- জয়ন্ত চক্রবর্ত্তী
আশা ও নিরাশার দোলাচলে কেটে যায় আমাদের প্রতিটি ক্যালেন্ডার বছর। কিছু স্মৃতি ও বিস্মৃতি নিয়ে এগিয়ে যায় প্রবহমান জীবন। হয়তো আগামীতে এই বিপুল বিস্মৃতির মাঝেই স্মৃতির তালিকায় জ্বলজ্বল করবে বিগত বছরে আরাবল্লির লাইফলাইনজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের পদচারণা। এ যেন ভূ-প্রাকৃতিক পরিবেশকে রক্ষার তাগিদে এক অনন্য প্রতিবাদ। যে প্রতিবাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির সে অর্থে কোনও সরলরৈখিক সম্পর্ক নেই। নেই জমি হারানোর ভয়, নেই ব্যক্তিগত রুজিরুটির প্রশ্ন। বরং প্রতিবাদের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে পরিবেশ সচেতনতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি প্রবল দায়বদ্ধতা। এখানেই অতীতের ‘চিপকো’ কিংবা ‘নর্মদা বাঁচাও’ আন্দোলনের সঙ্গে ‘দ্য গ্রেট আরাবল্লি মার্চ’-এর মৌলিক পার্থক্য।
আরাবল্লি পর্বতমালা শুধুমাত্র একটি প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক কাঠামো নয়; এটি উত্তর ভারতের পরিবেশগত ভারসাম্যের এক নীরব রক্ষাকবচ। রাজস্থান থেকে হরিয়ানা ও দিল্লি–এনসিআর পর্যন্ত বিস্তৃত এই পর্বতমালা মরুভূমির বিস্তার রোধ করে, ভূগর্ভস্থ জলকে নতুনভাবে প্রাণ ফিরে পেতে সহায়তা করে এবং তাপমাত্রা ও বায়ুপ্রবাহকে সহনীয় সীমার মধ্যে রাখতে সাহায্য করে। অথচ অবৈধ খনন, নিয়ন্ত্রণহীন নগরায়ণ ও প্রশাসনিক উদাসীনতায় এই প্রাকৃতিক ঢাল আজ ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু।
এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে— আমরা উত্তরবঙ্গবাসী কি এমন একটি আন্দোলন দেখে নিজেদের পরিবেশগত বাস্তবতার দিকে তাকাতে শিখেছি?
পূর্ব হিমালয় ও সমভূমির মাঝখানে অবস্থিত তরাই–ডুয়ার্স বেল্ট তো আসলে এক জীবন্ত ‘সবুজ সেতু’। অথচ গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচ (জিএফডব্লিউ)-এর তথ্য বলছে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, কৃষিজমির সম্প্রসারণ, বেআইনি চা বাগান এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের ফলে পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বেশি অরণ্য বিচ্ছিন্নকরণ ঘটেছে এই তরাই–ডুয়ার্স অঞ্চলেই। গত দুই দশকে আলিপুরদুয়ারে প্রায় ৮৭০০ হেক্টর বনভূমি বিলুপ্ত হয়েছে; জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিংয়ে যথাক্রমে ২৮০০ এবং ২১০০ হেক্টর। এর ফলে ঘন বন ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে খোলা বনে— যা জীববৈচিত্র্যের জন্য এক অশনিসংকেত।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নদী ব্যবস্থার গভীর সংকট। শিলিগুড়ি শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া মহানন্দা নদী আজ নগর বর্জ্য ও নিকাশি ব্যবস্থার চাপে কার্যত নর্দমায় পরিণত হওয়ার মুখে। অন্যদিকে, বক্সা বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত জয়ন্তী নদীতে দীর্ঘদিন ড্রেজিং না হওয়ায় নদীতল উঁচু হয়ে উঠেছে; ফলে বর্ষায় সামান্য বৃষ্টিতেই দু’কূল প্লাবিত হয়ে বিপন্নতার শিকার হচ্ছে ‘বক্সা টাইগার রিজার্ভ’-এর মতো উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম জীববৈচিত্র্যের হটস্পট। অবৈধ বালি ও পাথর উত্তোলনের ফলে বালাসন ও রায়ডাক নদীও হারিয়ে ফেলেছে তাদের স্বাভাবিক স্রোতচরিত্র।
তিস্তা, তোর্ষা ও জলঢাকার প্রবাহ আজ পাহাড়ি জলাধার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। অতিভারী বৃষ্টিতে পাহাড়ের জলাধার থেকে জল ছেড়ে দেওয়া হয়। পাশাপাশি অরণ্য ধ্বংসের ফলে মাটির জলধারণ ক্ষমতা কমে গিয়েছে। সমভূমির বৃষ্টির জলের প্রায় সম্পূর্ণটাই পৌঁছে যায় নদীগর্ভে। তাই তো সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই উত্তরবঙ্গ প্লাবিত হচ্ছে। সঙ্গে ক্ষীণ ধারার নদীগুলির আকস্মিক হড়পা তো আছেই।
অথচ এই সবকিছুর মাঝেই আমাদের এক অদ্ভুত নীরবতা কাজ করে। বিপর্যয়কে আমরা কেবল ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ হিসেবেই মেনে নিতে শিখেছি, নীতিগত অপরাধ হিসেবে নয়। এই প্রেক্ষাপটেই ‘দ্য গ্রেট আরাবল্লি মার্চ’-এর তাৎপর্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই আন্দোলন একই সঙ্গে সংগঠিত এবং অসংগঠিত— তবু এর লক্ষ্য স্পষ্ট, ভাষা সচেতন এবং দাবি নির্দিষ্ট। আমরা উত্তরবঙ্গবাসী কি পারি না এমনই এক সচেতন, স্বতঃস্ফূর্ত পরিবেশ আন্দোলন গড়ে তুলতে?
(লেখক শিক্ষক। দিনহাটার বাসিন্দা)
