লা নিনার দৌলতে এবার ঠান্ডা যে অনেক বেশি পড়বে, বর্ষাকাল থেকেই তার পূর্বাভাস শোনা যাচ্ছিল। আবহাওয়া তার কথা রেখেছে। নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ পেরোতেই একটু একটু করে ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছিল। বছর শেষে কলকাতায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমেছে।
এই হাড়কাঁপানো শীতে ফুটপাথবাসী মানুষের যেমন খুব দুর্ভোগ, তেমনই রাস্তার কুকুর, বিড়ালদের অবর্ণনীয় কষ্ট। গভীর রাতে কনকনে ঠান্ডায় রাস্তার কুকুর-বিড়ালদের তীব্র আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে। তাতে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে বহুতলের ফ্ল্যাটে লেপ-কম্বল মুড়ি দিয়ে থাকা লোকজনের। দিনকয়েক আগে হাওড়ায় জগাছার হাটপুকুর এলাকায় মধ্যরাতে একটানা আর্তনাদে বিরক্ত লোকজন তেল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় মাদি কুকুর ও তার চার শাবকের গায়ে।
পুড়ে মারা যায় চারটি ছানাই। মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে গুরুতর দগ্ধ মাদি কুকুরটি। এই নিষ্ঠুর, মর্মান্তিক ঘটনা জানাজানি হতে শোরগোল পড়েছে। ঘটনাটির নিন্দা করেছে বিভিন্ন পশুপ্রেমী সংগঠন। পুলিশ ভারতীয় ন্যায় সংহিতার সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী মামলা দায়ের করেছে। দোষীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত শাস্তির দাবি উঠেছে। পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ উদ্ধার করেছে।
কিন্তু দেখা যাচ্ছে, অপরাধীরা যথেষ্ট চিন্তাভাবনা করে এই জঘন্য কাণ্ড ঘটিয়েছে। কারণ, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গিয়েছে, স্থানীয় যে বাসিন্দারা রাস্তায় দাঁড় করানো গাড়ির তেলের ট্যাংক থেকে পেট্রোল-ডিজেল বের করে কুকুরদের গায়ে ঢালছেন এবং আগুন ধরাচ্ছেন, তাঁদের সকলের মুখ কাপড় দিয়ে ঢাকা। হাওড়ার মমতাময়ী মা নামে একটি পশুপ্রেমী সংগঠন প্রথম এই ঘটনা নিয়ে সরব হয়।
পুলিশ ঘটনার কথা জানতে পারে ওই সংগঠনের মাধ্যমে। মাদি সারমেয়র চিকিৎসার দায়িত্ব ওই সংগঠন নিয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় রাস্তার কুকুরদের ওপর মানুষের নৃশংস অত্যাচারের ঘটনা মাঝেমধ্যে দৈনিক সংবাদপত্রের খবর হয়। হঠাৎ হঠাৎ খবর চোখে পড়ে যে, কোনও কোনও অঞ্চলে বিষ মেশানো খাবার খাইয়ে একসঙ্গে ছয়-সাতটি কুকুরকে মেরে ফেলা হয়েছে।
দীপাবলিতে অথবা বছর শেষের কিংবা বর্ষবরণের রাতে শব্দবাজির দাপটে কুকুর-বিড়ালের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে পড়ে। আবার কখনও দেখা যায়, কুকুরের লেজে চকোলেট বোম বেঁধে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সে এক চরম অমানবিকতার উদাহরণ। নির্দয়, নিষ্ঠুর মানুষের কাছে যেটা খেলা, সেটা পশুর পক্ষে প্রাণঘাতী। যে কোনও ধর্ষণ-গণধর্ষণের ঘটনাকে পাশবিক অত্যাচার বলা যেন নিয়ম হয়ে গিয়েছে। বাস্তবে তাতে পশুদের অমর্যাদা করা হয়। পশুকুলে কোনও অহেতুক হিংসা নেই। মানুষই বরং বেশি নিষ্ঠুর, হৃদয়হীন।
পাড়ায় পাড়ায় এখন কুকুর তথা পশুপ্রেমী মানুষের অভাব নেই। মেট্রো হোক বা মফসসল- অনেক পরিবারকে দেখা যায় রোজ রাতে পথকুকুরদের খাওয়াতে। বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, রাস্তার কুকুরদের নিয়ে গৃহকর্ত্রীর ‘আদিখ্যেতায়’ গৃহকর্তা যারপরনাই বিরক্ত। তা সত্ত্বেও গৃহকর্ত্রী যথেষ্ট নিষ্ঠার সঙ্গে কুকুরদের খাওয়ানোর কাজটা আন্তরিকতার সঙ্গে করে যান।
গ্রাম থেকে শহর, সর্বত্র মানুষের এব্যাপারে সচেতনতা বাড়ছে। ভারতে পশুদের প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ আইন (১৯৬০) রয়েছে। আইন সংশোধন করে জরিমানা ও কারাদণ্ডের মেয়াদও বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এই আইন প্রয়োগে গয়ংগচ্ছ মনোভাব এবং সমাজের একাংশের নিষ্ঠুরতার কারণে খুব একটা সফলতা আসে না।
এতসবের পরেও বহু জায়গায় গভীর রাতে দেখা যায়, মাঝবয়সি মহিলা পাড়ার এ গলি ও গলি ঘুরে বেড়াচ্ছেন, কুকুরদের খাইয়ে বেড়াচ্ছেন আর কুকুররা সেই মহিলার পিছন পিছন হাঁটছে। আবার কখনও দেখা যায়, ঠান্ডায় যাতে কষ্ট না পায়, তার জন্য পাড়ার নেড়ি কুকুরটির গায়ে কেউ একটা সোয়েটার পরিয়ে দিয়েছেন বা কম্বল জড়িয়ে দিয়েছেন। সমাজে দৈনন্দিন জীবনে অনেক খারাপ কিছুর মধ্যে মাঝেমধ্যে এমন ভালো মুহূর্তগুলো মন ভালো করে দেয় আমাদের।
The put up অমানবিক appeared first on Uttarbanga Sambad.
