- গৌতম সরকার
ভেসে যাচ্ছেন প্রচণ্ড। আদর্শহীনতার স্রোতে। নীতিহীনতার স্রোতে। প্রচণ্ডকে চিনতে পারেন? মাওবাদী প্রচণ্ড। কমরেড প্রচণ্ড সম্বোধনে যাঁর খ্যাতি। যে পরিচিতিতে নেপালের সীমান্ত ছাড়িয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের তরুণ প্রজন্মের একাংশের হার্টথ্রব হয়েছিলেন তিনি। গোপন ডেরায় আত্মগোপন করে থেকে নেপালের রাজতন্ত্রবিরোধী কঠোর লড়াইয়ের সেনাপতি প্রচণ্ড। অনেক আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন যিনি।
প্রদীপটা নিভে গিয়েছে অনেকদিন। সুবিধাবাদের হাওয়ায় প্রদীপটা নিভিয়ে দিয়েছেন প্রচণ্ড নিজেই। ফলশ্রুতি? ক্ষমতা হারিয়েছেন। দল ভাগ হয়ে গিয়েছে। তাঁর কবজায় দলের লৌহকঠিন নিয়ন্ত্রণও আর নেই। দলে কমিউনিস্ট তকমাটা শুধু আছে। ভাবাদর্শ আর নেই। ইতিমধ্যে নেপালে জেন জেডের বিদ্রোহের দু’মাস পার। নেপালে সরকারের পতন হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলি কোণঠাসা।
ক’দিন ধরে ভাবছিলাম, প্রচণ্ডর কী হল? পদচ্যুত প্রধানমন্ত্রী আরেক মাওবাদী কেপি শর্মা ওলি তাও মাঝেমধ্যে মিটিং করছেন। কিন্তু প্রচণ্ড? বিদ্রোহে তাঁর দলের সদর দপ্তরের মাথার ওপর থেকে লাল পতাকাটা খুলে ছুড়ে ফেলেছিলেন বিদ্রোহী তরুণরা। সেই প্রচণ্ড এখন কী করছেন? খোঁজ নিতে গিয়ে দেখি, ও হরি, তিনি কালস্রোতে গা ভাসিয়েছেন। কীরকম গা ভাসানো? উনি জেন জেডের বিদ্রোহে সিলমোহর দিয়ে তাদের কাছের লোক হওয়ার চেষ্টা করছেন।
এমন দাবিও করছেন যে, নেপালের দীর্ঘস্থায়ী মাওবাদী ‘বিপ্লবে’-র ধারাবাহিকতার ফসল এই জেন জেড! বাংলায় প্রবাদ আছে, অবোধের গোবধেই আনন্দ। অর্থাৎ অজ্ঞতা ও অকর্মণ্যতা ঢেকে রাখতে বাহাদুরি দেখানো। কমরেড প্রচণ্ডর এখন আরেকটি বাংলা প্রবাদ অনুযায়ী ‘হারায়ে মারায়ে কাশ্যপ গোত্র’ দশা। প্রচলিত বিশ্বাস হল, যিনি নিজের জাত-কুল হারিয়ে ফেলেন, তিনি কাশ্যপ ঋষিকে নিজের পূর্বপুরুষ ঠাউরে আত্মতৃপ্তি লাভ করেন।
আসলে সময়ের স্রোত বড় মারাত্মক। হড়পার মতো। চারপাশের সব ধ্বংস করে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আদর্শ, নীতি ইত্যাদি সেই স্রোতে ভেসে যায়। অপরিকল্পিত উন্নয়ন, নির্মাণ ইত্যাদি হড়পা, ধস ডেকে আনে। ক্ষমতার লোভ, দুর্নীতি, ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা, বিলাসের লালসা ইত্যাদি তেমন মতাদর্শের ভিতকে ঝুরঝুরে করে দেয়। জন অসন্তোষের স্রোত তীব্র হলে সেই ভিতকে ফোঁপরা করে দেয়। শেষপর্যন্ত ধাক্কায় ভেঙে পড়ে কিংবা ভেসে যায়।
মাওবাদী তকমাধারীদের ভিত আমাদের দেশেও ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছে। প্রমাণ? অক্টোবর মাসজুড়ে মাওবাদীদের আত্মসমর্পণের হিড়িক। অমিত শা’র মাওবাদমুক্ত ভারত গঠনের ধাক্কায় নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে প্রায় ৩০০ জন অস্ত্র নামিয়ে রেখে প্রশাসনের ঘেরাটোপে নিরাপদ জীবন শুরু করলেন। চুলোয় যাক মাওবাদ! একের পর এক আত্মসমর্পণের খবর আসতে থাকায় আমার এক সহকর্মী প্রশ্ন করলেন, কী হল তাহলে এত দীর্ঘ লড়াইয়ের!
ওই সহকর্মী মাওবাদের সমর্থক নন। কিন্তু মাওবাদী বলে যাঁরা নিজেদের দাবি করতেন, তাঁদের ত্যাগ, নিষ্ঠা ও আদর্শের প্রতি আনুগত্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। এরকম লোকের সংখ্যা কম নয়। বাস্তবে এই তথাকথিত মাওবাদীরা অনেকদিনই আদর্শচ্যুত, নীতিভ্রষ্ট। জঙ্গলে লুকিয়ে থেকে মানুষের থেকে দূরে সরে গিয়ে মাঝেমধ্যে দু’-একটা নাশকতায় আর যাই হোক, ক্ষমতা দখল দূরের কথা, কোনও ভালো কাজই হয় না।
ভোটের রাজনীতির মোহে মাওবাদীদের একাংশ আবার জাতপাত, দুর্নীতির সঙ্গে আপস করছে। উদাহরণ বিহার। নকশালপন্থীদের একাংশ লালুপ্রসাদদের জাতপাতের ভোটের অঙ্কে গা ভাসাচ্ছে। পশুখাদ্য কেলেঙ্কারির মতো চরম অন্যায়ে দাগি লালুপ্রসাদদের সঙ্গে দীপঙ্কর ভট্টাচার্যরা জোট করেছেন ভোটে অন্তত কয়েকটি আসন জেতার লোভে। জিতলে হয়তো সাম্প্রদায়িকতারই আরেক রূপ জাতপাতের কাণ্ডারীদের হাত ধরে সরকারের মন্ত্রী হবেন। এ দোষে দুষ্ট অবশ্য শুধু মাওবাদীরা নন, অন্য বাম দলগুলিও।
বিহারে আরজেডি-কংগ্রেসের জোটসঙ্গী সিপিএম, সিপিআই-ও। সাম্প্রদায়িকতার পাশাপাশি জাতপাতের সমীকরণকে ছিন্ন করার মতাদর্শ থেকে দূরে সরে এই দলগুলি দুর্নীতিবাজদের সঙ্গে আপস করছে। বাংলায় বামেদের কাছে কংগ্রেস আর অচ্ছুত নয় অনেকদিন। আবার বামেদের একাংশের রামনাম জপ করার ঘটনাও কম নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একক নেতৃত্বে ৩৪ বছরের শাসনটা উচ্ছেদ হয়ে যাওয়ায় এরাজ্যের বামেদের কাছে তৃণমূল কার্যত ‘জাতশত্রু।’
সেই রাগে গায়ের জ্বালা মেটাতে (যার মধ্যে আদর্শের তিলমাত্র ছিল না) ২০১৬-তে ‘আগে রাম, পরে বাম’ জিগির ছড়িয়ে পড়েছিল। নেতৃত্বের একাংশের প্রশ্রয়ে, মদতে সেই জিগির পুষ্ট হয়েছিল। পরিণামে খগেন মুর্মু, শংকর ঘোষ, বঙ্কিম ঘোষদের মতো হার্ডকোর সিপিএম নেতারা এখন বিজেপির গলায় মালা হয়ে শোভা পাচ্ছেন। তৃণমূলকে উৎখাত করার উদগ্র স্বপ্নে লঘু হয়ে গিয়েছে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধিতা। আদর্শভ্রষ্ট হওয়ার সমস্ত লক্ষণ স্পষ্ট।
সদ্য সিপিএমের পার্টি চিঠিতে আক্ষেপ করা হয়েছে, শত চেষ্টাতেও নতুন প্রজন্মকে দলে টানা গেল না। মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়, কলতান দাশগুপ্ত, প্রতীক উর রহমান, সৃজন ভট্টাচার্য, দীপ্সিতা ধর, ঐশী ঘোষদের মতো একঝাঁক উজ্জ্বল তারকাকে নেতৃত্বে ঠঁাই দিলেও দলে দলে তরুণ প্রজন্ম সিপিএমে যোগ দেয়নি। অতীতে আদর্শের টানে তরুণরা দলে নাম লেখাতেন। বাম জমানায় চাকরি, লাইসেন্স ইত্যাদির আকর্ষণে কেউ কেউ দলের সঙ্গে গা ঘষাঘষি করতেন।
এখন আদর্শের টান নেই, পাওয়ার আশা নেই। বিকল্প হিসেবেও এমন ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না বামেরা যাতে তরুণদের আস্থা অর্জন করা যায়। বরং নেতৃত্বের একাংশের ‘এমনি করেই যায় যদি দিন যাক না’ গোছের মনোভাব, জনমত সংগঠিত করার পরিশ্রমে অনীহা ইত্যাদি স্পষ্ট। ৩৪ বছরে সুবিধাবাদের মেদে আক্রান্ত বামেদের একাংশের আপস করে নিজেকে নিরাপদ রাখার আদর্শহীন মনোভাব তরুণ প্রজন্মের কাছে কোনও উদাহরণ তৈরি করতে পারছে না। আদর্শের নাম করে স্রোতে ভেসে থাকাই এখন দস্তুর।
