- দেবরাজ রায় চৌধুরী
সে এক দিন ছিল বটে। অন্তর্জাল সমানভাবে জড়িয়েছিল গোটা বিশ্বকে, কী দেখতে পাবে কী পাবে না এই নেট অভিজ্ঞতায় কোনও পার্থক্য ছিল না শিকাগো, শিলিগুড়ি কিংবা শেফিল্ডের মধ্যে, অর্থাৎ এক বিশ্ব এক ইন্টারনেট, দুনিয়াজুড়ে কোনও তফাত ছিল না নেটিজেনদের মধ্যে। যে কোনও ওয়েবসাইটে পৌঁছানোর সবার ছিল সমান অধিকার। গত শতকের নয়ের দশকে ইন্টারনেট বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার শুরুর দিন থেকে বর্তমান শতকের প্রায় সিকিভাগ পর্যন্ত এটাই ছিল ব্যবস্থা, ‘এক বিশ্ব এক অন্তর্জাল’।
ইদাানীং এই ধারণা দ্রুত পালটাচ্ছে। এখন সিডনি আর সাংহাই বা মালদা আর মস্কোর নেটনাগরিকদের নেট দুনিয়ায় চলাফেরার অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোথাও কোনও সাইট আটকানো, কোথাও কোনও অ্যাপ নিষিদ্ধ, কোথাও কোনও তথ্যের সীমান্ত পেরোনো মানা, কোনও অঞ্চলে কোনও ভিডিও বিলকুল গায়েব। দেশে দেশে অন্তর্জালের আঙিনায় বিরাট বিরাট প্রাচীর তুলে দেওয়া হয়েছে, এক বিশ্ব এক অন্তর্জালের বদলে এখন খণ্ড খণ্ড অন্তর্জাল বা টুকরো টুকরো অন্তর্জাল যাকে ইংরেজিতে বলা হচ্ছে ফ্র্যাগমেন্টেড ইন্টারনেট বা স্প্লিন্টারনেট। বর্তমানে সচেতন নেটনাগরিকরা এই নিয়ে সোচ্চার। আমরা দেখলাম, পাশের রাষ্ট্র নেপালে কীভাবে কিছু ওয়েবসাইট কিছু অ্যাপকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করাতে জেন জেড-এর প্রবল প্রতিরোধে আর আক্রোশে দেশের পুরো সরকারটাই পালটে গেল। কারণ ইন্টারনেট এখন কেবল বিনোদন বা বিলাসিতাই নয়, রুটিরুজিও বটে।
যে কারণে কোপ
দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিশেষ করে ভারতের মতো দেশে শ্রীনগর, শিলিগুড়ি বা শিলচরের সব মানুষের কাছে সামানভাবে ইন্টারনেটের সব সুবিধা উপলব্ধ নয়। সাম্প্রতিক অতীতে মণিপুরের মানুষদের দীর্ঘদিন রাখা হয়েছিল অন্তর্জালের আওতার বাইরে। বেশিরভাগ রাষ্ট্র সবসময় সন্ত্রস্ত, এই বুঝি দেশের গুরুত্বপূর্ণ গোপন তথ্য পাচার হয়ে গেল বিদেশে, বিদেশি অ্যাপের মাধ্যমে বুঝি নজর রাখছে শত্রু রাষ্ট্র, লোকেশন, কনট্যাক্ট, ব্রাউজিং হ্যাবিট সব বুঝি চলে গেল শত্রুর হাতে! এমনকি দেশের নির্বাচন বুঝি প্রভাবিত হচ্ছে বাইরের রাষ্ট্র থেকে। তাই নির্দিষ্ট অ্যাপগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করো বা নিষিদ্ধ করো। অন্তত দেশের নিজস্ব নিয়মে চলতে বাধ্য করো। তাই ভারতে টিকটক চলে না, মণিপুরে ইউটিউব নিয়ন্ত্রিত। আর একটা বড় কারণ বলতে, ভূরাজনৈতিক ক্ষমতার বিন্যাস, আমেরিকা আর রাশিয়া বা আমেরিকা আর িচন প্রযুক্তি নিয়ে লড়াই করছে যেন দুটো ছেলে ওয়াই-ফাই পাসওয়ার্ড নিয়ে ঝগড়া করে, সবাই চাইছে ঝুঁকিহীন বিশ্বস্ত ব্যবস্থা।
এদের মাঝখানে পড়ে ভারত কিছুটা আত্মরক্ষামূলক অবস্থায়। সেও চাইছে নিজের ব্যবস্থা তৈরি করতে। একচেটিয়া অ্যাপের ধনকুবের মালিকের পরিবর্তে স্থানীয় অ্যাপ নির্মাণে জোর দেওয়া হচ্ছে। তাই গুগল পে’র বদলে ফোন পে বা উনারের বদলে ওলা বা ইন্ড্রাইভ। এছাড়া গোপনীয়তার মাপকাঠি একেক দেশে একেক রকম। চিন খুব কঠোর, আমেরিকা খোলামেলা, ইউরোপ এদের মাঝামাঝি, আর ভারত তার গোপনীয়তার নীতি নির্ধারণে মনে হচ্ছে এখনও খানিকটা বিভ্রান্ত। এটাও অন্তর্জালের খণ্ডতার বা টুকরো টুকরো হওয়ার অন্যতম কারণ। ভারত সহ বিভিন্ন দেশই নিজস্ব প্রযুক্তির সন্ধানে, নিজস্ব ফাইভ জি সিস্টেম, নিজস্ব ক্লাউড স্টোরেজ, নিজস্ব চিপ সাপ্লাই চেন, এই আত্মনির্ভরতা থেকে জন্ম নিচ্ছে নিজস্ব ইন্টারনেট, আর তাই শুরু হয়ে গিয়েছে ডিজিটাল কোল্ড ওয়ার।
ভারতে অভিঘাত
এই মুহূর্তে ভারতে প্রায় ১০০ কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। সংখ্যাটা চিনের পরই। আমাদের দেশে প্রতি মিনিটে যতগুলো হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ পাঠানো হয় অনেক দেশে মোট জনসংখ্যা তার চেয়ে কম। ফলে নেট দুনিয়ায় যে কোনও পরিবর্তন ভারতে তার ব্যাপক অভিঘাত আনতে বাধ্য। ভারতের নিজস্ব অ্যাপগুলো অন্য দেশে ব্যবসা করতে যথেষ্ট বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। কারণ, একেক দেশে নিয়ম একেক রকম, সেই নিয়মের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে গিয়ে ব্যবসা চালানোর খরচ বাড়ছে। ইন্টারনেটের খণ্ডতার কারণে বিভিন্ন দেশের মধ্যে তথ্যের আদানপ্রদানে প্রাচীর উঠে যাচ্ছে, ফলে ভারতের মতো দেশে তথ্যপ্রযুক্তি সহ অন্যান্য বিষয়ের গবেষণা ভীষণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিভিন্ন অ্যাপ বাছাইয়ের ক্ষেত্রে জনগণের কাছে বিকল্প কমে আসছে। বেশি দামে স্থানীয় অ্যাপ ব্যবহার করতে হচ্ছে। ভারতীয় বহু মানুষ অ্যাপনির্ভর দিন গুজরান করেন। তাঁদের কঠিন লড়াইয়ের সামনে পড়তে হচ্ছে। এছাড়াও তরুণ–তরুণীদের নেটনির্ভর জন আন্দোলন বা ডিজিটাল অ্যাক্টিভিজমের ক্ষতি হচ্ছে।
অতএব উপায়?
উপায় সব দেশই জানে। খাতায়-কলমে সেমিনারে তা নিয়ে আলাপ আলোচনার মিনার গড়ে উঠছে কিন্তু বাস্তবের মাটিতে খুব বেশি কিছু করে ওঠা সম্ভব হচ্ছে না, বিষয়টা অনেকটা পরিবেশের সমস্যার মতো। সবাই জানি বিপদের বিষয়টি। কিন্তু বিশেষ কিছু করা সম্ভব হচ্ছে না কারণ দেশে দেশে আন্তর্জাতিকতাবোধের চেয়ে বেশি কাজ করছে জাতীয়তাবাদী স্বার্থ। স্বচ্ছ ভারতের পাশাপাশি স্বচ্ছ এবং সপ্রতিভ ডিজিটাল আইন জরুরি যাতে পরিবর্তিত পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব হয়। জনগণের ভূমিকা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। নিজেদের ডিজিটাল ইকোসিস্টেমকে শক্তিশালী করা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমি কনডাক্টর, নেট নিরাপত্তা তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা ইত্যাদিতে মৌলিক গবেষণায় বিনিয়োগ করা। গুরুত্বপূর্ণ যে আন্তর্জাতিক মঞ্চ বা সংস্থাগুলো আছে ভারত যার সদস্য বা বিশেষ আমন্ত্রিত, যেমন ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন, জি–২০, কোয়াড, সেখানে যতটা সম্ভব অগ্রণী ভূমিকা পালন করা। উদ্দেশ্য সবার স্বার্থে আন্তর্জাতিক আইনকানুন ঢেলে সাজানো।
এসব ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক বোঝাপড়া এবং সহায়তা প্রয়োজন। কারণ বিষয়টা পুরোপুরি আন্তর্জাতিক। সেখানে কেবল দেশের গণ্ডিতে সীমিত থাকা মানে যেন নেট সংযোগ ছাড়া স্মার্টফোন ব্যবহার করা। সমস্ত দেশ একযোগে, ন্যূনতম কতগুলো বিষয়ে যেমন সাইবার নিরাপত্তা, তথ্য সংরক্ষণ, নিরাপদ ডিজিটাল বাণিজ্য এসব নিয়ে একমত হওয়া জরুরি। আজকে অন্তর্জাল টুকরো টুকরো হয়ে খণ্ডে খণ্ডে ছড়িয়ে পড়ছে ঠিক যেন হাত থেকে পড়ে যাওয়া কোনও মোবাইল বা ল্যাপটপ। কিন্তু তা আবার জোড়া যাবে না এমনটা নয়, সেখানে আমাদের দেশের লক্ষ্য নির্দিষ্ট থাকা প্রয়োজন। নিজেদের ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব বজায় রেখে অন্য শক্তিশালী দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কীভাবে সংযুক্ত থাকা যায় সেই পথ খুঁজে বার করার মধ্যেই বিশ্বের অন্তর্জালের প্রকৃত মুক্তি এবং সেই নীতি নির্ধারণে আগামীদিনে হয়তো দেশের জনগণই বিশেষ ভূমিকা পালন করবে।
(লেখক মালদা পলিটেকনিকের অধ্যাপক)
