উন্নয়ন, পরিযান ও নাগরিকত্ব : এক জ্বলন্ত সমীকরণ

উন্নয়ন, পরিযান ও নাগরিকত্ব : এক জ্বলন্ত সমীকরণ

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


জনকল্যাণ ও উন্নয়নের ফাঁক গলে বাড়ছে পরিযান। বিপন্ন হচ্ছে নাগরিক অধিকার, প্রশ্নের মুখে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ।

ক্ষীরোদা রায়

ভারতবর্ষের মতো বিশাল গণতান্ত্রিক দেশে উন্নয়ন, জনকল্যাণ আর পরিযান— এই তিনের সম্পর্ক আজ এক জটিল গোলকধাঁধা। রাষ্ট্র একদিকে সামাজিক সুরক্ষা দিতে নানা প্রকল্প গড়ছে, অন্যদিকে স্রেফ রুটিরুজির তাগিদে মানুষের ঘর ছাড়ার দৃশ্য সেই উন্নয়নের দাবিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে। পরিযান হয়তো অর্থনীতিকে সচল রাখে, কিন্তু এর আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক নির্মম বাধ্যবাধকতা। শখে কেউ ভিটেমাটি ছেড়ে ভিনরাজ্যে যান না; কাজের অভাব, আঞ্চলিক বঞ্চনা আর নিরাপত্তাহীনতাই তাঁদের তাড়ায়। তাই পরিযান নিছক কোনও অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া নয়, এটি সমাজের বুকে চেপে বসা কাঠামোগত বৈষম্যের এক জ্বলন্ত প্রমাণ।

উত্তরবঙ্গের প্রেক্ষাপট ও শ্রমবাজারের সংকট

বাজার অর্থনীতির সহজ নিয়ম হল, যেখানে উন্নয়ন বেশি, মজুরি ও শ্রমের চাহিদাও সেখানে বেশি। আর ঠিক এই কারণেই পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গ, বিহার বা উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলো থেকে আজ শ্রমিকের ঢল নামছে। উত্তরবঙ্গের ছবিটা আরও করুণ— দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ারের চা বাগান এবং কৃষিক্ষেত্র থেকে দলে দলে মানুষ পাড়ি দিচ্ছেন ভিনরাজ্যে। একটু ভালো থাকার আশায় তাঁরা যখন দূরদেশে ঘাম ঝরাচ্ছেন, তখন আমাদের নিজস্ব গ্রামীণ অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ভারসাম্য হারাচ্ছে। পুরুষ শ্রমিকদের এই ব্যাপক গ্রামত্যাগ স্থানীয় আর্থসামাজিক পরিকাঠামোকে এক ভয়াবহ অস্তিত্বের সংকটে ঠেলে দিচ্ছে।

জনকল্যাণ কি পরিযান রুখতে পারছে?

স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, সরকারি অনুদান বা প্রকল্পগুলো কি আদৌ পরিযান রুখতে পারছে? একশো দিনের কাজের মতো প্রকল্পে গ্রামে রোজগারের সামান্য সুযোগ তৈরি হলেও, রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা দুর্নীতির কারণে সেই সুফল সব ঘরে পৌঁছাচ্ছে না। একইভাবে, ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ বা ‘কন্যাশ্রী’-র মতো প্রকল্পগুলো সাধারণ মানুষকে সামাজিক সুরক্ষা দিলেও, এগুলো মূলত ভোগভিত্তিক অনুদান। হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিলে সাময়িক সুরাহা হয় ঠিকই, কিন্তু তাতে উৎপাদনমুখী ও স্থায়ী কর্মসংস্থানের কোনও বিকল্প তৈরি হয় না। শিকড়কে অবহেলা করে কেবল ডালপালা ছাঁটলে যেমন গাছ বাঁচে না, তেমনি স্থায়ী কাজের ব্যবস্থা না করলে পরিযানের মূল কারণ দূর করা একেবারে অসম্ভব।

নাগরিকত্বের বাস্তব প্রয়োগ : এক নিদারুণ প্রহসন

পরিযান শুধু পেটের টান নয়, এটি নাগরিক অধিকারকেও ভেতর থেকে কুরে-কুরে খায়। গণতন্ত্র টিকে থাকে নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর। কিন্তু পরিযায়ী শ্রমিকের অনিশ্চিত জীবন, ঠিকানাহীন অস্থায়ী ডেরা আর প্রশাসনের সঙ্গে যোজন দূরত্বের কারণে তাঁরা নিজদেশেই একরকম ‘অদৃশ্য নাগরিক’- এ পরিণত হন। ভোটের লাইনে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে সরকারি সুযোগসুবিধা পাওয়া— প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁদের ঠেলে দেওয়া হয় প্রান্তিক অন্ধকারে। সচিত্র পরিচয়পত্র পকেটে থাকলেও, বাস্তব জীবনে তাঁদের নাগরিকত্বের অধিকার থাকে চরম অপূর্ণ। দিনের শেষে এই বঞ্চনা আমাদের গর্বের গণতান্ত্রিক কাঠামোকেই এক ভয়ংকর অনিশ্চয়তার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও শিক্ষার রূপরেখা

শুধু চকচকে ইমারত বানিয়ে ‘বিকশিত ভারত’ গড়ার স্বপ্ন দেখা নেহাতই অলীক কল্পনা। এর আসল ভিত হওয়া উচিত মানবিক উন্নয়ন ও শিক্ষা। কিন্তু নির্মম সত্য হল, শিক্ষার প্রসারের গালভরা কথার মাঝেই স্কুল-কলেজ ছুটের হার আজও আমাদের ঘুম কাড়ে। নাগরিকদের একটা বড় অংশ নিজেদের অধিকার ও কর্তব্য নিয়ে আজও চরম উদাসীন। এই অজ্ঞতা ও অন্ধত্বই পরিযানের পথে সবচেয়ে বড় কাঁটা। সচেতনতা ছাড়া প্রকৃত নাগরিক চেতনা গড়ে ওঠা অসম্ভব। আঞ্চলিক বৈষম্য মুছে ফেলা, স্থানীয় স্তরে টেকসই কাজের সুযোগ তৈরি এবং শিক্ষার আলো ঘরে ঘরে ছড়ানোর মাধ্যমেই এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব। উন্নয়ন আর জনকল্যাণ একে-অপরের হাত ধরে চললেই কেবল একটি মানবিক ও সুস্থ সমাজ গড়া সম্ভব।

(লেখক লীলাবতী মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *