শাঁওলি দে
একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকটি ছিল পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা মানচিত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণ। বিশেষত ২০১০ পরবর্তী সময়ে ‘শিক্ষার অধিকার আইন-২০০৯’ কার্যকর হওয়ার পর গ্রামীণ ভারতের প্রান্তিক শিশুদের জন্য শিক্ষার অবারিত দ্বার উন্মোচিত হয়। ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সি প্রতিটি শিশুর বিদ্যালয়ে উপস্থিতি সুনিশ্চিত করতে রাজ্যজুড়ে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য উচ্চপ্রাথমিক বা আপার প্রাইমারি বিদ্যালয়। লক্ষ্য ছিল অত্যন্ত স্বচ্ছ ও জনকল্যাণমুখী- প্রত্যন্ত গ্রামবাংলায় ‘ঘরের কাছে স্কুল’ ধারণাটিকে পৌঁছে দেওয়া। সেই সময়ে গ্রামীণ জনপদে প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও পঞ্চম শ্রেণি থেকে পড়ার জন্য হাইস্কুল ছিল বহু দূরে। সেই দুর্লঙ্ঘ্য পথের দূরত্ব ঘোচাতে এই জুনিয়ার হাইস্কুলগুলি ছিল আশীর্বাদের মতো। শুরুর দিনগুলিতে এই বিদ্যালয়গুলি ছিল প্রাণচঞ্চল। বিষয়ভিত্তিক পাঁচজন শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মী নিয়ে এক একটি আদর্শ প্রতিষ্ঠান গড়ার স্বপ্নে রাষ্ট্রও ছিল সদিচ্ছায় ভরপুর। মিড-ডে মিলের সুঘ্রাণ আর শ্রেণিকক্ষের পাঠদান- সব মিলিয়ে এক নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখেছিল বাংলার গ্রামগুলি।
প্রযুক্তির অগ্রগতি ও অস্তিত্বের গভীর সংকট
সময়ের চাকা ঘুরল অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে। বিশেষত কোভিড পরবর্তী সময়কাল আমাদের সামনে এক রূঢ় বাস্তবতা নিয়ে হাজির হল। বিশ্ব যখন প্রযুক্তির হাত ধরে কয়েক ধাপ এগিয়ে গেল, ঠিক তখনই গ্রামীণ শিক্ষার বুনিয়াদ অলক্ষে নড়বড়ে হতে শুরু করল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস এই যে, গত এক দশকে গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার যে অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে, তা-ই এই বিদ্যালয়গুলির জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল। আগে যে পথের দূরত্বের ভয়ে পড়ুয়ারা স্থানীয় স্কুলে ভিড় করত, এখন মসৃণ রাস্তায় টোটো বা অটোয় চড়ে তারা অনায়াসেই দূরের নামী হাইস্কুল বা শহরের ইংরেজিমাধ্যম স্কুলে পৌঁছে যাচ্ছে। অভিভাবকদের মনে এক ভ্রান্ত ধারণা দানা বেঁধেছে যে, চাকচিক্যই বোধহয় গুণমানের একমাত্র মাপকাঠি। ফলে স্থানীয় ‘মাটির স্কুল’ আজ নিজভূমেই পরবাসী। এই মানসিকতার পরিবর্তন গ্রামীণ উচ্চপ্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিকে এক ভয়াবহ অস্তিত্বের সংকটে ঠেলে দিয়েছে।
প্রশাসনিক জটিলতা ও স্কুল বদলের মনস্তাত্ত্বিক ভীতি
সংকটের এই আগুনে ঘি ঢেলেছে কিছু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও অভিভাবকীয় দুশ্চিন্তা। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিতে পঞ্চম শ্রেণিকে যুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যদিও এটি বাধ্যতামূলক নয়, তবুও এর ফলে এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। একজন অভিভাবক যখন দেখেন যে, প্রাথমিকে পঞ্চম শ্রেণি পড়ার পর উচ্চপ্রাথমিকে মাত্র তিন বছরের (ষষ্ঠ থেকে অষ্টম) জন্য ভর্তি হতে হবে এবং ফের নবম শ্রেণিতে গিয়ে নতুন স্কুল খুঁজতে হবে, তখন তিনি স্বাভাবিকভাবেই বিমুখ হন। বারবার স্কুল বদলের এই ঝক্কি এড়াতে অভিভাবকরা ষষ্ঠ শ্রেণিতেই সরাসরি এমন কোনও বড় হাইস্কুলে সন্তানদের ভর্তি করিয়ে দিচ্ছেন, যেখানে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার নিশ্চিত সুযোগ রয়েছে। এই ‘বারবার স্কুল বদল’-এর মনস্তাত্ত্বিক ভীতিই জুনিয়ার হাইস্কুলগুলিকে ক্রমে ছাত্রশূন্য করে তুলছে, যা কোনওভাবেই কাম্য ছিল না।
শিক্ষক শূন্যতা ও পরিকাঠামোগত কঙ্কালসার দশা
বিদ্যালয়গুলির প্রাণভোমরা হলেন শিক্ষক-শিক্ষিকা। কিন্তু বর্তমানে শিক্ষক নিয়োগ ও বদলি প্রক্রিয়ার জটিলতায় বহু বিদ্যালয়ের স্টাফরুম আজ বিমর্ষ ও জনশূন্য। ‘উৎসশ্রী’ বা অন্যান্য বদলি প্রকল্পের সুবিধা নিয়ে বহু শিক্ষক সুবিধাজনক স্থানে চলে গিয়েছেন, কিন্তু সেই শূন্যপদ পূরণের উদ্যোগ স্তিমিত। কোথাও একজন বা মেরেকেটে দুজন শিক্ষক দিয়ে ধুঁকছে আস্ত একটি প্রতিষ্ঠান। অধিকাংশ স্কুলে গ্রুপ-ডি কর্মীর পদ শূন্য। পরিস্থিতি এমন যে, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষার ধারণাটি আজ প্রহসনে পরিণত হয়েছে। একজন শিক্ষককেই সাহিত্য থেকে বিজ্ঞান, অঙ্ক থেকে সমাজতত্ত্ব- সবই পড়াতে হচ্ছে। যখন সচেতন অভিভাবকরা দেখেন যে স্কুলে নির্দিষ্ট বিষয়ের শিক্ষক নেই, তখন তাঁরা দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নেন। ফলে ছাত্র ও শিক্ষক সংখ্যা হ্রাসের এক বিষাক্ত চক্রে আটকে পড়েছে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি। পরিকল্পনার অভাবে একই এলাকায় একাধিক সমধর্মী প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠাও এই সংকটের অন্যতম কারণ।
সামাজিক দায়বদ্ধতা ও অভিভাবকীয় উদাসীনতা
এই সংকটের জন্য কি কেবল ব্যবস্থাই দায়ী? সমাজ বা অভিভাবকদের কি কোনও দায় নেই? গ্রামবাংলার প্রান্তিক জনপদে আজও ‘পাঠ’-এর চেয়ে ‘পেট’-এর দায় অনেক বড় হয়ে দেখা দেয়। খাতায়-কলমে পড়ুয়া থাকলেও চাষের মরশুমে বা সাংসারিক কাজে সাহায্য করতে গিয়ে বহু ছাত্রছাত্রী স্কুলবিমুখ হয়। এর ওপর যুক্ত হয়েছে ‘নো ডিটেনশন পলিসি’ বা পাশ-ফেল প্রথা না থাকার কুপ্রভাব। অনেক অভিভাবকই মনে করেন, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত যখন পাশ করা নিশ্চিত, তখন নিয়মিত স্কুলে যাওয়ার প্রয়োজন কী? এই উদাসীনতা ও শিক্ষার প্রতি অগভীর দৃষ্টিভঙ্গি গ্রামীণ শিক্ষার মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। শিক্ষক যখন দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে প্রচার চালান, সেই সচেতনতাও স্থায়িত্ব পায় না। গ্রামের মানুষের বোঝা উচিত, একটি স্কুল বন্ধ হওয়া মানে কেবল একটি সরকারি দপ্তরের বিলুপ্তি নয়, বরং সেটি সেই জনপদের বৌদ্ধিক পরাজয় ও ভবিষ্যতের অন্ধকার।
উত্তরণের পথ ও আগামীর কর্তব্য
শিক্ষাঙ্গন একটি সমাজের বাতিঘর। সেই বাতিঘর নিভে গেলে অন্ধকার কেবল বর্তমান প্রজন্মের জীবনেই নামে না, বরং সমগ্র জনপদটি তিমিরে তলিয়ে যায়। উচ্চপ্রাথমিক বিদ্যালয়গুলি নিছক পরিসংখ্যান বাড়াতে তৈরি হয়নি, এর পেছনে ছিল একটি পিছিয়ে পড়া প্রজন্মকে মূলস্রোতে ফেরানোর স্বপ্ন। বর্তমানের এই ক্রান্তিলগ্নে শিক্ষক ও অভিভাবককে একে অপরের প্রতিপক্ষ না হয়ে পরিপূরক হতে হবে। তথাকথিত গ্ল্যামারের মরীচিকার পেছনে না ছুটে অভিভাবকরা যদি স্থানীয় স্কুলের মানোন্নয়নে সচেষ্ট হন এবং সন্তানকে নিয়মিত স্কুলে পাঠান, তবেই ছাত্রসংখ্যার চাপে সরকারও শিক্ষক নিয়োগে বাধ্য হবে। এখনও সময় আছে সচেতন হওয়ার। আজ যদি আমরা আমাদের ঘরের কাছের এই শিক্ষার মন্দিরগুলোকে রক্ষা করতে না পারি, তবে চওড়া রাস্তা আর ঝাঁ চকচকে বাড়ি হলেও সমাজটি মানসিকভাবে পিছিয়েই থাকবে। আগামী প্রজন্মের কাছে অপরাধী হওয়ার আগেই আমাদের সম্মিলিতভাবে এই বিপন্ন শিক্ষা ব্যবস্থাকে টেনে তুলতে হবে।
(লেখক শিক্ষক ও অক্ষরকর্মী।)
