মণিদীপা নন্দী বিশ্বাস
ক’দিন আগেই আমার এক ছাত্রীর আমন্ত্রণে ‘প্রতিবাদে বিপ্লবে কবিতা’র কথা বলতে গিয়েছিলাম এক অনুষ্ঠানে। আসলে ও সময় বেঁধে দেয়নি, আমিও মনের আনন্দে সেই শোক থেকে শ্লোকের উৎসারণ… মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ হয়ে শঙ্খ ঘোষের যমুনাবতীতে এসে যখন থেমেছি, তখন দেখছি ভারী লম্বা করে ফেলেছি কথা। ফলত নিজস্ব চেতনার অন্তরঙ্গ উচ্চারণে কবিতা সিংহ, মল্লিকা সেনগুপ্ত, তসলিমা নাসরিন উচ্চারণের সময়টুকু না পেয়ে শুধুই নাম উল্লেখ করেই প্রতিবাদের কথা বললাম।
আসলে স্ত্রী জাতি ওই কর্তব্যেই বাঁধা পড়িয়াছে। বাঁধা যেমন বন্ধন, বাধা তেমনিই প্রতিবন্ধকতা। এ দুটোই যখন ভাষার মুখ, অক্ষর, শব্দ উচ্চারণ বন্ধ করে স্রোতের উৎসমুখ শুকিয়ে তোলে তখন কেমন লাগে বলুন তো? শেষ রাতে গলা শুকিয়ে যাওয়া, ভয়ে ভাবনায় মনে হতে থাকে এই ফুরিয়ে যাওয়া মানে মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছোনো।
আসলে বয়সি অভিজ্ঞতায় একখানা পাহাড়ের শীর্ষদেশ থেকে আতঙ্কে গভীর খাদের দিকে তাকিয়ে থাকা। একটা করে দেশ শেষ হয়ে যাচ্ছে, মানব শিশুদের মর্মান্তিক যন্ত্রণা ভবিষ্যৎ ছিদ্রগুলো তুলে ধরছে। পরিস্থিতি পরিবেশে ইন্ধনের মতো হাতের চেটোয় সব সময় অন্যমনস্ক হয়ে পড়ার একখানি যন্ত্র। কখনও আলো নেভে, কখনও লালচে আলোয় বুকের ভিতর পড়ে ফেলে যন্ত্র পরিচালন কলকবজা। এধার থেকে ওধার এক-একজনের মনের অন্ধিসন্ধি হাত ছেড়ে মনের নাগালে চলে আসা, কারও প্রবল প্রতিপত্তি (যেদিকেই হোক, সাহিত্য, সংগীত, শিল্প, খেলাধুলো, নাটক ইত্যাদি ইত্যাদি) কখনও উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠা, পরক্ষণেই মুষড়ে পড়া।
এভাবে কে কত দুর্নীতিবাজ, কে কতটা তেলবাজ, সবটাই…মানে সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত হাঁড়ির খবর না দিলে না নিলে অধিকাংশের পাগল পাগল অবস্থা। আর রাজনীতির নানা কৌশল, কার্যকলাপে মন দিতে না চাইলেও সেসব কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স। বিজ্ঞের মতামত না দিতে পারলেই ব্যাকডেটেড বা ধান্দাবাজ। সুতরাং মাঝেমধ্যে নোটিশও চোখে পড়ে হাতের মধ্যিখানে ‘এত তারিখ হইতে অমুক সময় পর্যন্ত অনলাইন হইতে পারিব না’।
অনেকে আবার নীরবে আগাপাশতলা নিরীক্ষণ করেন, বাড়ির মানুষজনের বিচার আরম্ভ করেন। বাড়ির আধবয়সি কর্তা হয়তো প্রায় বৃদ্ধা স্ত্রীকে ডিরেকশন দেন, ‘আচ্ছা, তুমি তো চুলটুলগুলো নিয়ে একটু বিউটি পার্লারে ট্রিটমেন্টে গেলেই পারো’। হাঁ ঈশ্বর! স্ত্রীর যে বয়সজনিত কারণে চুল পাতলা হইয়া সোনালি সাদায় রকমারি পরিবর্তন আসিতেছে তাহা মানিতে পারা যায় না!
একসময়ে গৃহিণীর চোখ চলে যেত এখানে-ওখানে দেওয়ালের কোণে মাকড়সার জাল, এলোমেলো নোংরা হয়ে থাকা আসবাবে ধুলোটুলোয়। আর দ্বিপ্রহরে স্নানাহারের আগে ওসব মুছে ফেলা একটা রেওয়াজ ছিল আর দুপুরে খবরের কাগজ খুঁটিয়ে পড়া কর্তা-গিন্নি দুজনেরই প্রবল নেশার মতো ছিল। এখন আর কোনও কিছুতেই কিছু এসে যায় না। খবরের কাগজের আগেই অধিক রাত্রি জাগরণের ফলে হাতের ছোট্ট যন্ত্র এই সব জানিয়ে দেয়। খুঁটিয়ে পড়ার অভ্যাস বেসামাল।
সবখানেই সন্ধে-সকালের আড্ডাটা এখনও বেশ কিছু জায়গায় রীতিমতো আকর্ষণীয়। প্রবীণদের ঝকঝকে আড্ডা চলে, ওরই মধ্যে কারও কারও হাতে উপদ্রুত সময়ের মতো যন্ত্রটি খাঁড়া হয়ে দাঁড়ায়। আড্ডার বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে অভ্যাসবশে দু’-একখানা মন্তব্য করলেও মন থাকে মেসেজ চালাচালি বা পেজে লাইক, লাভ ইত্যাদি চিহ্নে। আর তরুণরা তো লা-জবাব। নির্বাক চলচ্ছবি। নির্বাক সে সভা ঘরে… উল্লাসে ফেটে পড়া গল্পগুজব কিংবা বিপদআপদে প্রতিবেশীর পাশে গিয়ে সবার আগে দাঁড়িয়ে পড়া, কোথায়!
যতই ব্যতিক্রম থাক, বদল হয়েছে, হচ্ছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তর। সভাসমিতি আছে, সাহিত্য ঠেক আছে, উৎসব-অনুষ্ঠানেও জাঁক বেড়েছে বই কমেনি। প্রশ্ন ওঠে ক’জন উৎসাহী হচ্ছে! চলমান ডিজিটাল অগ্রগমন আর বিপ্লব ঘটছে করতলে।
কেমন বিষণ্ণ বিষণ্ণ সুর চৈত্র শেষের হাওয়ায়। গত দু’-তিনদিন সত্যিই না ঘুমিয়ে কেটেছে। যন্ত্রটি যেমন সচল হয়ে জানিয়েছে ‘পথে এসো’, সর্বত্রই রব উঠেছে যথার্থই মানুষ ভালো নেই। মানুষ গড়ার কারিগররা ছোটদের কাঁদিয়ে পথে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছে। যোগ্য-অযোগ্য নিয়ে চলছে আইনের দড়ি টানাটানি। সরকারি মঞ্চায়ন আর রাজনীতির নাটক। নতুন গড়ে ওঠা পরিবারের শিশুটি বুঝতে পারছে না মা- বাবার চোখে জল কেন! কোথাও দুরারোগ্য অসুস্থ বাবা-মাকে না জানিয়ে অন্ধকারে একগাছা দড়ির খোঁজ করছেন কেউ। আমরা সচল। হ্যাঁ, সক্রিয় এখন কাজে-অকাজে, লেকচারে লেকচারে। একদল সব হারানো তরুণ-তরুণীর পাশে দাঁড়াতে চাইছে, কেউ প্রকৃত পথ নির্ধারণে পথে নেমেছে। যোগ্যতমরা কাজ ফিরে না পেলে প্রকৃত শিক্ষাঙ্গনের কী অবস্থা হবে, সে বিষয়ে নিরুত্তর সবাই। স্তাবকতার ভিড়ে দাঁড়ানো নির্ভীক শিশুও প্রশ্ন করতে ভুলে গেছে।
সত্যিই সে যান্ত্রিক আলো বহুকণ্ঠস্বরকে ঐক্যবদ্ধ করছে। মতবিনিময় চলছে। আবার সুযোগসন্ধানীরা কোমর বেঁধে নেমে পড়েছেন।
সময়, প্রকৃতি নিজস্ব পরিসরে স্থির। একইভাবে বসন্ত শেষের ফুল ফোটে, চৈত্রের শুকনো পাতা আর রুক্ষ ধুলোয় মন কেমনের বাতাস বয়ে যায়। বোগেনভেলিয়ার রংবেরংয়ের পাপড়ি ইউনিভার্সিটির পথে পথে রং ছড়ায়। উত্তরের পথে পথে ডিভাইডারের বিভিন্ন গাছে আলো হয়ে থাকে সবুজ আর রকমারি রং।
২০১৬ সালের প্যানেলে চাকরি পেয়ে যে ছাত্রী প্রণাম করে ওর বিয়ের কার্ড দিয়েছিল, সম্ভাবনা পূর্ণ দু’চোখে উজ্জ্বল আলো দেখেছিলাম। সময় ওকে বা ওর মতো আরও অনেককে ভালো থাকার ইচ্ছে উজাড় করে দিয়েছিল, স্বার্থ গন্ধ আর ষড়যন্ত্রের বাতাবরণে মানুষ সে সময়কে হারিয়ে দিয়েছে। চোখের জল নয়, সময়ই আগুন হয়ে জ্বলবে। আবার লেখা হবে ইতিহাস। সাহিত্যসংস্কৃতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া হতোদ্যম প্রজন্মই তৈরি করবে সে ইতিহাস। কান্নার অক্ষরে আবার লেখা হবে টুকরো গদ্য, কবিতার স্ফুলিঙ্গ আর বুকের আঘাতে তৈরি হবে সময়ের উপন্যাস।
মহানগর থেকে উত্তর সবখানে এখন গুচ্ছ লাল ফুলের আগুন। তুলসীর উপর জল ঝরেই যায়। পাতা শুকোয় না। কবিতা সিংহ, মল্লিকা সেনগুপ্ত, তসলিমা নাসরিনরা ফিরে আসে কলমের অক্ষরে ইতিহাসের প্রেক্ষিতে। সময়ের কালো অনুভবে লাশকাটা ঘরে নিশ্চিন্তে ঘুমোয় কবির সৃষ্টি, ‘বন্দিনী’ বলে, ‘ঝরাপাতাদের জড়ো করে পুড়িয়ে দেবো ভেবেছি : অনেকবার
রাত হলেও যত রাতই হোক, আগুন হাতে নিই
ওদের তাকিয়ে থাকা দেখলে গা শিরশির করে’…
কোচবিহারের খাদ্য আন্দোলনের সেই শহিদ মেয়ের দু’চোখে আগুন শঙ্খ ঘোষ শুরু করেছিলেন থমাস হুড কে দিয়ে… ‘Another unlucky Weary of breath, Rashly importunate… Gone to her demise…’ ‘‘নিভন্ত এই চুল্লীতে মা/ একটু আগুন দে/আরেকটু কাল বেঁচেই থাকি/বাঁচার আনন্দে! নোটন নোটন পায়রাগুলি খাঁচা তে বন্দী/দু এক মুঠো ভাত পেলে তা ওড়াতে মন দি… ’’
হাতের শিরায় শিখার মানে কি সত্যিই আজ মরার আনন্দ!
কষ্ট থেকে বয়ে যাক অক্ষর শব্দ। সৃষ্টি হোক ধ্বনি। সময়কে ওরা ধরে রাখবেই। না, হতাশায় নয়। যুগের অগ্রগতির দূত হয়ে দাঁড়ায় আজকের সময়, সময়ের যন্ত্র, যত কষ্ট। ওই ছাব্বিশ হাজারের ঘুম না আসা রাতই একদিন যোগ্যতম, যোগ্যতর আর বহু বহু যোগ্যদের তুলে আনবেই। এটাই হোক সময়ের অঙ্গীকার। মেঘ থেকে বিদ্যুৎ শুষে নিতে নিতে উচ্চারণ করতেই হবে ‘‘আরো আঘাত সইবে আমার, সইবে আমারো/আরো কঠিন সুরে জীবন-তারে ঝঙ্কারো…’’
ঘরে ঘরে প্রস্তুতি আজ অন্যায়ের বিরুদ্ধে, ফিরে পেতে হবে অধিকার। ক্ষুদ্র জোনাকির আলো দিগন্তে মৃত্তিকার মতো ঘনিয়ে আসে। কাস্তেটায় শান দিয়ে রাখ বন্ধু। ছোট্ট দেশলাইয়ের ফুলকি হোক বারুদ।
(লেখক সাহিত্যিক। জলপাইগুড়ির বাসিন্দা)
