এসআইআর বিতর্ক: গণতন্ত্রের ভিতেই কি পড়ছে টান?

বৈশিষ্ট্যযুক্ত/FEATURED
Spread the love


এসআইআর-কে ঘিরে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। বৈধ ভোটারের নাম বাদ পড়ার অভিযোগে প্রশ্ন উঠছে- গণতন্ত্রের ভিতেই কি পড়ছে টান? সর্বজনীন ভোটাধিকার রক্ষার লড়াইয়ে এখন নজর নির্বাচন কমিশন ও সুপ্রিম কোর্টের দিকে।

সুতীর্থ চক্রবর্তী: নির্বাচন কমিশনের কর্মী কে. জে. রাওয়ের কথা নিশ্চিত করেই রাজ‌্যবাসী মাত্র দু’-দশকে বিস্মৃত হয়নি। সামান‌্য কেরানি থেকে সচিব পদে উন্নীত হওয়া কমিশনের এই কর্মী পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে কিছু নাম কেটে ২০০৬ সালের বিধানসভা ভোটের সময় মিডিয়ায় ‘হিরো’ হয়েছিলেন। এবার পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে কিছু ভোটারের নাম বাদ দিয়ে মিডিয়ায় খলনায়ক খোদ নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। বিহারের বিধানসভা ভোটের মুখে ভোটার তালিকার ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ তথা ‘এসআইআর’ শুরু হতেই বিরোধীরা রব তুলেছিল– জ্ঞানেশের মূল নিশানায় পশ্চিমবঙ্গ। সময় যত এগিয়েছে, এসআইআর বিরোধিতা তত রাজে‌্যর গণ্ডি পেরিয়ে দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের পর যেন জ্ঞানেশ বিরোধিতার অাগুনে ঘি পড়েছে।

আরও পড়ুন:

পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় ভূতুড়ে ভোটারের অস্তিত্ব অস্বীকার করার নয়। কে. জে. রাওয়ের ‘ভূতুড়ে ভোটার’ তাড়ানোর ক্ষেত্রে সক্রিয়তা কোনও অসত‌্য প্রচারের উপর দাঁড়িয়ে ছিল না। একইভাবে জ্ঞানেশের এসঅাইঅারের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। গণতন্ত্রের স্বার্থেই ভোটার তালিকা থেকে ভূত তাড়ানোর প্রয়োজন ছিল। সেই ভূত তাড়াতে গিয়েই অাপাতত ‘ভোট চুরি’-র অভিযোগে অভিযুক্ত জ্ঞানেশ। জ্ঞানেশের অপসারণের দাবিতে রাজধানী যেভাবে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে– এর পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা সহজে অনুমান করা মুশকিল।

আসলে স্বাধীনতার পর ভারতে যখন সর্বজনীন ভোটাধিকার সুনিশ্চিত করা হচ্ছে, তখন বিশ্বের বহু উন্নত দেশেও এই অধিকার ছিল না। বিশেষত ইউরোপের বহু দেশে তখনও নারীদের ভোটাধিকারই ছিল না। ভারতের গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ঐতিহ্যই হল এই সর্বজনীন ভোটাধিকার। সংবিধান-প্রণেতারা সর্বজনীন ভোটাধিকার সুনিশ্চিত করার জন্য সংবিধান পরিষদে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলেন। জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তিনি এই সর্বজনীন ভোটাধিকারে হাত দিয়েছেন। এসআইআরের নামে কোটি কোটি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দিয়েছেন। এখনও পর্যন্ত এসআইআরে দেশে ১৩ কোটি নাম বাদ গিয়েছে। এই ১৩ কোটি যে ‘ভূতুড়ে’ ও ‘অবৈধ’ ভোটারের নাম, তা মানতে কেউ রাজি নয়। কে. জে. রাও যখন পশ্চিমবঙ্গে নাটকীয়ভাবে ভোটার তালিকা হাতে নিয়ে কিছু বাড়ি ঘুরে নাম কেটেছিলেন, তখন মিডিয়া বা নাগরিক সমাজ প্রশ্ন তোলেনি যে, সেই নামগুলি সতি‌্যই ভূতুড়ে ছিল কি না। কিন্তু জ্ঞানেশের দীর্ঘ ও জটিল এসআইআর প্রক্রিয়ায় নাম বাদ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

দেশের প্রথম মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হয়েছিলেন বঙ্গসন্তান সুকুমার সেন। তঁার দায়িত্ব ছিল সর্বজনীন ভোটাধিকারকে সফলভাবে রূপায়ণ করা। এই সর্বজনীন ভোটাধিকারের জন্য কীভাবে ভোটার তালিকা তৈরি হবে– তা নিয়ে তঁাকে অনেক গবেষণা করতে হয়েছিল। সে সময় ভারতীয় সমাজের যে-চেহারা ছিল, তাতে মহিলাদের ভোটার তালিকায় নাম তোলা ছিল একটি অত্যন্ত কঠিন কাজ। বহু মহিলাই তঁাদের নাম প্রকাশ করতে চাইতেন না। এই চ্যালেঞ্জ উতরোতে গিয়ে সুকুমার সেন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন স্বামীর নামেও মহিলারা তঁাদের নাম ভোটার তালিকায় তুলতে পারবেন। ভোটার তালিকায় ওই মহিলারা নথিভুক্ত হয়েছিলেন ‘অমুকের স্ত্রী’ এই পরিচয়ে।

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গেই দেখা গিয়েছে, বহু মহিলা ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর অর্থ নিতেন স্বামীর ব‌্যাঙ্ক অ‌্যাকাউন্টে। মহিলাদের পক্ষে ব‌্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা এখন কোনও কঠিন কাজ নয়। তবুও লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের অর্থ নেওয়ার জন্য বহু মহিলাকে স্বামীর অ্যাকাউন্ট ব‌্যবহার করতে হয়েছিল। এরও মূলে সামাজিক বাধা। বাড়ির মহিলা সদসে‌্যর নামে ব‌্যাঙ্কে অ‌্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে পুরুষদের অনীহা। রাজ্যে বিজেপি সরকার আসার পর ধরা পড়ে, বহু পুরুষের ব‌্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের অর্থ জমা পড়েছে। তদন্তে দেখা যায়, কিছু পুরুযের নামে ভুয়া অ্যাকাউন্ট ছিল, একথা সত্য। কিন্তু লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের অর্থ বহু ক্ষেত্রে স্বামীর অ‌্যাকাউন্টে গিয়েছে সংশ্লিষ্ট মহিলার ব‌্যাঙ্ক অ‌্যাকাউন্ট নেই বলেই। সরকারের লক্ষ‌্য ছিল কোনওভাবে টাকাটা উপভোক্তাকে পৌঁছে দেওয়া।

প্রথম মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের লক্ষ‌্যটাও ছিল– চেষ্টা করতে হবে যেন দেশের সমস্ত বৈধ ও প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের ভোটাধিকার থাকে। এই দৃষ্টিভঙ্গিটাই হল ভারতের সর্বজনীন ভোটাধিকারের মূল চেতনা। সংবিধানের ৩২৬ নম্বর ধারায় প্রাপ্তবয়স্কদের সর্বজনীন ভোটাধিকারের বিষয়টি উল্লিখিত রয়েছে। অতএব ভোটার তালিকায় দেশের সব প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের নাম না থাকাটা সংবিধানের ৩২৬ নম্বর ধারার উল্লঙ্ঘন। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি উজ্জ্বল ভুঁইয়া এসআইআর বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে এই ৩২৬ নম্বর ধারার কথাই সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তঁার কথায় ভোটার তালিকা থেকে ‘মৃত ব‌্যক্তি’ ছাড়া কারও নাম উপযুক্ত কারণ না দেখিয়ে ও শুনানি না করে বাদ দেওয়াই যায় না। যদি সেটা করা হয়, তাহলে তা সংবিধানের ৩২৬ নম্বর ধারা ও ১৪ নম্বর ধারার পরিপন্থী। ১৪ নম্বর ধারাটি মৌলিক অধিকার। যেখানে বলা হয়েছে অাইনের চোখে সমস্ত নাগরিকের সমান অধিকার।

ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি রোহিনটন নরিম্যানও কয়েক দিন আগে মুখ খুলেছিলেন। তঁারও বক্তব্য, ভোটার তালিকা থেকে কোনও পদ্ধতিতেই লক্ষ লক্ষ মানুষের নাম বাদ দেওয়া যায় না। পশ্চিমবঙ্গে এত নাম বাদ পড়ার পরেও এসআইআর মামলায় সুপ্রিম কোর্ট কোনও কড়া পদক্ষেপ না নেওয়ায় তিনি বিস্ময়প্রকাশ করেছেন। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর বিস্ফোরক রিপোর্টের পর দেশজুড়ে যখন জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলি নতুন উদ্যমে আন্দোলন শুরু করেছে, তখন সেই আবহে এসআইআর নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের মনোভাবেও যে কিছুটা পরিবর্তন আসবে, তা বলাই বাহুল‌্য। ভোটার তালিকায় নাম তোলার আবেদনপত্র ৬ নম্বর ফর্মের নতুন বয়ানে যে তারা কোনওভাবে সম্মতি দেয়নি– সেই কথা সুপ্রিম কোর্ট ইতিমধে‌্য স্পষ্ট করেছে। এসআইআর বাতিল করতে চেয়ে ‘ইন্ডি’ জোটের মামলা নতুন করে সুপ্রিম কোর্টে রুজু হয়েছে। রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের উদ্দেশে মিছিলে যেরকম ভিড় হয়েছে, তাও শীর্ষ আদালতের উপর চাপ।

নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে যে কোনও আন্দোলনের অঁাচ এখন সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের উপরে পরে। যদিও সেটা হওয়ার কথা নয়। সংবিধানপ্রণেতারা দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা করেছিলেন যে, কীভাবে নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণভাবে সরকারি প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা যায়। কারণ, সংবিধানপ্রণেতারা তখনই বুঝেছিলেন যে, নির্বাচন কমিশন যদি সরকারের তঁাবেদার কোনও সংস্থা হয়, তাহলে গণতন্ত্রের মূল উদ্দেশ্যটাই ব্যর্থ হবে। শ্াাসক দল তাদের ইচ্ছামতো কমিশনকে ‌ব‌্যবহার করবে। সংবিধান পরিষদে প্রাথমিকভাবে ঠিক হয়েছিল কোনও কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের বদলে বিকেন্দ্রীকৃত রাজ্যভিত্তিক নির্বাচন কমিশন হবে। তারাই রাজ্যে রাজ্যে লোকসভা ও বিধানসভা ভোট পরিচালনা করবে। কিন্তু বি. আর. আম্বেদকরের প্রস্তাবেই সেই ধারণাটি বাতিল হয়। সংবিধানপ্রণেতারা আশঙ্কা করেছিলেন, নির্বাচন কমিশনার রাজ্যভিত্তিক হলে সেগুলি সরাসরি রাজ্য সরকারের প্রভাবে চলে যাবে। কিন্তু কালক্রমে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনও শাসক দলের তঁাবেতে পরিণত! সুপ্রিম কোর্টে এখন এসঅাইঅারের ভবিষ‌্যতের সঙ্গে বিবেচ‌্য ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের অাইনেও। যে অাইনে কেন্দ্রের শাসক দল নির্বাচন কমিশনকে অারও কুক্ষিগত করেছে বলে অভিযোগ। এই অাইনে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের জন‌্য নিযুক্ত তিন সদসে‌্যর প‌্যানেল থেকে বাদ গিয়েছেন দেশের প্রধান বিচারপতি।

এই মুহূর্তে দেশজুড়ে প্রশ্ন– জ্ঞানেশের অপসারণের দাবিতে অান্দোলনের ভবিতব‌্য কী? জ্ঞানেশ কি চাপের মুখে ইস্তফা দেবেন? সুপ্রিম কোর্ট কী ভূমিকা নেবে? জ্ঞানেশকে অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের নেই, কিন্তু এসঅাইঅার বেঅাইনি ঘোষিত হলে তা জ্ঞানেশের পক্ষে চাপের। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সেপ্রেস’-এর অভিযোগ অনুযায়ী, দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবিন্দর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী সতি‌্য সতি‌্যই জ্ঞানেশের এসঅাইঅার সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলির বিরোধী ছিলেন কি না তা সুপ্রিম কোর্ট খতিয়ে দেখতে পারে। অভিযোগ সত‌্য প্রমাণিত হলে জ্ঞানেশের উপর চাপ অারও বাড়বে। কমিশন তঁাবেতে পরিণত হওয়ায় এখন এর যাবতীয় কাজের দায়ও কেন্দ্রের শাসক দলের উপর বর্তায়। ফলে জ্ঞানেশের ভাগে‌্যর সঙ্গে যে এখন কেন্দ্রীয় সরকারের ভাগ‌্যও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে– তা বুঝতে সমস‌্যা হওয়ার কথা নয়।

আরও পড়ুন:

সর্বশেষ খবর

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *