ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়ে শহিদ বসন্ত ও দিগম্বর, আজ কালিমালিপ্ত সেই বিশ্বাস পরিবার

ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়ে শহিদ বসন্ত ও দিগম্বর, আজ কালিমালিপ্ত সেই বিশ্বাস পরিবার

বৈশিষ্ট্যযুক্ত/FEATURED
Spread the love


দিগম্বর এবং বিষ্ণুচরণের নাতি বসন্তকুমার খুব কম বয়স‌ থেকেই নিজের দেশ ও দেশের পরাধীনতার কথা ভেবে ভেতরে ভেতরে কষ্ট পেতেন। শৈশবেই তিনি পোড়াগাছা হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ক্ষীরোদচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়ের সান্নিধ্যে আসেন, তাঁর সংস্পর্শে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হন। লিখছেন গৌতম মণ্ডল

বসন্তকুমার বিশ্বাস। উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের ছিলেন একজন অন্যতম মুখ। নির্ভীক বিপ্লবী। বসন্তকুমার বিশ্বাসের জন্ম ১৮৯৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি, অবিভক্ত নদীয়া জেলার পোড়াগাছা গ্রামে। দেশভাগের পরে এই গ্ৰামটি পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেই অবস্থান করে। বসন্তকুমারের বাবা মতিলাল বিশ্বাস ছিলেন একজন কৃষিজীবী এবং অত্যন্ত সৎ মানুষ হিসেবে এলাকায় পরিচিত।

অপরপক্ষে নীল বিদ্রোহের অন্যতম প্রধান দুই কাণ্ডারী দিগম্বর বিশ্বাস এবং বিষ্ণুচরণ বিশ্বাস ছিলেন বসন্তকুমার বিশ্বাসের দাদু। নীলকরদের নির্মম অত্যাচার যখন চরম সীমায় পৌঁছায়, তখন এই দুই ভাই নিজেদের লাভজনক ও নিরাপদ চাকরি ছেড়ে কৃষকদের পাশে প্রত্যক্ষভাবে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন এবং তাঁরা নদিয়ার নীল চাষীদের সংগঠিত করতে শুরু করেন। ১৮৫৯ সালে তাঁদের নেতৃত্বেই নদিয়া জেলার চৌগাছা গ্রামে প্রথম নীল চাষ না করার জন্য কৃষকরা ঐক্যবদ্ধ হয়। এই প্রতিবাদই পরবর্তীকালে দাবানলের মতো পুরো বাংলায় নীল বিদ্রোহ হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে।

দিগম্বর এবং বিষ্ণুচরণের নাতি বসন্তকুমার খুব কম বয়স‌ থেকেই নিজের দেশ ও দেশের পরাধীনতার কথা ভেবে ভেতরে ভেতরে কষ্ট পেতেন। শৈশবেই তিনি পোড়াগাছা হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ক্ষীরোদচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়ের সান্নিধ্যে আসেন, তাঁর সংস্পর্শে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হন। পরবর্তীতে তিনি স্থানীয় বিপ্লবী অমরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মাধ্যমে সশস্ত্র সংগঠন যুগান্তর দলে যোগ দেন। এবং যোগ দেওয়ার অব্যবহিত পরে কিংবদন্তি বিপ্লবী‌‌ রাসবিহারী বসুর (১৮৬৬-১৯৪৪) সংস্পর্শে আসেন। ক্রমশ বিপ্লবী রাসবিহারী বসুর তিনি অত্যন্ত স্নেহভাজন হয়ে ওঠেন । রাসবিহারী বসু বসন্তকুমারের অকপট ও অকুতোভয় স্বভাব দেখে তাঁকে নিজের সহচর করে নেন। ব্রিটিশদের নজর এড়াতে বসুর পরামর্শে বসন্তকুমার অনেক সময় মেয়েদের ছদ্মবেশে, আবার কখনও সন্ন্যাসীর সেবক হিসেবে বিভিন্ন গোপন ডেরায় যাতায়াত করতেন।

বসন্ত বিশ্বাসের ঐতিহাসিক অবদানসমূহের মধ্যে অন্যতম হল তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জকে হত্যা প্রচেষ্টা (১৯১২)। ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত হলে ১৯১২ সালের ২৩ ডিসেম্বর দিল্লিতে প্রভাবশালী এবং বিত্তবান মানুষদের নিয়ে জমকালো শোভাযাত্রার আয়োজন করেন হার্ডিঞ্জ। ব্রিটিশশাসিত ভারতের বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জ হাতির পিঠে চড়ে হাজার হাজার জনতার উপস্থিতিতে দিল্লির চাঁদনি চক পার হয়ে ক্যুইনস গার্ডেনের দিকে যাচ্ছিলেন।

বোমার আঘাতে হার্ডিঞ্জের হাতির চালক ঘটনাস্থলে নিহত হন এবং হার্ডিঞ্জ নিজেও মারাত্মকভাবে আহত হন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি আশ্চর্যজনকভাবে বেঁচে যান।

এইরকম পরিকল্পনার কথা আগে থেকেই জানতেন বিপ্লবী রাসবিহারী বসু। তাই শোভাযাত্রা হওয়ার বেশ কিছুদিন আগে থেকেই লর্ড হার্ডিঞ্জকে হত্যার পরিকল্পনা করতে থাকেন তিনি এবং এই গুরুদায়িত্ব শেষ পর্যন্ত সঁপে দেন ১৭ বছর বয়সি বসন্তকুমার বিশ্বাসের ওপর। এই দায়িত্ব পেয়ে বসন্ত বিশ্বাস যারপরনাই আনন্দিত হন এবং গর্ববোধও করেন।

যথাসময়ে বসন্তকুমার শাড়ি পরে মেয়ে সেজে চাঁদনি চকের পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্কের একটি ভবনের তৃতীয় তলায় মেয়েদের ভিড়ে নিজেকে লীলাবতী পরিচয় দিয়ে মিশে যান। কাছাকাছিই অন্যত্র সজাগ ও সতর্ক ছিলেন রাসবিহারী বসু। তৃতীয় ভবনে উপস্থিত মহিলাদের সবার দৃষ্টি যখন বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জের শোভাযাত্রার দিকে তখন রাসবিহারী বসুর ইশারায় বসন্তকুমার বিশ্বাস নিখুঁত নিশানা করে সংগোপনে রাখা বোমাটি হার্ডিঞ্জের উপর দ্রুত নিক্ষেপ করেন।

বোমার আঘাতে হার্ডিঞ্জের হাতির চালক ঘটনাস্থলে নিহত হন এবং হার্ডিঞ্জ নিজেও মারাত্মকভাবে আহত হন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি আশ্চর্যজনকভাবে বেঁচে যান। খুব স্বাভাবিকভাবেই চারিদিকে চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। রাসবিহারী বসু অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে সুকৌশলে বসন্তকুমারকে সঙ্গে নিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যান তাঁর কর্মক্ষেত্র দেরাদুনে।

দিল্লির এই ঘটনার পর বসন্তকুমার বিশ্বাস রাসবিহারীর পরামর্শে বাংলায় না এসে দেরাদুন থেকে চলে যান সোজা লাহোরে। সেখানে ছদ্মবেশে একটি ডিসপেনসারিতে কাজ করতে শুরু করেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে চলতে থাকে বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগাযোগ, ভাবনার আদানপ্রদান। আর মাথার উপরে তো ছিলেনই রাসবিহারী বসু। এইসময় বসন্তকুমার বিশ্বাসের ধারণা হয়, ব্রিটিশদের মনে চূড়ান্তভাবে আতঙ্ক তৈরি করতে না পারলে তাঁরা কিছুতেই স্বেচ্ছায় ভারতবর্ষ ত্যাগ করবেন না। আর এইজন্য প্রয়োজন অ্যানার্কি। গুপ্তহত্যা। সেই পরিকল্পনা মোতাবেক ১৯১৩ সালের ১৭ মে তিনি লাহোরের লরেন্স গার্ডেনে কুখ্যাত ম্যাজিস্ট্রেট গর্ডন ও অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় ব্রিটিশ পুলিশ অফিসারদের হত্যা করার উদ্দেশে একটি শক্তিশালী বোমা পুঁতে রাখেন নৈশ ক্লাবের যাতায়াতের পথে। তবে মর্মান্তিক ব্যাপার হল, কোনও জাঁদরেল ব্রিটিশ শাসক বা অফিসার নন, এই বিস্ফোরণের ঘটনায় নিহত হন একজন ভারতীয় ছাপোষা চাপরাশি।

পরপর দিল্লি কাণ্ড ও লাহোর বিস্ফোরণ হওয়ায় ব্রিটিশ পুলিশের তদন্ত ও তৎপরতা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। তাঁরা তদন্ত করে অনুধাবন করতে পারেন দুটো অপারেশনের উৎসস্থল একই জায়গায় এবং সেটা বিপ্লবের আঁতুরঘর অবিভক্ত বাংলা। শুধু তাই নয়, গোয়েন্দাদের মাধ্যমে তাঁরা নিশ্চিত হন, উভয়ক্ষেত্রেই একই ফর্মুলায় বোমা তৈরি করা হয়েছে।‌ কিছুদিনের মধ্যেই তাঁরা গোয়েন্দাসূত্রে জানতে পারেন, এই সশস্ত্র বিপ্লবের অন্যতম মাথা রাসবিহারী বসু এবং উভয় ক্ষেত্রেই বোমা তৈরি করেছেন চন্দননগরের বিপ্লবী ও বোমা বিশেষজ্ঞ মণীন্দ্রনাথ নায়েক।

লর্ড হার্ডিঞ্জ বোমা হামলার সময় বসন্তকুমারের বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর। বয়স কম হওয়ার কারণে আম্বালা ট্রায়াল কোর্টে তাঁকে ফাঁসির পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

রাসবিহারী-সহ অন্যান্য বিপ্লবীদের সংবাদ দিতে পারলে সংবাদদাতার নাম গোপন রেখে তাঁকে এক লক্ষ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে, এই মর্মে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার করতে থাকে। এদিকে দিল্লি স্টেশনে পৌঁছে ছবি-সহ নিজের নামের পোস্টার বিভিন্ন দেওয়ালে সাঁটা থাকতে দেখে কালবিলম্ব না করে রাসবিহারী বসু বসন্তকুমারকে সঙ্গে নিয়ে চন্দননগরে ফিরে আসেন। সেখানে বেশ কিছুদিন আত্মগোপন করে থাকেন। কিন্তু এইসময় আকস্মিকভাবে বসন্তকুমারের বাবার মৃত্যু হয়। এই দুঃসংবাদ পেয়ে শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে যোগদান করার জন্য চন্দননগর থেকে বসন্তকুমার কৃষ্ণনগরে কাকার বাড়িতে ওঠেন। কিন্তু এক ইনফর্মারের মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশ আগে থেকেই সাদা পোশাকে বাড়ি ঘিরে রেখেছিলেন। বসন্তকুমার বাড়ি ঢোকার কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এরপর তাঁকে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় দিল্লির লাল কেল্লায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে দিল্লি-লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা (Delhi-Lahore Conspiracy Case) রুজু করা হয়। তাঁর সঙ্গে বাল্মুকুন্দ, অবধ বিহারী এবং আমির চাঁদকেও বিচারের আওতায় আনা হয়।

লর্ড হার্ডিঞ্জ বোমা হামলার সময় বসন্তকুমারের বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর। বয়স কম হওয়ার কারণে আম্বালা ট্রায়াল কোর্টে তাঁকে ফাঁসির পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু শুরু থেকেই ব্রিটিশ সরকার এই রায়ে একেবারেই সন্তুষ্ট ছিলেন না। তাঁরা লাহোর হাইকোর্টে কঠোর সাজা চেয়ে ফের আপিল করেন। এইসময় ব্রিটিশদের প্ররোচনায় যুগান্তর দলের দীননাথ এবং সুলতানচাঁদ-সহ আরও কেউ কেউ রাজসাক্ষী হয়ে প্রচুর নথিপত্র ও স্বীকারোক্তি দেন হাইকোর্টে। এসবের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট হাইকোর্টের তৎকালীন দুই ব্রিটিশ বিচারক স্যর ডোনাল্ড জনস্টন এবং মি রেটিগান তরুণ বিপ্লবী বসন্তকুমার বিশ্বাসের বয়সকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। এ-প্রসঙ্গে আরও একটি জনশ্রুতি আছে, কোর্ট এবং পুলিশ কারসাজি করে নাকি বসন্তকুমারের বয়স দু’বছর বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।

১৯১৫ সালের ১১ মে, পাঞ্জাবের আম্বালা কেন্দ্রীয় কারাগারে মাত্র ২০ বছর বয়সে এই বীর বিপ্লবীকে ফাঁসি দেওয়া হয়। বলা বাহুল্য, তিনি অত্যন্ত হাসিমুখে এবং নির্লিপ্ততার সঙ্গে ফাঁসির দড়ি গলায় পরেছিলেন। বসন্তকুমারের ফাঁসির খবর শুনে তাঁর রাজনৈতিক গুরু রাসবিহারী বসু জাপান থেকে গভীর শোক প্রকাশ করেছিলেন। তিনি টোকিওতে সম্পূর্ণ নিজের উদ্যোগে প্রিয় শিষ্যের একটি মূর্তিও বানান।

ব্রিটিশদের চোখে বসন্তকুমার বিশ্বাস এতটাই বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিলেন যে আন্তর্জাতিক রীতিনীতি উপেক্ষা করে, কারচুপি করে বয়স বাড়িয়ে মাত্র কুড়ি বছর বয়সে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়।

ভারত মায়ের স্বাধীনতার ছিনিয়ে আনার জন্য নির্ভীক বিপ্লবী বসন্তকুমার বিশ্বাসের এই আত্মবলিদান পশ্চিমবঙ্গবাসীরা তো বটেই, এমনকী ইতিহাস সচেতন সমস্ত ভারতবাসী তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। যদিও মাস্টারদা সূর্য সেন, ক্ষুদিরাম বসু, বাঘা যতীন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, বিনয়-বাদল-দীনেশ, বীণা দাস প্রমুখ বাংলার সশস্ত্র বিপ্লবীরা স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে যতটা পরিচিত নাম, কিন্তু বসন্তকুমার বিশ্বাস সেই ধারারই সুসংগঠিত ও সর্বভারতীয প্রতিনিধি হলেও, আশ্চর্যের বিষয়, তিনি তত সমাদৃত নাম নন।

তথাপি একথা অনস্বীকার্য, তাঁর জীবন দেখায় কীভাবে নদিয়ার প্রত্যন্ত এক গ্ৰামের তরুণ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের একেবারে শীর্ষস্থানীয় শাসককে লক্ষ্য করে আঘাত হানার সাহস খুব বয়সেই অর্জন করেছিলেন। ব্রিটিশদের চোখে তিনি এতটাই বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিলেন যে আন্তর্জাতিক রীতিনীতি উপেক্ষা করে, কারচুপি করে বয়স বাড়িয়ে মাত্র কুড়ি বছর বয়সে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়। আরও একটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে, বসন্তকুমার বিশ্বাসের বিপ্লবী কর্মকাণ্ড শুধুমাত্র অবিভক্ত বাংলায় সীমাবদ্ধ ছিল না, ছড়িয়ে ছিল পাঞ্জাব-সহ ভারতের অন্যত্রও। এই কারণে বসন্তকুমার বিশ্বাস শুধু একজন অবিভক্ত বাংলার বিপ্লবী নন, তিনি ছিলেন ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে একজন কিংবদন্তি শহিদ।

নদিয়ার সেই ঐতিহ্যবাহী বিশ্বাস পরিবারেরই সন্তান জেলা তথা রাজ্যের অন্যতম রাজনৈতিক নেতা ও প্রাক্তন মন্ত্রী উজ্জ্বল বিশ্বাস। বসন্ত বিশ্বাসের পারিবারিক উত্তরাধিকারকে কিছুটা ঢাল করে এব়ং দলের শীর্ষ নেত্রীর আস্থাভাজন হওয়ার সূত্রে নদিয়া জেলার রাজনীতিতে এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে রাজত্ব করেন। কৃষ্ণনগর দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রের তিনবারের বিধায়ক (২০১১-২০২৬) হওয়ার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সময়ে সামলেছেন রাজ্যের কারা দপ্তর-সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের মন্ত্রিত্ব।

একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, প্রাক্তন মন্ত্রী উজ্জ্বল বিশ্বাসের এই গ্রেপ্তারি শুধুমাত্র একজন রাজনৈতিক নেতা ও মন্ত্রীর পতন নয়, এটি নিজেরই পরিবারের পূর্বসূরিদের বিপ্লবী আদর্শের প্রতিও একপ্রকার বিশ্বাসঘাতকতা।

জেলা রাজনীতির ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুতে থাকার পরও তৃণমূলের নিজস্ব রাজনীতির কালিমা তিনি এড়াতে পারেননি। সম্প্রতি তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক ও নৈতিক দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে। জনসাধারণের জন্য বরাদ্দ জরুরি সরকারি ত্রাণসামগ্রী দুর্গতদের মধ্যে বিতরণ না করে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি তা নিজের ব্যক্তিগত হেফাজতে রেখেছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ রয়েছে তা কতটা সত্য, একদিন নিশ্চিতভাবেই উদঘাটিত হবে। তবে খুব বড় আকারের দুর্নীতির সঙ্গে তাঁর নাম এখনও পর্যন্ত প্রকাশ্যে না এলেও, একথাও কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না, তিনিও নানান অনৈতিক কাজ এবং স্বজনপোষণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। হয়তো সেকারণেই যে মানুষটি একসময় রাজ্যের কারা বিভাগের মন্ত্রী ছিলেন, আজ নিয়তির পরিহাসে তাঁকেই লকআপের অন্ধকারে রাত কাটাতে হচ্ছে।

আরও একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, প্রাক্তন মন্ত্রী উজ্জ্বল বিশ্বাসের এই গ্রেপ্তারি শুধুমাত্র একজন রাজনৈতিক নেতা ও মন্ত্রীর পতন নয়, এটি নিজেরই পরিবারের পূর্বসূরিদের বিপ্লবী আদর্শের প্রতিও একপ্রকার বিশ্বাসঘাতকতা। পাশাপাশি কৃষ্ণনগরের মতো একটি সাংস্কৃতিক শহর, যে শহরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রামতনু লাহিড়ী, অমিয়নাথ স্যানাল, প্রমথ চৌধুরী, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম, বীণা দাস, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সুধীর চক্রবর্তী, দেবদাস আচার্যর মতো প্রখ্যাত ও বিদগ্ধ ব্যক্তিরা, তাঁদের পুণ্যভূমির সাংস্কৃতিক চেতনার উপর এক আঘাত।

যেখানে লাভজনক ও নিরাপদ চাকরি ছেড়ে দিগম্বর বিশ্বাস এবং বিষ্ণুচরণ বিশ্বাস নীলচাষীদের সংগঠিত করে নীলকরদের বিরুদ্ধে নীল বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন এবং বসন্তকুমার বিশ্বাস দেশের মানুষের জন্য দেশমাতৃকার শৃঙ্খলা মোচনের জন্য মাত্র কুড়ি বছর বয়সেই নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন সেখানে সেই বংশেরই একজন সদস্য প্রাক্তন বিধায়ক‌ এবং কারামন্ত্রী নিজের ব্যক্তিগত তহবিল এবং প্রতাপ বাড়ানোর লক্ষ্যে সাধারণ মানুষের ত্রাণের সামগ্রী-সহ নিজের হেফাজতে রেখে দেন। এছাড়াও আরও বেশ কিছু দুর্নীতি, অনিয়ম এবং স্বজনপোষণের দায়ে তিনি অভিযুক্ত।

তৃণমূল কংগ্রেসের মতো আপাদমস্তক একটি দুর্নীতিগ্ৰস্ত ও জঙ্গলের রাজত্ব সৃষ্টিকারী একটি দলের নেতা হওয়ার সূত্রে ক্রমে ক্রমে মন্ত্রী উজ্জ্বল বিশ্বাস নিজেও নানান ধরনের স্বজনপোষণ এবং কিছুটা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পরেন। ক্ষমতার অহংকার, অন্যায়কে মদত দেওয়া, জনবিচ্ছিন্নতা এবং সিন্ডিকেটের সঙ্গে সংযোগ তাঁকেও কলুষিত করে। তাছাড়া মুখ্যমন্ত্রী-সহ সমগ্ৰ তৃণমূল দলের দুঃশাসন, বেহাল শিক্ষাব্যবস্থা, চুরি, তোলাবাজি, ধর্ষণ এবং ধর্ষণসহ যেকোনও ধরনের ক্রাইমের সঙ্গে যুক্তদের বিচার না হওয়ার কলঙ্কও তাঁর গায়ে পরোক্ষভাবে এসে লাগে।

দীগম্বর বিশ্বাস, বিষ্ণুচরন বিশ্বাস এবং বসন্ত বিশ্বাসেরর মতো অকুতোভয় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের গৌরবময় পারিবারিক ইতিহাস ও কৃষ্ণনগরের স্থানিক মাহাত্ম্যকে কীভাবে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে, একজন আপাতভদ্র এবং দুর্নীতিপরায়ণ প্রাক্তন মন্ত্রী তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ প্রাক্তন কারামন্ত্রী উজ্জ্বল বিশ্বাস।

সর্বশেষ খবর

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *