সন্দীপন নন্দী
প্রবাদ বলে, অতিথি আগমনের তিথি নেই। কিন্তু তিথিনক্ষত্র দেখে যদি শনিবারের বারবেলাতেও কোনও বিশেষ উদ্দেশ্যে অতিথির আগমন হয়, তবে তা সন্দেহের উদ্রেক ঘটাতে বাধ্য! খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রবিবাসরীয় কেন্দ্রীয় বাজেট ঘোষণার পূর্ব দিবসে উত্তরবঙ্গ উন্নয়নের ‘শনিদোষ’ কাটাতেই তাঁর অম্বরপথে অমিতবিক্রমে এই অযাচিত সফর। কিন্তু কার্যকালে রবিবারে ৫১০০ সেকেন্ডের ম্যারাথন কেন্দ্রীয় বাজেট ঘোষণায় সেই গ্রহদোষ কতটা নির্মূল করলেন অতিথির সহযোদ্ধা নির্মলা সীতারামন? আক্ষরিক অর্থে যার নিটফল জিরো। শনিবার শিলিগুড়ির কর্মীসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা’র রাখা প্রতিটি প্রতিশ্রুতি-পাহাড়ের বেলা গড়াতেই পতন অনিবার্য হল। কেন? কারণ বড়মুখে তিনি বলেছিলেন, উত্তরবঙ্গের আয়তন ও জনসংখ্যার নিরিখে যা প্রাপ্য, বাজেটে তার এক টাকা বেশি হলেও বরাদ্দ হবে। দিব্যি খেয়েছিলেন, ‘উত্তরবঙ্গের সঙ্গে অন্যায় হতে দেব না’। বিনিময়ে বিধানসভা ভোটে উত্তরবঙ্গের সব আসন তাঁর চাই-ই চাই। এই ছিল বক্তব্যের মূলসুর। নির্যাস শুধু ‘দেবে আর নেবে’। অথচ মহব্বতের দোকান হলে জিনিস বিক্রিতে এত শ্রম কি বড়দোকানির মানায়? অথচ গোপনে ‘উত্তরবঙ্গ প্রেমের’ ফাঁদ পেতে সেই অন্যায়টাই করে বসল কেন্দ্র সরকার। একটি অধোগতির শীত শীত ছুটিবেলায় উত্তরবঙ্গের প্রাপ্তিতে পুঞ্জিত বেদনাই রয়ে গেল। উপেক্ষার অবসান ঘটল না।
পদ্মপুরাণে বঞ্চনার ইতিহাস
সূচিমতো শনিবার পাহাড়-সমতলে শহর শিলিগুড়িতে উনিজির ছায়াসঙ্গী এসেছিলেন বাংলায় আসন্ন ভোটবাজারের ভাবগতিক বুঝতে। কিন্তু শেষমেশ দেখা গেল ৫৩.৫ লক্ষ কোটির বিপুল বাজেটে উত্তরবঙ্গের ভাঁড়ে স্রেফ মা ও ভবানী। শিলিগুড়ি-বারাণসী রেলের হাইস্পিড করিডর সহ ডানকুনি-সুরাট ফ্রেট করিডরের সামান্য দান ছাড়া কিচ্ছু নেই। জনগণের অভিযোগ, সমগ্র ঘোষণায় একটিবারও অর্থমন্ত্রী নাকি বাংলার নাম পর্যন্ত মুখে আনেননি। যা পদ্মপুরাণে চাঁদ সদাগরের মনসাবন্দনার অনীহাই প্রমাণ করে। এই তো টানা নয়বার ‘একজনের’ রেকর্ড সৃষ্টিকারী ঐতিহাসিক বাজেট ঘোষণার নমুনা। বেলা বাড়ল আর উত্তরবঙ্গের অফিসে, অলিগলিতে টিভিতে চোখ রাখা নিরীহ মানুষের স্বপ্ন ভেঙে খানখান হল। এখানে সম্ভাবনাময় টি, টিম্বার, ট্যুরিজমের ত্রিশিল্পে পদ্ম শিবির কানাকড়ি দিতেও কুণ্ঠা বোধ করল। আক্ষেপ, এইমসের স্বপ্ন এবারও দেখতে পেলেন না উত্তরবঙ্গবাসী। শিলিগুড়ির মতো ক্রমবর্ধমান শহরে একটি উন্নতমানের কেন্দ্রীয় চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের দাবি দীর্ঘদিনের, কিন্তু দিল্লি বারবারই সেই দাবিকে উপহাসের পাত্র করে তুলছে।
বিহার মডেল বনাম বাংলার অবহেলা
ভোটের আগে ঘোষিত বাজেটে বিহার পেয়েছিল ৬০ হাজার কোটি টাকা আর পশ্চিমবঙ্গ পেল শুকনো আশ্বাসের কিছু চিঁড়ে আর মিথ্যে কথামালা। আসলে বিহারে জয়ের সম্ভাবনা নিশ্চিত জেনেই গতবার বাজেটে বিপুল অর্থের ডালা উপুড় করেছিলেন নির্মলা সীতারামন। এমনকি সেই আলোড়ন তোলা বাজেটে বিহারের বিখ্যাত মধুবনি শাড়ি পরে এসেছিলেন নির্মলা। তো এসব আড়ম্বর বৃথা যায়নি তাঁর। বিহার জয় সম্ভব হয়েছিল সে যাত্রায়। কিন্তু আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তাঁদের ‘বঙ্গদখলের খোয়াব’ যে সফল হবেই এর নিশ্চয়তা কোথায়? আর সেই অনিশ্চিত অশনিসংকেতের ইঙ্গিতই হয়তো বাংলা সহ উত্তরবঙ্গের ঝুলি এবারও অপূর্ণ রয়ে গেল। শিল্প থেকে স্বাস্থ্য, সর্বত্র বঞ্চনার সুস্পষ্ট ছাপ রাখলেন অর্থমন্ত্রী। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ঝুলি শূন্য রেখে ভোট পাওয়ার এই কৌশল আসলে উত্তরবঙ্গবাসীর আত্মসম্মানে আঘাত করার নামান্তর।
পাহাড়ের দীর্ঘশ্বাস ও অনুত্তরিত প্রশ্নমালা
দিকে দিকে কেন্দ্রীয় বাজেটের রবিবাসরীয় সন্ধ্যায় বিক্ষুব্ধ উত্তরবঙ্গবাসীর প্রশ্ন ছিল, নির্বিঘ্ন ডালখোলা বাইপাস নির্মাণের কৃতিত্ব কার? বালুরঘাট বিমানবন্দরে বিমান নামবে কবে? বছর বছর কোটি টাকার তিস্তাপাড় বাঁধানো পাথর কোথায় ভ্যানিশ হয়? জিটিএ’র বার্ষিক অডিটের নোটিশ বেরোলেই ওরা বলে পাহাড় প্রবেশ নিষিদ্ধ। কেন এমন হয়? আর এসব উপলব্ধি করতে করতেই পরবর্তী ভোট এসে যায়। প্রতিশ্রুতির নেপথ্য ভাষণে পুনর্বার বোবা হয়ে যায় কার্সিয়াং থেকে কাশিয়াডাঙ্গার নাগরিক। শোনা যায় একদা উত্তরের পাহাড়ে সুবাস ঘিসিংকে কৌশলে শান্ত রেখেছিলেন জ্যোতি বসু। এখন জাদুকাঠির হাতবদল হয়েছে মাত্র। কিচ্ছু বদলায়নি। যুগে যুগে প্রত্যাশী ভোটার শুধু স্বপ্ন দেখে ছাপ দিয়ে যায়। যে পাহাড়ে আলো মানে আজ শুধু টাইগার হিল। কিন্তু পাহাড়ে উপযুক্ত শিক্ষা নেই, আধুনিক স্বাস্থ্য পরিষেবা নেই, পানীয় জলের সমস্যা বেহাল। পর্যটনকে ঢেলে সাজানোর কোনও কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা এই বাজেটে স্থান পায়নি।
বাম-রামের অবহেলা ও চায়ের বিষাদ
তবে দোষ কেবল একা নন্দ ঘোষ বাজেট আর বিজেপির নয়। অতীতেই উত্তরবঙ্গে প্রগতি মানচিত্রে আগুন ধরেছিল তৎকালীন সরকারের অলক্ষে, অজান্তে। যে কফিনে শেষ পেরেক মারার প্রস্তুতি শুরু হল বাম আমলেই। একসময় চা বলয়ের শ্রমিক আন্দোলনে তাদের দলের সক্রিয় ভূমিকা থাকলেও শেষের দিকে উদাসীন আচরণে উত্তরবঙ্গে চোখের পলকে মোহরগাঁও গুলমা, কাঁঠালগুড়ি চা বাগানের গেট বন্ধ হয়ে গেল। আসলে কোনটা চাহিদা আর কোনটা দাবি, এ অহর্নিশ দ্বন্দ্ব পাহাড়, নদী, জঙ্গল ঘেরা মানুষরা বুঝতেই পারেনি কোনওদিন। ফলাফল? সুকনা, দাগাপুর, মেরিভিউ, খড়িবাড়ি, মানঝা, ফুলবাড়ি, ভোজনারায়ণ, সাহাবাদ, সৈয়দাবাদ, আশাপুর, থানঝোরা, সন্ন্যাসীথান, পুটিংবাড়ি, শিমুলবাড়ি টি এস্টেটের মতো লাভদায়ক বাগানে আজ মসফার্নের হাহাকার। যেখানকার চা উৎপাদন কারখানায় আজ উজ্জ্বল সকালেও ভূত খেলা করে। উপযুক্ত পরিকল্পনার অভাব ও মুখ ফেরানো মানসিকতায় একটা একশো বছরের শিল্পবিপ্লবের অপমৃত্যু ঘটল উত্তরবাংলায়। সবাই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল। এবারকার বাজেটেও সেই অবজ্ঞা চলমান, অব্যাহত, অবিরল।
শ্রমিকের কান্না ও উন্নয়নের অলীক আকাশ
এভাবেই সময়ের দাবি মেনে একে একে ঝাঁপ বন্ধ হয়েছে বহু চা বাগানের। কাঁঠালগুড়ি, গুরজংঝোরা টি এস্টেটের সদর দপ্তরেও তালা পড়েছে। কাজ হারিয়ে কোনও শ্রমিক আত্মঘাতী হয়েছেন, নয়তো ভিনদেশে বিকল্প কাজের সন্ধানে চলে গিয়েছেন। শিলিগুড়ির মোড়ে মোড়ে নিরাপত্তারক্ষী বা পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে উত্তরবঙ্গের তরুণদের ভিড় এই বঞ্চনারই জলজ্যান্ত প্রমাণ। কিন্তু উত্তরবঙ্গে এতগুলো সাংসদ পেয়েও বিজেপি চা বাগানের উন্নয়নে বিন্দুমাত্র দৃষ্টিপাত করেনি। বরং বছর বছর ভোট এলে শুধু ‘উন্নয়ন হবে’র খাতা নিয়ে এমাথা ওমাথা অযথা ভ্রমণে উদ্যত হয়েছেন মাত্র। তাই এবার উত্তরবঙ্গের চা বাগানের ইতিহাসকে ভারতবর্ষের স্কুলে স্কুলে সিলেবাসভুক্ত করার দাবি উঠুক দিল্লি থেকে।
ঐতিহাসিক প্রবঞ্চনা ও রাজনীতির ভারসাম্য
পেছন ফিরলে দেখা যায় একদিন এ মুলুকের নকশালবাড়ি আন্দোলন স্বীকৃতি পেল। সঙ্গে তেভাগা আন্দোলন। গান হল, ছায়াছবি হল, বিশেষ প্রবন্ধ সংকলন হল। সারা পৃথিবী জানল এক ঘুপচি গ্রামের নাম। চারুবাবু অমর হলেন। কিন্তু এতগুলো বছর হোলটাইম পার্টিকে দিয়েও উত্তরবঙ্গের কর্মীরা কী পেলেন? সেকালে লক্ষ লক্ষ ভোট, বিজয় মিছিলের পরও পলিটব্যুরোর সদস্যপদটুকুও পাননি এ অঞ্চলের কোনও পার্টিকর্মী। এমনকি এবার অর্থমন্ত্রীর বাজেটে আয়ুর্বেদ কলেজ, ১৫০০ সেকেন্ডারি স্কুল, জেলায় জেলায় মহিলা কলেজ ঘোষণার চমক ও বিস্ময় মাঝেও উত্তরবঙ্গে আজও নামমাত্র পরিকাঠামোহীন কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে শিক্ষায় ছেলেভোলানো চলছে তো চলছেই। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়— সর্বত্রই যেন এক স্থবিরতা। কেন্দ্রীয় সরকার নিরুত্তর, নিরুত্তাপ। একদা কংগ্রেসের গনি খান চৌধুরীর একক ক্যারিশমায় রেল এসেছিল মালদায়। অন্যথায় বরেন্দ্রভূমির কী হত কে জানে? হয়তো মেঠো ইঁদুরের মতো কুড়ায় নিত চিলে। কারণ উত্তরবঙ্গের মাটিটাই এমন। আত্মপ্রবঞ্চনাই যেন নাগরিকের জন্মগত অধিকার। সেহেতু এখানে এইমসের প্রস্তাবে আপত্তি ওঠে বারবার। জনবহুল শিলিগুড়িতে পাতালরেলের দাবি উঠলে হেসে ওঠে যমুনাপার। কেননা এ অঞ্চলের রাজনীতিতে আজ সেরা খেলার নাম ভারসাম্য। যেখানে ভোট, ভরসা, ভিত্তির সুতোয় হেঁটেও পতনের ভয় নেই। তবু অসম্ভবের মাথা টুটে ‘অল্প’ নিয়েই খুশি উত্তরবঙ্গ। খেলো ইন্ডিয়া, খেলো। উত্তরবঙ্গের মানুষ কেবল গ্যালারিতে বসে হাততালি দেবে, আর মাঠের দখল নেবে অন্য কেউ— বাজেটের এই নির্মম পরিহাসই এখন ভবিতব্য।
(লেখক প্রাবন্ধিক)
