিসের প্রতিদিনের কাজে তাঁর থেকে প্রতিনিয়ত শিখেছি। অফিস শিষ্টাচার, সময়ানুবর্তিতা, ডাইনিং টেবিল ম্যানার্স, জনসংযোগ বা পাবলিক রিলেশন- সব কিছুই তিনি শিখিয়েছিলেন। পরিবর্তনশীল কর্পোরেট পরিবেশে তিনি ছিলেন একজন দক্ষ ‘মাল্টিটাস্কার’। কর্পোরেট দুনিয়া সম্পর্কে তাঁর অমোঘ মন্ত্র ছিল : ‘বস বস্তুটি আগুনের মতো। বেশি দূরে গেলে তাপ পাবে না, কাছে গেলে পুড়ে যাবে!’ পালাবদল এবং কর্পোরেট রাজনীতির ‘আইসবার্গ’ সামলে কীভাবে বিবেক অক্ষুণ্ণ রেখে কাজ করতে হয়, তা তাঁর কাছেই শেখা। পরিবর্তনশীল কর্পোরেট পরিবেশে তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত দক্ষ ‘মাল্টিটাস্কার’।
তিনি আমাকে মন্ত্র দিয়েছিলেন স্বধর্মে থাকার। আমি পড়াতে ভালোবাসতাম, সেটা তিনি জানতেন। তাই সারাদিন অফিসের ক্লান্তি সত্ত্বেও সন্ধ্যায় আইআইএসডব্লিউবিএম-এ এমবিএ পড়ানোর কাজটা তিনি আমাকে কখনও ছাড়তে দেননি। তিনি যেমন তাঁর বারওয়েল সাহেবের কাছে আজীবন ঋণী ছিলেন, তেমনি আমি আজীবন ঋণী আমার এই ‘ইন্ডিয়ান এডিশন’ বারওয়েল সাহেবের কাছে। আজ তিনি সশরীরে আমাদের মধ্যে নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া শিক্ষা, তাঁর অমর সৃষ্টি এবং তাঁর জীবনের অগণিত আদর্শ আমার জীবনের স্থায়ী পাথেয় হয়ে থাকবে। আমার জীবনের সেই পরম শ্রদ্ধেয় মানুষটিকে আজ জানাই বিনম্র প্রণাম ও শ্রদ্ধা।
(লেখক অবসরপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ)
