অন্য এক লড়াইয়ে সবাইকে সঙ্গী চাই

অন্য এক লড়াইয়ে সবাইকে সঙ্গী চাই

শিক্ষা
Spread the love


 

  • অরিত্র রায়

সমাজে আমরা প্রায়ই ‘প্রতিবন্ধী’ শব্দটিকে দুর্বলতার প্রতীক মনে করি, কিন্তু প্রতিদিন অগণিত বাধার মুখোমুখি হওয়া এই মানুষগুলোই সবচেয়ে শক্তিমান। তাঁদের মধ্যে কেউ চোখের আলো হারিয়েছেন, কেউ হুইলচেয়ারে জীবনযাপন করছেন, আবার কেউ কথার উচ্চারণে আটকে যান— তবুও সকলের স্বপ্ন আছে, নিজের জায়গা তৈরি করার সাহস আছে।

প্রতিবন্ধকতার অসুবিধার চেয়েও বড় অসুবিধা হল সমাজের ভুল মানসিকতা। অনেকে তাঁদের দিকে করুণা নিয়ে তাকায়, যেন তাঁরা কিছু করতে পারেন না। তাঁদের প্রয়োজন করুণা নয়, বোঝাপড়া এবং সম্মান। সমাজের এই ভুল দৃষ্টিভঙ্গি তাঁদের মনকে সবচেয়ে বেশি আঘাত করে। ‘আহা-উঁহু’ বলে সহানুভূতি প্রদর্শন নয়, পরিবর্তন আসে হাতে হাত রেখে পাশে দাঁড়ালে।

এই কঠিন যুদ্ধের মাঝে প্রকৃত বিশেষভাবে সক্ষমরা এক ভয়ানক শত্রুর মুখোমুখি। ভুয়ো প্রতিবন্ধী সার্টিফিকেটধারীরা সংখ্যায় বাড়ছে। যে সার্টিফিকেট একজনের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কঠিন বাস্তবতার প্রতীক, তাকেই অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও অনেকে সরকারি সুবিধা, চাকরির রিজার্ভেশন, বা আর্থিক সাহায্য পাওয়ার লোভে ভুয়ো সার্টিফিকেট বানাচ্ছে। এর ফলে একজন প্রকৃত দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থী, একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী তরুণ বা একজন লার্নিং ডিজেবিলিটিতে ভোগা শিশুর সুযোগ ও অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। একজন প্রকৃত প্রতিবন্ধী দিনের পর দিন নিজেকে প্রমাণ করে বাঁচে, অথচ তার সুযোগটি পেয়ে যাচ্ছে একজন স্বাভাবিক মানুষ, যে শুধু কাগজে-কলমে ‘প্রতিবন্ধী’। ভুয়ো সার্টিফিকেটধারীরা শুধু আইন ভাঙছে না, তারা এমন একটি শ্রেণির মানুষদের ক্ষতি করছে, যারা সমাজের সবচেয়ে কঠিন অবস্থায় বেঁচে আছে।

একজন প্রতিবন্ধী প্রাপ্তবয়স্ক হলে তার নিজের খরচ, চিকিৎসা ও প্রয়োজন বাড়ে। তবুও সরকার তার ব্যক্তিগত প্রতিবন্ধী পরিচয়ের পরিবর্তে পরিবারের আয় দেখে টাকা বা স্কলারশিপ দেয়। এটা কোথায় যেন অন্যায়। কারণ প্রতিবন্ধকতার কষ্ট পরিবারের আয় দেখে কমে না; ওষুধ, থেরাপি, এবং অন্যান্য প্রয়োজন একই থাকে। জীবনের সত্যিটা খুব কঠিন। বিশেষভাবে সক্ষমদের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা থাকা উচিত সমাজ আর দেশের হাতে। কিন্তু বাস্তবে তাকে নির্ভর করতে হয় সেই পরিবারের ওপর, যা চিরস্থায়ী নয়। সরকার যদি একটুও ভেবে থাকে, তবে সাহায্য ও সুযোগ সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। কোনও অধিকারকে পরিবারের আয় দিয়ে মাপা বা কোনও লড়াইকে কাগজের সংখ্যার সঙ্গে বেঁধে রাখা আক্ষরিক অর্থেই অমানবিক।

‘বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস’ কোনও বক্তৃতার দিন নয়, এটি এক নীরব সত্য। দিনটি সমাজের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তোলে : ‘আজ আমরা সত্যিই মানুষ, নাকি শুধু মানুষ হওয়ার অভিনয় করে চলছি দিনের পর দিন?’ আমাদের অন্ধত্ব চোখে নয়, চিন্তায়; বধিরতা কানে নয়, বিবেকে; পঙ্গুত্ব শরীরে নয়, আমাদের ব্যবহারে। আমরা সহানুভূতি দেখাই, কিন্তু সম্মান এবং পরিচয় দিতে এখনও কুণ্ঠাবোধ করি। এই দিনটি আমাদের ঘুম ভাঙানো এক চপেটাঘাত, যা বলে ‘আমরা কি সত্যিই তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছি, নাকি শুধু দূর থেকে করুণার চোখে দেখছি?’

(লেখক অক্ষরকর্মী বিশেষভাবে সক্ষম শিলিগুড়ির বাসিন্দা)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *