জীবন বাঁচানোর শিক্ষা বইয়ের পাঠের মতোই জরুরি। স্কুলে ‘বিএসএল’ অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয়।
রাজ্যে স্কুলশিক্ষায় ‘বেসিক লাইফ সাপোর্ট’ (‘বিএসএল’) অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী, এবং জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। শিক্ষা শুধু পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার জন্য নয়, জীবনের সংকট-মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও তৈরি করে। সেই অর্থে একজন ছাত্র যদি গণিত, বিজ্ঞান কিংবা ইতিহাস শেখে, তবে জীবন বাঁচানোর প্রাথমিক কৌশল শেখাটিও সমান জরুরি। রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের প্রস্তাব: অষ্টম শ্রেণি থেকে ‘বিএলএস’-কে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা এবং তা বাধ্যতামূলক করা হোক।
আরও পড়ুন:
ভারত-সহ বিশ্বের বহু দেশে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে আকস্মিক মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। চিকিৎসকদের মতে, হাসপাতালের বাইরে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে অধিকাংশ মানুষ সময়মতো প্রাথমিক চিকিৎসা না পাওয়ার কারণেই প্রাণ হারায়। অথচ ঘটনার প্রথম কয়েক মিনিটই সবচেয়ে মূল্যবান। সেই সময় উপস্থিত কোনও সাধারণ মানুষ যদি সঠিকভাবে ‘সিপিআর’ বা ‘কার্ডিয়াক পালমোনারি রিসাসিটেশন’ দিতে পারে, তাহলে মৃত্যুর মুখ থেকে একজনকে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। অর্থাৎ অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছনোর আগেই একজন প্রশিক্ষিত সাধারণ নাগরিক হয়ে উঠতে পারে প্রকৃত জীবনরক্ষাকারী। এই দক্ষতা যত বেশি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া যাবে, ততই সমাজ নিরাপদ।
এই কারণে স্কুলই হতে পারে সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা। অষ্টম শ্রেণি থেকেই যদি ছাত্রছাত্রীরা বুঝতে শেখে-কীভাবে জরুরি পরিস্থিতি চিহ্নিত করতে হয়, কীভাবে সাহায্যের জন্য ফোন করতে হয়, কীভাবে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হয় এবং কীভাবে ‘সিপিআর’ প্রয়োগ করতে হয়, তাহলে আগামী প্রজন্ম শুধু শিক্ষিতই হবে না, দায়িত্বশীল ও মানবিক নাগরিক হিসাবেও গড়ে উঠবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-সহ বহু উন্নত দেশে এই প্রশিক্ষণ বহু বছর ধরেই স্কুলশিক্ষার অংশ। পশ্চিমবঙ্গ সেই পথ অনুসরণ করতে চাইছে, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে।
তবে এই উদ্যোগ সফল করতে গেলে কয়েকটি বিষয় সমান গুরুত্বের সঙ্গে দেখাও দরকার। শুধু পাঠ্যবইয়ে একটি অধ্যায় যোগ করলেই চলবে না। বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ, ডেমো, মডেল ব্যবহার করে হাতে-কলমে শেখানো এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর পুনরাবৃত্তি প্রয়োজন। শিক্ষকদেরও আগে প্রশিক্ষিত করতে হবে। প্রয়োজনে চিকিৎসক, নার্স, প্যারামেডিক বা প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবীদের যুক্ত করে নিয়মিত কর্মশালার ব্যবস্থা করতে হবে। পরীক্ষায় নাম্বারের চেয়ে বাস্তব দক্ষতার মূল্যায়নই এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই শিক্ষা মুখস্থ করার নয়, প্রয়োগ করার। হালের শিক্ষাব্যবস্থাকে শুধু তথ্যনির্ভর না রেখে জীবনমুখী করে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, বা নতুন যুগের দক্ষতার পাশাপাশি জীবনরক্ষাকারী প্রাথমিক চিকিৎসাও শিক্ষার অপরিহার্য অংশ হওয়া উচিত।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
