- মৈনাক মজুমদার
খুব সহজে একটি গান তৈরি করে ফেলা আজকাল হয়তো কোনও ব্যাপারই নয়।
গত কয়েক বছর ধরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই গানের জগতে একটি বিশাল পরিবর্তন এনেছে, যা আমরা এখন খুব সহজে দেখতে পাচ্ছি। এই পরিবর্তনটি এত দ্রুত হচ্ছে যে এটি এখন আর আলোচনার বিষয় নয়, বরং বাস্তব। সুনো (Suno), ইউডিও (Udio), সাউন্ড্র (Soundraw) -এর মতো আধুনিক টুলগুলি এখন মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কণ্ঠস্বর, মিউজিক ট্র্যাক এবং গান তৈরির সব কাজ গুছিয়ে ফেলতে পারে, যেমন: গানের মেজাজ ঠিক করা, বিভিন্ন যন্ত্রের শব্দ মেলানো, এমনকি দুটি আলাদা ধরনের গানকে একসঙ্গে জুড়ে দেওয়া। এই কারণে স্পটিফাই (Spotify), ইউটিউব মিউজিক (YouTube Music), অ্যাপল মিউজিক (Apple Music) -এর মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলিতে এআই দিয়ে তৈরি গানের সংখ্যা খুব দ্রুত বাড়ছে এবং আক্ষরিক অর্থেই বাজারের একটি বড় অংশ দখল করে নিচ্ছে। এই প্রযুক্তি যেমন অনেক সুবিধা এনেছে, তেমনই সুরকারদের মনে অনেক ভয় এবং সমস্যা তৈরি করেছে।
এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় এবং ইতিবাচক দিকটি হল গান তৈরির খরচ এবং সময় খুব তাড়াতাড়ি কমে আসা। আগে একটি ভালো গান বানাতে প্রচুর টাকা এবং প্রায় এক মাসের মতো সময় লাগত। কারণ স্টুডিও ভাড়া করা, মিউজিশিয়ানদের পারিশ্রমিক দেওয়া— এসবের জন্য অনেক খরচ। এখন সেই কাজ অনেক কম টাকা এবং মাত্র এক সপ্তাহে, এমনকি কখনো-কখনো কয়েক দিনে হয়ে যাচ্ছে। এই সুবিধা ছোট এবং স্বাধীন শিল্পীদের জন্য বিশাল সুযোগ এনেছে, যাঁরা আগে অর্থের অভাবে তাঁদের গান প্রকাশ করতে পারতেন না। এছাড়াও, যাঁরা সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য ভিডিও তৈরি করেন (যেমন ইনস্টাগ্রাম বা ইউটিউব), তাঁদের প্রতিদিন অনেক ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক দরকার হয়। এআই সেই দরকারি কাজগুলো খুব সহজে এবং কোনও কপিরাইটের ঝামেলা ছাড়াই তৈরি করে দিচ্ছে। এর ফলে সবাই খুব কম খরচে এবং খুব তাড়াতাড়ি ভালো মানের কনটেন্ট বানাতে পারছে। এআই আসলে গান তৈরির প্রক্রিয়াকে সবার জন্য সহজ করে দিয়েছে।
এআই মানুষের সৃজনশীলতাকেও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এখন কোনও শিল্পী যদি কোনও বাদ্যযন্ত্র বাজাতে না-ও পারেন, তবুও তিনি নিজের মনের মতো জটিল সুর তৈরি করতে পারছেন। এআই শিল্পীদের বিভিন্ন ধরনের গান সহজে তৈরি করতে সাহায্য করছে। ধরা যাক, কেউ বাউলের সঙ্গে আধুনিক পপ মিউজিক বা ক্ল্যাসিকাল সংগীতের সঙ্গে ফিউচার বেস মিশিয়ে গান বানাতে চাইছেন— এআই তা সহজে করে দিচ্ছে। এর ফলে শিল্পীরা নতুন ধরনের গান নিয়ে পরীক্ষা করার সুযোগ পাচ্ছেন। অনেক অভিজ্ঞ মিউজিক প্রোডিউসার এখন এআই-কে একজন ‘সহকারী’ হিসেবে ব্যবহার করছেন। তাঁরা এআই দিয়ে প্রথমে একটি ডেমো বা প্রোটোটাইপ তৈরি করে নেন এবং পরে তাতে নিজেদের আবেগ, বাদ্যযন্ত্রের সূক্ষ্মতা ও ভালো সুর যোগ করে গানটিকে পুরোপুরি তৈরি করেন। এটি কাজের গতি ও মান দুটোই বাড়াতে সাহায্য করছে।
তবে এই প্রযুক্তির কিছু খারাপ দিকও আছে, যা নিয়ে মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে বড় বিতর্ক চলছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হল গানের মালিকানা (কপিরাইট) এবং শিল্পীর ন্যায্য টাকা (রয়্যালটি) নিয়ে। সুনো (Suno) -এর মতো কোম্পানিগুলো লক্ষ লক্ষ আসল শিল্পীর গান থেকে অনুমতি না নিয়েই তথ্য সংগ্রহ করে তাদের এআই মডেল তৈরি করেছে। এই কারণে বিশ্বের বড় বড় মিউজিক কোম্পানি (যেমন- রিয়া (RIAA), সোনি (Sony), ইউনিভার্সাল (Common)) তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা বা কেস করেছে। যদিও বড় কোম্পানিরা কিছুটা সমাধান পেয়েছে, কিন্তু ছোট ও মাঝারি শিল্পীদের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বা নিজেদের অধিকার রক্ষার জন্য কোনও সহজ উপায় এখনও তৈরি হয়নি।
এছাড়াও, অনেক মানুষের কাজ হারানোর ভয় সত্যি হচ্ছে। যাঁরা সিনেমার জন্য ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বা বিজ্ঞাপনের জিঙ্গল তৈরি করতেন, সেইসব কম্পোজার ও সেশন মিউজিশিয়ানরা এখন কাজ হারাচ্ছেন। কারণ এআই দ্রুত এবং অনেক কম খরচে এই ধরনের কাজ করে দিচ্ছে। হলিউডে সিনেমা বা সিরিজের স্কোর তৈরির কাজ ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমে গিয়েছে, কারণ প্রযোজকরা কম খরচে এআই দিয়ে তৈরি মিউজিকের দিকে ঝুঁকছেন। অন্যান্য দেশেও একই সমস্যা দেখা যাচ্ছে, যা পেশাদার মিউজিশিয়ানদের জীবনধারণের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। কলকাতা বা মুম্বইতেও এই প্রবণতা চোখে পড়ার মতো।
আরেকটি বড় সমস্যা হল গানের বাজারে গানের ‘ঢল’ নেমে আসা। প্রতিদিন এত বেশি নতুন গান আপলোড হচ্ছে, যার বেশিরভাগই এআই-এর তৈরি, ফলে আসল শিল্পীদের ভালো গানগুলো শ্রোতাদের কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে। এই বিপুল সংখ্যক গানের ভিড়ে আসল প্রতিভা খুঁজে বের করা কঠিন। শিল্পীরা সবচেয়ে বেশি ভয় পাচ্ছেন তাঁদের কণ্ঠস্বর নকল হওয়া নিয়ে। এআই ব্যবহার করে হুবহু কারও কণ্ঠস্বর নকল করে গান তৈরি করা হচ্ছে (যেমন ড্রেক বা দ্য উইকেন্ডের নকল গান তৈরি হয়েছিল), যা তাঁদের পরিচয় ও কাজকে চুরি করার সমান। বড় মিউজিক কোম্পানিগুলো যদি শুধু এআই দিয়ে তৈরি শিল্পী দিয়ে কাজ শুরু করে, তবে মানুষের আবেগনির্ভর শিল্পীদের দরকার কমে যাবে। আমাদের মতো যেসব দেশে গানের কপিরাইট আইন দুর্বল, সেখানকার শিল্পী, বিশেষ করে লোকশিল্পী ও ক্ল্যাসিকাল সংগীতশিল্পীরা এই অপব্যবহারের কারণে আরও বেশি বিপদে আছেন।
সবশেষে বলা যায়, এআই সুরের জগতে একটি বিশাল পরিবর্তন এনেছে। যাঁরা এই পরিবর্তনকে ভয় না পেয়ে মানিয়ে নেবেন এবং এআই-কে শুধু একটি টুল হিসেবে ব্যবহার করে নতুন কিছু তৈরি করবেন, তাঁরাই ভবিষ্যতে টিকে থাকবেন এবং নতুন ধরনের গান তৈরি করবেন। অনেক শিল্পী এখন এআই-কে মেনে নিচ্ছেন এবং নিজের কাজে ব্যবহার করছেন। এই পরিবর্তনকে সফল করতে হলে, শিল্পীদের জন্য ন্যায্য টাকা (রয়্যালটি) নিশ্চিত করতে হবে এবং এআই ব্যবহারের জন্য স্পষ্ট, সহজ এবং স্বচ্ছ নিয়ম তৈরি করা খুব দরকার। সরকার এবং মিউজিক সংস্থাগুলোর উচিত এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে প্রযুক্তির উন্নতি যেন মানুষের সৃজনশীলতা ও আবেগের মূল্যকে কোনওভাবেই ছোট না করে।
(লেখক সুরকার, সংগীত প্রযোজক। জন্মসূত্রে জলপাইগুড়ির।)
