ইরানে আমেরিকা ও ইজরায়েলের অভিযান কূটনীতিকে একেবারে সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে পৌঁছে দিয়েছে। এই সময় ভারতের অবস্থান ঠিক কী হলে উনুনের আঁচের ঝাঁজ কমবে না– সেই প্রশ্ন ভাবাচ্ছে সকলকে। অবশেষে, সংসদে এ বিষয়ে মুখ খুলেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। পরিস্থিতি ভারতের পক্ষে খুবই ‘উদ্বেগজনক’ বলে জানিয়েছেন। সমস্যাটি দীর্ঘস্থায়ী বলেও উল্লেখ করেছেন মোদি। এই সময় ধারাবাহিক কূটনীতিই যে একমাত্র পথ– সেই কথাও বলতে ভোলেননি তিনি। মোদি সংসদে এসব মন্তব্য করার পরেই অভিযানের গতি কিছুটা শ্লথ করার বার্তা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আপাতত কয়েক দিন ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলিতে হানা স্থগিত করেছে আমেরিকা। যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য ইরানের সঙ্গে আলোচনাও ইতিবাচক বলে ট্রাম্পের ইঙ্গিত। ট্রাম্পের এসব বার্তার পরেই আন্তর্জাতিক বাজারে কিছুটা নেমেছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম।
ট্রাম্প যে ইরান অভিযান নিয়ে তাঁর নিজের দেশে ভয়াবহ চাপের মুখে– তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিছু কট্টরপন্থী রিপাবলিকান নেতা ছাড়া আমেরিকাতেও কেউ ট্রাম্পের ইরান অভিযানের সমর্থনে নেই। ট্রাম্পের দফতরের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক কয়েক দিন আগে এই অভিযানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে পদত্যাগ করেছেন। সিআইএ-র এক প্রাক্তন কর্তাও যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মুখ খুলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, এই যুদ্ধের জন্য ট্রাম্প একমাত্র দায়ী। তাঁর মতে, যুদ্ধে যা ভাবা গিয়েছিল, তার উল্টো হয়েছে। অর্থাৎ, ইরানে আমেরিকা যে ‘রেজিম চেঞ্জ’ করতে চেয়েছিল, তা তো হয়েইনি, উল্টে তেহরানের মসনদে আরও কট্টর মার্কিন বিরোধী নেতার উত্থান ঘটেছে। আমেরিকা সৈয়দ আলি আয়াতোল্লা খামেনেইকে খতম করতে পেরেছে ঠিকই। কিন্তু তাঁর ইসলামি শাসনকে শেষ করা যায়নি। খামেনেইয়ের মৃতু্যর পর তাঁর পুত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতার আসনে বসেছেন। যিনি কিনা অারও কট্টরপন্থী। আরও বেশি আমেরিকা ও ইজরায়েলের বিরোধী।
খামেনেইদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে ইরানের সাধারণ মানুষ পথে নেমেছিল। ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসক বদল হয়তো তারা-ই করে ফেলত। কিন্তু অামেরিকার হস্তক্ষেপে উল্টোটা ঘটে গেল। ইরানের সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অান্দোলনটাই পিছু হটে গেল। মার্কিন আক্রমণে খামেনেইয়ের মৃত্যু তাঁকে শহিদের মর্যাদা দিল। একই সঙ্গে যুদ্ধ ইরানের মানুষের দেশাত্মবোধকে জাগিয়ে তুলল। সব মিলিয়ে ইরানের ইসলামপন্থী শাসকরা তাঁদের পায়ের তলায় মাটি ফিরে পেয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। জাতীয়তাবাদী জিগির তুলে কট্টরপন্থীরা তঁাদের জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছেন। তেহরানের রাস্তায় রোজ যে হাজার-হাজার মানুষের মার্কিন বিরোধী মিছিল দেখা যাচ্ছে, তাতে বোরখা পরিহিত মহিলাদের অাধিপত্য। ইরানের ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ও মুক্তমনাদের উপর এবার অাক্রমণ যে অারও বাড়বে– তা বলা যায়। খামেনেই-পুত্র এই যুদ্ধের মধে্যও প্রতিবাদীদের মৃতু্যদণ্ড কার্যকর করা শুরু করেছেন।
ট্রাম্প যে ইরান অভিযান নিয়ে তাঁর নিজের দেশে ভয়াবহ চাপের মুখে– তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিছু কট্টরপন্থী রিপাবলিকান নেতা ছাড়া আমেরিকাতেও কেউ ট্রাম্পের ইরান অভিযানের সমর্থনে নেই।
ট্রাম্পের তল্পিবাহক হতে গিয়ে মাঝখান থেকে বিপদ বেড়েছে ভারতের। কোন কূটনীতি এখন ভারতকে এই পরিস্থিতি থেকে বের করে আনতে পারে– তা স্পষ্ট হচ্ছে না। কূটনীতি থেকে যদি নৈতিক অবস্থানের বিষয়টি বর্জন করা হয়, তাহলেই একমাত্র এইরকম পরিস্থিতি দেখা যেতে পারে। মোদি নিজে সংসদে ভারতের বিপদের কথা স্বীকার করেছেন। সংকট যে প্রবল হতে পারে, তা উপলব্ধি করছেন প্রত্যেকে। মোদি নিজে বারবার কোভিড পরিস্থিতির তুলনা টেনেছেন। এখন বিপাকে পড়েই হয়তো তাঁকে এইভাবে মুখ খুলতে হচ্ছে। যুদ্ধ দ্রুত বন্ধ হওয়ার পক্ষে সওয়াল করতে হচ্ছে। অথচ, যুদ্ধ শুরুর মুখে মোদির হিরণ্ময় নীরবতাকেই ভারতের তুরুপের তাস বলে দেখানো হচ্ছিল। বেআইনি অভিযান নিয়ে খোদ অামেরিকায় যখন সবাই সরব, তখন মোদি-শিবির থেকে এটাই বোঝানোর চেষ্টা চলছিল যে, ভারত চুপ করে থেকে তাদের নিরপেক্ষতাকে তুলে ধরছে। এতে ট্রাম্পের সঙ্গে ভারতের সখ্য অটুট থাকবে এবং ভারত আর্থিকভাবে সুবিধা পাবে। আর্থিক সুবিধা বলতে এখনও পর্যন্ত ভারত রাশিয়ার তেল কেনার ক্ষেত্রে আমেরিকার কাছ থেকে ৩০ দিনের একটি ছাড় পেয়েছে।


মোদি যখন সংসদে দাঁড়িয়ে দেশের অর্থনীতির সামনে আসন্ন বিপদের কথা বলছেন, তখন বোঝা যাচ্ছে, মৌন অবলম্বনের বিনিময়ে আমেরিকার কাছ থেকে কোনও সুবিধাই মিলছে না। আয়াতোল্লা খামেনেইয়ের মৃত্যুর পরও ভারত ৫ দিন চুপ করেছিল। তার চেয়েও বড় ঘটনা হল, ভারতের আতিথেয়তা নিয়ে ফেরার পথে ইরানের রণতরি যখন শ্রীলঙ্কার উপকূলে মার্কিন টর্পেডোর মুখে পড়ল, শতাধিক ইরানি নৌসেনার মৃত্যু ঘটল, তখনও নিন্দায় সরব হল না দিল্লি। অর্থাৎ, মোদির কূটনীতিতে নৈতিকতার কোনও স্থান নেই। ভারতের নীতি হল, নিজেদের সুবিধা বুঝে সরব হতে হবে, কিংবা নীরব থাকতে হবে। এই ধরনের কূটনীতি যে কোনও স্থায়ী ফল দিতে ব্যর্থ হচ্ছে, তা বলা বাহুল্য।
বেআইনি অভিযান নিয়ে খোদ আমেরিকায় যখন সবাই সরব, তখন মোদি-শিবির থেকে এটাই বোঝানোর চেষ্টা চলছিল যে, ভারত চুপ করে থেকে তাদের নিরপেক্ষতাকে তুলে ধরছে।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিও মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে ‘ন্যাটো’ সদস্যদের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি দিয়ে কার্যত বলেছিলেন, প্রত্যেককে স্বাধীন বিদেশনীতি ছেড়ে আমেরিকার কথায় চলতে হবে। তাঁর কথায়, ‘ইউরোপ যদি ন্যাটোতে পর্যাপ্ত খরচ না করে, তবে আমেরিকাই নিজের বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলবে।’ ইরান যুদ্ধে দেখা-ই গেল ট্রাম্প প্রতিদিন ‘ন্যাটো’ সদস্যদের যুদ্ধে নামার জন্য হুমকি দিচ্ছেন। একমাত্র ব্রিটেন ছাড়া কেউ এগিয়ে যায়নি। নীরব থেকে ভারত ট্রাম্পের অভিযানে আসলে সমর্থন জানিয়েছে। কিন্তু ব্রাজিল, দক্ষিণ অাফ্রিকার মতো ভারতের ‘ব্রিক্স’ সহযোগীরা আগাগোড়া ইরান অভিযানের বিরুদ্ধে সোচ্চারে প্রতিবাদ জানিয়ে যাচ্ছে। মধ্য এশিয়ায় এক কোটি ভারতীয় বাস করেন। তাঁরা তাঁদের উপার্জনের যে-টাকা দেশে পাঠান, তা ভারতীয় অর্থনীতিতে বিরাট অবদান রাখে। তাঁদের সুরক্ষাও এই মুহূর্তে ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সুতরাং ভারতের কূটনীতি আমেরিকার প্রতি একতরফা হলে এদিক থেকেও বিপদের সম্ভাবনা।
আপাতত ভারত অপারেশন সংকল্প শুরু করেছে। ভারত ঘোষণা করেছে– তারা নিজেরাই তাদের জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে হরমুজ প্রণালী পার করাবে। প্রয়োজনে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ফিরিয়ে আনবে ভারতীয়দের। অনেকটা ‘একলা চলো’ নীতি। মোদির এই কূটনীতি এখন কার্যকর হয় কি না, তা দেখার।
সর্বশেষ খবর
