স্কুল সার্ভিস কমিশনের (এসএসসি) বহু প্রতীক্ষিত দু’দফায় ৩৫ হাজারেরও বেশি শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষার প্রথম পর্ব মোটামুটি নির্বিঘ্নে হয়ে গেল। দ্বিতীয় দফার পরীক্ষা পরের সপ্তাহে। প্রথম দফায় হল নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষা। পরের দফায় একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির জন্য শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষা। শুধু কমিশনের নয়, এটা রাজ্য সরকার এবং শাসকদলেরও অগ্নিপরীক্ষা। ২০১৬ সালের নিয়োগ প্যানেল বাতিল ঘোষণার পিছনে দুর্নীতির দায় যে চেপেছে রাজ্য সরকারের ঘাড়ে।
এসএসসির ওই প্যানেলের প্রায় ২৬০০০ জনের চাকরি বাতিল মামলার জের চলছে দীর্ঘদিন ধরে। গত এপ্রিলে সুপ্রিম কোর্টে নিষ্পত্তি হয় মামলার। তারপরেও মামলা সংক্রান্ত কিছু না কিছু আর্জি জমা পড়ছেই শীর্ষ আদালতে। দুর্ভাগ্যজনক শুধু এসএসসি এবং রাজ্য সরকারের গলদে এই দুর্নীতির মাশুল গুনতে হচ্ছে চাকরিহারাদের। এর দায় এড়াতে পারেন না মুখ্যমন্ত্রী।
এপ্রিলে সুপ্রিম কোর্ট ২৫৭৫৩ জনের চাকরি বাতিল করার পর দিনকয়েকের মধ্যে কলকাতায় নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে চাকরিহারাদের সমাবেশে মমতা বলেছিলেন, একজনেরও চাকরি যাবে না। ২০২৫ ডিসেম্বরের মধ্যেই তিনি সব সমাধান করে দেবেন বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন। জানিয়েছিলেন, সমাধান করার জন্য তাঁর প্ল্যান এ, বি, সি, ডি, ই ইত্যাদি তৈরি আছে।
কীসের ভিত্তিতে এই আশ্বাস দিয়েছিলেন মমতা? আইনজ্ঞদের মতে, মুখ্যমন্ত্রী এটা করতেই পারেন না। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর মুদ্রাদোষ, তিনি থেকে থেকে কিছু না কিছু ঘোষণা করবেনই। যেমন, চাকরিহারা শিক্ষাকর্মীদের সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত গ্রুপ-সি শিক্ষাকর্মীদের জন্য মাসিক ৩০০০০ এবং গ্রুপ-ডি শিক্ষাকর্মীদের জন্য মাসিক ২৫০০০ টাকা ভাতার ব্যবস্থার ঘোষণা করলেন তিনি।
দুর্নীতির অভিযোগে সদ্য যাঁদের চাকরি গিয়েছে, তাঁদের জন্য কি কোনও রাজ্য সরকার খেয়ালখুশিমতো এভাবে মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করতে পারে? মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা চাউর হতেই হাইকোর্টে মামলা হল। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণাকে সম্পূর্ণ বেআইনি বলা হল। চাকরিহারা শিক্ষাকর্মীরা অবশ্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদারতায় খুশিই হয়েছিলেন। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর প্রস্তাব অঙ্কুরে বিনাশ হল।
এখন আবার চাকরিহারা অযোগ্য শিক্ষকদের জন্য গ্রুপ-সি স্তরের চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী। আগেও যতবার মুখ্যমন্ত্রী আইন ভেঙে কিছু করার চেষ্টা করেছেন, আদালত আটকে দিয়েছে। এবারেও যে তার পুনরাবৃত্তি হবে না, কে বলতে পারে! প্রশ্ন উঠতে পারে, মুখ্যমন্ত্রী কি ইচ্ছে করেই সবসময় এমন ঘোষণা করেন? তিনি তো ভালো জানেন যে, বেআইনিভাবে কিছু ঘোষণা করলে দু’দিন বাদে কেউ মামলা ঠুকলেই তা বাতিল হয়ে যেতে পারে। তারপরেও মুখ্যমন্ত্রী এগুলো করেন কেন? আসলে মুখ্যমন্ত্রীর মাথায় ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন।
যেদিন একযোগে সুপ্রিম কোর্ট এবং হাইকোর্টে অযোগ্যদের জন্য তদ্বির করার কারণে রাজ্য সরকারকে চরম ভর্ৎসনা শুনতে হল, সেদিনই দাগি শিক্ষকদের জন্য মুখ্যমন্ত্রীর প্রাণ কেঁদে উঠল। গত কয়েক বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি নিয়ে এত শোরগোলের পরেও মুখ্যমন্ত্রীর মাথায় ঘুরেফিরে আসছে অযোগ্যদের কথা! এটাই অদৃষ্টের পরিহাস।
বাস্তব হল, মুখ্যমন্ত্রী যেভাবে চাকরি দেওয়ার কথা বলছেন, আইনে তার কোনও বিধান নেই। তবু মুখ্যমন্ত্রী অনবরত বলে চলেন। নিশ্চয়ই ভোটে জেতার তাগিদে। ইতিমধ্যে চাকরিহারাদের কেউ কেউ আত্মঘাতী হয়েছেন। ব্রেন স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাকের বলি হয়েছেন কেউ কেউ। চাকরিহারাদের পরিবারেও অনেকে হয় দীর্ঘ অসুস্থতা বা স্ট্রোক-অ্যাটাকের শিকার হন।
অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে এবার এসএসসি দু’দফায় পরীক্ষার আয়োজন করেছে। আশা করা যায় কি যে আর দুর্নীতির অভিযোগ উঠবে না? টানাটানি হবে না রাজ্যের মানসম্মান নিয়ে? উত্তরটা কিন্তু নিশ্চিত নয়। সংশয় বুকে রেখে পরীক্ষাকেন্দ্রমুখী হয়েছেন শিক্ষক পদের চাকরিপ্রার্থীরা।
