মিষ্টিমুখ, প্রণামের আন্তরিকতা অতীত, বিজয়া আটকে ইমোজিতে

স্বাস্থ্য/HEALTH
Spread the love


আজ দশমী। সন্ধ্যার পরেই প্রতিমার বিসর্জন। পুজোমণ্ডপে ঢাক-কঁাসর বাজছে বটে, তবে তাতে যেন বিষাদের সুর। বোধনের সন্ধ্যার থেকে আলাদা। পাড়ার চোঙা মাইকে গান বাজছে। মাঝে মাঝেই গান থামিয়ে ঘোষণা হচ্ছে– দুপুর থেকে মাকে বরণ করা যাবে। প্যান্ডেলের সামনের দিকে অনেকটা কাপড় সরিয়ে ফেলা হয়েছে এখনই। লরি ঢুকতে পারবে বলে। রাস্তায় সাজানো লাইটও খুলে ফেলার কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। আমাদের চারতলায় টানা বারান্দার পঁাচিল থেকে উঁকি মেরে মাঝে মাঝেই সামনের মাঠে উৎসবের শেষবেলা দেখছি। আর, ঘরে এসে লাইনটানা খাতায় বিজয়ার চিঠি লেখা প্র‌্যাকটিস করছি।

মা গরদের লালপাড় সাদা শাড়িটা বের করে রেখেছে। গত কয়েক বছর এটা পরেই পাড়ার মণ্ডপে দুর্গামাকে বরণ করতে যায়। তাড়াতাড়ি রান্না-স্নান-খাওয়া সেরে নেওয়ার তাড়ার মধ্যেই কেরোসিনের জনতা স্টোভের অঁাচে কড়াইয়ে নারকেল ছঁাচ নাড়ছে। নাড়ু হবে। মা ঘেমেনেয়ে একাকার। শাড়ির অঁাচলে মাঝে মাঝে কপালের ঘাম মুছছে। এদিনটায় মাকে সকাল থেকে অতিরিক্ত ব্যস্ত হতে হয়।

আরও পড়ুন:

ছঁাচ নামিয়ে রাখার পর আর-একটা কড়াইয়ে কুচো নিমকি ভাজা হবে। কালো জিরে দিয়ে ময়দা মেখে রাখা আছে। হবে কুচো গজাও।

আরও পড়ুন:

ছঁাচ নামিয়ে রাখার পর আর-একটা কড়াইয়ে কুচো নিমকি ভাজা হবে। কালো জিরে দিয়ে ময়দা মেখে রাখা আছে। হবে কুচো গজাও। শুকনো মিহিদানার প্যাকেটও আনা হয়েছে। চিনির রসে ফেলে ফুটিয়ে নিলেই হবে। গতবার গোল গোল ছঁাচে নারকেল ছাবাও করেছিল মা। এবার করছে না। বাবা সাইকেল নিয়ে শিয়ালদা গিয়েছে কিনে আনবে বলে। তাছাড়া বউবাজারের ‘সত্যনারায়ণ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’ থেকে সীতাভোগও আনার কথা শুনেছি। আর তারপর থেকেই মা দুর্গার ছবি ছাপা তেল জবজবে মিষ্টির প্যাকেটটা চোখের সামনে ভেসে ভেসে উঠছে। আমি পেনসিলের পিছন কামড়াতে কামড়াতে বারবার রান্নাঘরে আসছি। গুড়-নারকেলের ছঁাচ নাড়ার গন্ধে জিভে জল আসছে।

বস্তি পুনর্বাসনের সিআইটি কোয়ার্টার। চারতলা বিল্ডিং। মোট ৪০টি ঘর, ৪০টি পরিবার। টানা বারান্দার মাঝে সিঁড়ি, দু’-পাশে ৫টি করে ঘরে। এই ১০টি ঘরে কাচের প্লেটে সাজিয়ে বিজয়ার নাড়ু, নিমকি, মিষ্টি যাবে। বাকি ফ্লোরের ৩০টি ঘরের মধ্যে যাদের সঙ্গে খুব বেশি হৃদ্যতা রয়েছে, তাদের বাড়িও যাবে মিষ্টি। আবার কোনও প্রতিবেশী যদি এবারই প্রথমবার মিষ্টি নিয়ে হাজির হয়, তাদের বাড়িতেও মিষ্টি পাঠানো হবে। অর্থাৎ, সব মিলিয়ে কমপক্ষে ২০ পরিবারে বিজয়ার মিষ্টি যাবে।

মোবাইল ফোন তখন ভবিষ্যতের গর্ভে। ইন্টারনেট, তার চেয়েও বড় কথা, মোবাইলে তার সহজলভ‌্যতা, সামাজিক মাধ্যম চিন্তারও বাইরে।

মা আর বাবা মুখে হাসি ফুটিয়ে যাবে মিষ্টির প্লেট নিয়ে। বাড়ির বড়দের প্রণাম করবে। ছোটরা তাদের প্রণাম করবে। সমবয়সিদের সঙ্গে কোলাকুলি, আলিঙ্গন হবে। পরের দিন তারাও কেউ আসবেন অমনই মিষ্টির প্লেট নিয়ে। কারও কারও চেষ্টা হবে প্লেটটা যেন আমাদের থেকে বড় হয়। আর তাতে যেন কিছু একটা নতুনত্ব বা চমক থাকে। আর সেটা করতে পারলে তাদের চোখে-মুখে একটা অহংকারের ভাব ফুটে উঠবে। কারও প্লেটে অবশ্য ‘কালেকশন’-এর মিষ্টি। কোনওবার মায়ের হাতে তৈরি নারকেল নাড়ুও ফিরে এসেছিল। তবে তাদেরও আন্তরিকতা কম ছিল না। এমনিতে বিজয়া করতে আসা কাকু-কাকিমাদের প্রণাম করতে ইচ্ছে না করলেও আমরাও এ সময়টায় কোনওরকম অনিচ্ছা প্রকাশ করতাম না। কারণ, ওই মিষ্টির প্লেট।

দুর্গার বিসর্জন হয়ে যায়। ক্রমে মণ্ডপের সমস্ত কাপড় ছাড়িয়ে ফেলা হয়। শুধু বঁাশের কাঠামোটা উৎসবের স্মৃতি নিয়ে দঁাড়িয়ে থাকে। স্কুলের হোমটাস্ক শেষ করার ব্যস্ততা বাড়ে ক্রমে। আমরা বুঝে গিয়েছি এই সময় কারও বাড়ি গিয়ে প্রণাম করলে দুটো নারকেল নাড়ু আর কিছু কুচো নিমকি বা কুচো গজা মিলবেই। প্রতি বিকেলে পাড়ায় খেলতে বেরনোর সময় ক’জন বন্ধু মিলে নিপাট ভদ্রছেলে সেজে কোনও কাকু-কাকিমার বাড়িতে ঢুকে পড়তাম। তঁারাও বুঝতেন। হাসতেন। মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করতেন।

একদিকে পুজো শেষ হওয়ার মনখারাপ, অন্যদিকে নতুন করে প্রতিবেশী আত্মীয়স্বজনের বাড়ি যাওয়ার আনন্দ। একদিকে ঢাকের বিষণ্ণ বোল, বিসর্জনের শোভাযাত্রা আর গঙ্গার ঘাটে প্রতিমার শেষ বিদায়, অন্যদিকে বাড়ি ফিরে মিষ্টিমুখ, প্রণাম, আশীর্বাদ, কোলাকুলি আর নিমকি-গজার গন্ধে ভরে ওঠা বিকেল। তখনও বুঝিনি, উৎসবের এই সামান্য আয়োজনের মধ্যেই আসলে লুকিয়ে থাকে একটি সমাজের ইতিহাস, একটি পরিবারের স্মৃতি এবং কয়েক প্রজন্মের মধ্যে বয়ে চলা ভালবাসার উত্তরাধিকার। পরে বুঝেছি, বিজয়া দশমী শুধু দুর্গাপুজোর শেষ দিন নয়, বাঙালির সামাজিক জীবনের এমন একটি অধ্যায়, যেখানে আনন্দের সঙ্গে বিষাদ, প্রথার সঙ্গে পরিবর্তন এবং ব্যক্তিগত স্মৃতির সঙ্গে সমষ্টিগত সংস্কৃতি মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

মোবাইল ফোন তখন ভবিষ্যতের গর্ভে। ইন্টারনেট, তার চেয়েও বড় কথা, মোবাইলে তার সহজলভ‌্যতা, সামাজিক মাধ্যম চিন্তারও বাইরে। তখনও ‘হাই’-‘হ্যালো’, ‘গাইজ’, ‘ইনটলারেন্স’ এসব শব্দের সঙ্গে আমরা পরিচিত হইনি। ‘প্রতিবাদ’, ‘প্রতিরোধ’, ‘ব্যারিকেড’, ‘কমরেড’, ‘কালো হাত পোড়ানো’– এসবেতেই আমরা ধাতস্থ ছিলাম। তবে কোনও মত বা পথ গ্রহণ বা বর্জনের স্বাধীনতা মানুষের ছিল। একই মলাটে গান্ধীজির সর্বোদয়, মার্কসবাদ-লেনিনবাদ, ইন্দিরা গান্ধীর ‘গরিবি হটাও’ পড়া যেত।

এখন আমরা যে বারোয়ারি বা সর্বজনীন দুর্গাপুজোকে বাঙালির সবচেয়ে বড় সামাজিক উৎসবের কেন্দ্র হিসাবে দেখি, তার চেহারা কিন্তু অতীতে এমনটা ছিল না।

তখন চল চিঠি লেখার। দশমীর রাতে আর-একটি কাজ। সকাল থেকে যার প্র‌্যাকটিস চলেছে, এবার তার ফাইনাল। দেশে চিঠি লিখতে হবে। নীল রঙের ইনল‌্যান্ড লেটারে বাবা-মা বড়দের প্রণাম ও ছোটদের ভালবাসা জানিয়ে দশ লাইন করে লেখার পর আমাদের তিন ভাই-বোনের জন্য বরাদ্দ চার লাইন করে। প্রতি বছর লেখা হয়, তবু প্রতি বছরই যেন নতুন। চিঠির উপরে লেখা থাকত– ‘শ্রীশ্রী দুর্গা মাতা সহায়’। ডানদিকে বড় করে লেখা ‘বিজয়া দশমী’। তারপর শুরু হত সেই চিরপরিচিত সম্বোধন– ‘শ্রীচরণেষু মা, তুমি এবং বাবা শুভ বিজয়ায় আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম নিও। ছোটদের স্নেহ আর ভালবাসা দিও। বাড়ির বড়দের প্রণাম জানিও।’ চিঠির ভাষায় থাকত বিনয়, আন্তরিকতা এবং দূরে থাকা পরিবারের প্রতি গভীর টান। লাল কালিতে লেখা সেই কয়েকটি বাক্যের মধ্যে দিয়ে যেন একটি সমগ্র পরিবার যেন পরস্পরের কাছে
ফিরে আসত।

এখন আমরা যে বারোয়ারি বা সর্বজনীন দুর্গাপুজোকে বাঙালির সবচেয়ে বড় সামাজিক উৎসবের কেন্দ্র হিসাবে দেখি, তার চেহারা কিন্তু অতীতে এমনটা ছিল না। ১৮ ও ১৯ শতকের কলকাতায় দুর্গাপুজোর পরিচিত রূপের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল জমিদার, ধনী ব্যবসায়ী এবং বনেদি পরিবারের গৃহদেবীর আরাধনা। রাজা নবকৃষ্ণ দেবের শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজো কিংবা কলকাতার বিভিন্ন বনেদি বাড়ির পুজো সেই ঐতিহ্যেরই পরিচায়ক। পুজো ছিল ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিপত্তি, অতিথি আপ্যায়ন এবং সাংস্কৃতিক আড়ম্বর প্রদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। তাই বিজয়া দশমীর আবেগের মূল সুরটি বহু দিন ধরে ছিল জমিদার-ধনী-অভিজাতদের পারিবারিক অহং প্রকাশের রীতি। কালক্রমে পুজো ‘বারোয়ারি’ হলে বিজয়া পালনও সাধারণ শ্রেণির উৎসবের অঙ্গ হয়ে ওঠে।

তবে মহার্ঘ‌ হওয়ার কারণে ধনী ও বনেদি পরিবারে সন্দেশ কিংবা অন্য ছানার মিষ্টি দিয়ে বিজয়ার আপ্যায়ন আভিজাত্যের পরিচায়ক হয়ে উঠত, আর মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত পরিবারে ঘরে তৈরি নাড়ু, মালপোয়া, রসবড়া কিংবা অন্যান্য মিষ্টি দিয়েই অতিথি আপ্যায়নের রীতি চলত। সেই আয়োজনের আর্থিক মূল্য কম হলেও আন্তরিকতা কম ছিল না।

নীলকণ্ঠ পাখি উমার ফেরার বার্তা নিয়ে কৈলাশে উড়ে গেলেও, উমার ঘরে ফিরতে আরও কিছুটা সময় লাগে।

নয়ের দশকে বিশ্বায়নের হাওয়ায় সবকিছু কেমন যেন বদলে যেতে থাকল। বিজয়া পালনটাও আচমকা বদলে গেল। একবার বাড়িতে এল মিষ্টির প্যাকেট। কোনওটাতে একই ধরনের চারটি মিষ্টি। আবার কোনওটাতে চার-পঁাচ ধরনের একটি করে। সঙ্গে ক্লাব কচুরি। তত দিনে, আমাদের বাড়িতে রান্নার গ্যাস এসে গিয়েছে। মাকে উবু হয়ে বসে স্টোভে কড়াই বসিয়ে খুন্তি নাড়তে হয় না। বিজয়া উপলক্ষে বাড়িতে নাড়ু-নিমকি বানানো সেবার থেকে বন্ধ হয়ে গেল। ওসবের জন্য খরচ করার মতো সময় নেই আর। বাবা সকালে পাড়ার মিষ্টির দোকানে গিয়ে প্যাকেট করে আনল। বাবা-মা আর কারও বাড়ি গেল না। কোনও কাকু-কাকিমাও আর আমাদের বাড়ি এলেন না। আমরাই ভাইবোনদের মধ্যে কেউ একজন প্রণাম করে সেই প্যাকেট দিয়ে এলাম। মায়ের শিখিয়ে দেওয়া কয়েকটি কথা বলার মাত্র অনুমতি। কেউ কিছু খেতে দিলেও খাওয়া বারণ। বলতে হবে, সারা দিন প্রচুর খেয়েছি। পেটভরা।

একদম কিছু খেতে পারব না। আমি আমার ভাষায় বলা রপ্ত করলাম। দিদিরা তাদের মতো। যারা আমাদের বাড়ি মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে এল, তারাও ওইরকম আচার-ব্যবহারই রপ্ত করে ফেলেছে। আমাদের বাড়িতে আর পাড়ার বাচ্চারা, আমার বন্ধুরা মাকে প্রণাম করতে এল না। সবাই কেমন যেন রাতারাতি ‘ভদ্র’ ও ‘ভব্য’ হয়ে গিয়েছে! সেই মিষ্টির প্যাকেট থেকেও নাড়ু-নিমকি উধাও হল। জায়গা নিল কেসর লাড্ডু, গুলাবজামুন, কাজু বরফি, পেস্তা সোনপাপড়ি।
বঁাশ-কাপড়ের মণ্ডপের জায়গা নিয়েছে ‘থিম পুজো’। মনে ভক্তি জোগানো, শক্তি জোগানো, সব সংকট ভুলিয়ে দেওয়া মায়ের সেই ত্রিনয়নও আর তেমনটা নেই। পুজো দীর্ঘ হয়েছে। দশমীতে আর প্রতিমা বিসর্জনের তাড়া নেই।

নীলকণ্ঠ পাখি উমার ফেরার বার্তা নিয়ে কৈলাশে উড়ে গেলেও, উমার ঘরে ফিরতে আরও কিছুটা সময় লাগে। তবে দশমীর সকালেই মোবাইলের ইনবক্স ভরে যায় বিজয়ার শুভেচ্ছায়। মিষ্টির প‌্যাকেট নিয়েও আর কোনও আত্মীয়-বন্ধু বাড়ি আসে না। যারা আসত, তারা ভদ্র থেকে এখন অতি ব্যস্ত মানুষ হয়ে গিয়েছে। মিষ্টির সঙ্গেও আমাদের আড়ি। আমাদের বিজয়া মিষ্টির ‘ইমোজি’-তে আটকে গিয়েছে।

(মতামত নিজস্ব)
[email protected]

আরও পড়ুন:

সর্বশেষ খবর

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *