ইনসুলিনের আবিষ্কার ডায়াবিটিসকে মারণব্যাধি থেকে দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগে রূপান্তরিত করেছে। আবিষ্কারের পরবর্তী এক শতাব্দীতে ইনসুলিনের গঠন, কার্যকারিতা ও প্রয়োগ পদ্ধতিতে বিপুল বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি হয়েছে, যা আজকের আধুনিক ডায়াবিটিস ব্যবস্থাপনার ভিত্তি। লিখেছেন এন্ডোক্রিনোলজিস্ট ডাঃ অরুন্ধতী দাশগুপ্ত।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে ইনসুলিনের আবিষ্কার একটি মাইলফলক। বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে ডায়াবিটিস মেলিটাস, বিশেষ করে টাইপ-১ ডায়াবিটিস ছিল একটি প্রায় নিশ্চিত মৃত্যুদণ্ড। এই প্রেক্ষাপটে ১৯২১ সালে কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্রেডরিক ব্যান্টিং ও চার্লস বেস্টের নেতৃত্বে ইনসুলিনের আবিষ্কার চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে। ১৯২২ সালে প্রথম মানবদেহে ইনসুলিন প্রয়োগের মাধ্যমে ডায়াবিটিস চিকিৎসার এক নতুন অধ্যায় সূচিত হয়।
ইনসুলিনের ভূমিকা
ইনসুলিন একটি হরমোন যা অগ্ন্যাশয়ের থেকে নিঃসৃত হয়। এর প্রধান কাজ হল কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাট ও প্রোটিন বিপাক নিয়ন্ত্রণ করা। ইনসুলিন গ্লুকোজ কোষের ভিতরে প্রবেশ করতে সাহায্য করে এবং লিভারে গ্লাইকোজেন সংরক্ষণ বৃদ্ধি করে।
টাইপ-১ ডায়াবিটিসে অটোইমিউন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিটা কোষ ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে শরীর একেবারেই ইনসুলিন উৎপাদন করতে পারে না। টাইপ-২ ডায়াবিটিসে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ও আপেক্ষিক ইনসুলিন ঘাটতি একত্রে কাজ করে। এই দুই অবস্থাতেই বহিরাগত ইনসুলিন একটি বৈজ্ঞানিকভাবে যুক্তিসংগত ও প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা।
ইনসুলিন থেরাপির নিরাপত্তা ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি
ইনসুলিন মানবদেহের স্বাভাবিক হরমোন হওয়ায় এটি সঠিক মাত্রায় ও উপযুক্ত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ব্যবহার করলে অত্যন্ত নিরাপদ। ইনসুলিন থেরাপির প্রধান পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হাইপোগ্লাইসেমিয়া, যা যথাযথ রোগীশিক্ষা, ডোজ টাইট্রেশন ও গ্লুকোজ মনিটরিংয়ের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রতিরোধযোগ্য। বাস্তবে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও ইনসুলিন নিতে দেরি হলে ডায়াবিটিস মাইক্রোভাসকুলার ও ম্যাক্রোভাসকুলার জটিলতার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
ইনসুলিনের ক্লিনিকাল উপকারিতা
প্রমাণভিত্তিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ইনসুলিন থেরাপি রক্তে গ্লুকোজের কার্যকর ও টেকসই নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে। ডায়াবিটিসজনিত রেটিনোপ্যাথি, নেফ্রোপ্যাথি ও নিউরোপ্যাথির ঝুঁকি কমায় এবং গর্ভকালীন ডায়াবিটিসে মা ও ভ্রূণের জন্য সর্বাধিক নিরাপদ চিকিৎসা।
কারা ইনসুলিন নেবেন
- টাইপ–১ ডায়াবিটিসে ইনসুলিন জীবনরক্ষাকারী এবং বাধ্যতামূলক
- টাইপ–২ ডায়াবিটিসে ট্যাবলেটে সুগার নিয়ন্ত্রণে না থাকলে
- গর্ভাবস্থায় ডায়াবিটিস হলে
- গুরুতর সংক্রমণ, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, কিডনি বা লিভারের সমস্যা থাকলে
- খুব বেশি সুগার নিয়ে প্রথমবার ধরা পড়লে
- ইনফেকশন বা সংক্রমণ হলে
অনেকসময় ইনসুলিন সাময়িকভাবে দেওয়া হয় এবং পরে আবার ট্যাবলেটে ফিরে যাওয়া সম্ভব।
ইনসুলিন কি ক্ষতিকর
এই ধারণাটি সবচেয়ে বেশি ভুল। ইনসুলিন কোনও অঙ্গ নষ্ট করে না। বরং দীর্ঘদিন উচ্চ শর্করায় চোখ, কিডনি, স্নায়ু ও হৃদযন্ত্রের ক্ষতি হয় আর ইনসুলিন সেই ক্ষতি থেকে শরীরকে বাঁচায়।
ইনসুলিন নেওয়া কি খুব কষ্টকর
আগের দিনের মোটা সুচ আর বর্তমানের ইনসুলিন পেন এক নয়। আজকাল ব্যবহৃত হয় –
ইনসুলিন পেন, যার অত্যন্ত সূক্ষ্ম সুচ। প্রায় ব্যথাহীন পদ্ধতি। অধিকাংশ রোগী কয়েকদিনের মধ্যেই নিজে নিজে ইনসুলিন নিতে শিখে যান।
ইনসুলিন কি আজীবনের জন্য
সব ক্ষেত্রে নয়। টাইপ-১ ডায়াবিটিসে ইনসুলিন আজীবনের প্রয়োজন। টাইপ-২ ডায়াবিটিসে অনেক সময় জীবনযাপন ঠিক হলে, ওজন কমলে, অন্য ওষুধে নিয়ন্ত্রণ এলে ইনসুলিন বন্ধ বা কমানো যায়।
ইনসুলিনের প্রকারভেদ (কাজের সময়কাল অনুযায়ী)
দ্রুত কাজ করা ইনসুলিন – খাবারের ঠিক আগে দেওয়া হয়। উদাহরণ : লিসপ্রো, অ্যাসপার্ট, গ্লুলাইসাইন
স্বল্পমেয়াদি ইনসুলিন – খাবারের ৩০ মিনিট আগে দেওয়া হয়।
মধ্যমেয়াদি ইনসুলিন – ধীরে কাজ শুরু করে। সাধারণত দিনে ১–২ বার দেওয়া হয়
দীর্ঘমেয়াদি ইনসুলিন – ২৪ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় কাজ করে। উদাহরণ: গ্লারগাইন, ডিটেমির, দেগ্লুডেক
ইনসুলিন দেওয়ার পদ্ধতি
বেসাল ইনসুলিন ঃ দিনে একবার দীর্ঘমেয়াদি ইনসুলিন।
বেসাল– বোলাস রেজিমেন ঃ খাবারের আগে দ্রুত কাজ করা ইনসুলিন। সঙ্গে দিনে একবার বেসাল ইনসুলিন।
প্রিমিক্সড ইনসুলিন – দুই ধরনের ইনসুলিন একসঙ্গে দিনে সাধারণত ২ বার।
রোগীর জীবনযাপন, খাবারের সময়, সুগারের মাত্রা ও অন্যান্য রোগের উপর ভিত্তি করে কোন রেজিমেনটি উপযুক্ত হবে তা চিকিৎসক ঠিক করেন।
আধুনিক ইনসুলিন থেরাপি ও প্রযুক্তি
ইনসুলিন পেন, কন্টিনিউয়াস গ্লুকোজ মনিটরিং (সিজিএম) এবং ইনসুলিন পাম্প ডায়াবিটিস ব্যবস্থাপনাকে আরও নির্ভুল ও রোগীকেন্দ্রিক করেছে। সেইসঙ্গে গ্লাইসেমিক ভ্যারিয়েবলিটি কমাতে ও জীবনমান উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
পরিশেষে বলব, ইনসুলিন নেওয়া মানে রোগীর বা ডাক্তারের ব্যর্থতা নয়। বরং এটি একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত, যাতে ভবিষ্যতের জটিলতা এড়ানো যায়।
