বিনা যুদ্ধে নাহি দেব… হেরেও অমলিন থাকবে ভোজিনহাদের রূপকথা, কষ্টের জয়ে শেষ ষোলোয় আর্জেন্টিনা

বিনা যুদ্ধে নাহি দেব… হেরেও অমলিন থাকবে ভোজিনহাদের রূপকথা, কষ্টের জয়ে শেষ ষোলোয় আর্জেন্টিনা

ইন্ডিয়া খবর/INDIA
Spread the love


আর্জেন্টিনা: ৩ (মেসি, লিসান্দ্রো, ডিনে আত্মঘাতী)
কেপ ভার্দে: ২ (ডুয়ার্তে, কাব্রাল)
বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সূচ্যগ্র মেদিনী। কেপ ভার্দে পারেনি। ভোজিনহারা বিশ্বকাপের বাইরে। জিতে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় আর্জেন্টিনা। কিন্তু সবসময় জয়টাই শেষ কথা নয়। হয়তো অনেক সময় বুঝিয়ে দিতে হয় আমরা আছি, লড়াইয়ের ময়দান ছাড়িনি। ছাড়ব না। গোটা দুনিয়া দেখো, আমাদের জেদ, আমাদের লড়াই। আমরা দু’বেলা মরার আগে মরব না ভাই মরব না। সামনে লিওনেল মেসি থাকুক, তিনি দাঁড়িয়ে দেখবেন। আতঙ্কিত হবেন, দুশ্চিন্তা করবেন। হয়তো জিতবেন। তবু শেষ পর্যন্ত মনে থাকবে আমরা তাঁকে কতটা বেগ দিয়েছিলাম। কেপ ভার্দের ফুটবল আজ সেই গল্পটা লিখে গেল। শেষ পর্যন্ত তারা মেসিদের কাছে ২-৩ গোলে হেরেছে। দু’বার পিছিয়ে পড়ে কামব্যাক করেছে সাড়ে পাঁচ লক্ষের দেশ। আর্জেন্টিনা জিতেছে, এটা বোধহয় আর কাহিনি নয়। হেরে বিদায় নিয়েও ভোজিনহারা বলে গেলেন, আমাদের লড়াইয়ের গল্পগুলোই ফুটবলের সৌন্দর্য।

মায়ামিতে ‘ঘরের মাঠে’  প্রথমে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দিয়েছিলেন লিওনেল মেসি। কিন্তু ৬০ মিনিটে সমতা ফেরান কেপ ভার্দের ডুয়ার্তে। অতিরিক্ত সময়ের শুরুতে লিসান্দ্রো মার্টিনেজের গোলে ফের এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। ১০৩ মিনিটে ফের সমতা ফেরান কাব্রাল। অবশেষে ১১১ মিনিটে ডিনের আত্মঘাতী গোলে বিদায় নিল কেপ ভার্দে।

আরও পড়ুন:

এদিন প্রত্যাশামতোই প্রথম একাদশে লাউতারো মার্টিনেজ ও থিয়াগো আলমাডাকে রেখেছিলেন আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি। ৪-২-২ ফর্মেশনে লাউতারো ও মেসি স্ট্রাইকার। কেপ ভার্দের মতো দল ৭ জনকে রক্ষণে নামিয়ে এনে ‘পার্ক দ্য বাস’ করবে, সেটাই স্বাভাবিক। এদিকে আর্জেন্টিনার উইংপ্লে পুরোপুরি বন্ধ। আলমাডা চূড়ান্ত ফ্লপ, ঠিকঠাক পাসও দিতে পারছেন না। আরেক উইংয়ে রড্রিগো ডি’পল। লাউতারোর সঙ্গে এমনিতেই মেসির লিঙ্ক-আপ হয় না। জোর করে সেটা করতে গিয়ে উইং বন্ধ। বক্সের পায়ের জঙ্গলের সামনে বল ঘোরাফেরা করল। কেপ ভার্দেকে সেভাবে বিব্রত করতে পারেনি।  বরং একটা দল আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে থাকলে কী করতে পারে, সেটাই দেখাল তারা। নিজেদের বক্সের মধ্যে লাউতারোকে ড্রিবল করলেন গোলকিপার ভোজিনহা। গ্যালারিতে তাঁর নামের জার্সি, তাঁর নামের স্লোগান। একটা দেশকে জাগিয়ে দিয়েছেন ভোজিনহা। হোক না সামনে সর্বকালের সর্বসেরা ফুটবলার। ভয়ডরহীন মানসিকতায় আসলে ভোজিনহার ইউএসপি।

সবসময় জয়টাই শেষ কথা নয়। হয়তো অনেক সময় বুঝিয়ে দিতে হয় আমরা আছি, লড়াইয়ের ময়দান ছাড়িনি। ছাড়ব না। গোটা দুনিয়া দেখো, আমাদের জেদ, আমাদের লড়াই। আমরা দু’বেলা মরার আগে মরব না ভাই মরব না।

তবে বিপক্ষের ফুটবলারটার নামও তো লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। এর আগে বহু গোলকিপার তাঁকে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। পারেননি। সম্ভবও না। ম্যাচের আধঘণ্টার মধ্যে তার প্রমাণ পেলেন ভোজিনহা। আর্জেন্তিনীয় ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্টিনেজের ক্রস এসে পড়ল কেপ ভার্দের বক্সে। মাপা ক্রস। তার থেকেও সুন্দর মেসির রিসিভ। বাঁপায়ের আলতো ছোঁয়ায় পরম যত্নে বল নামিয়ে জালে জড়িয়ে দিলেন। কিছুই করার ছিল না ভোজিনহার। চলতি বিশ্বকাপে ৭টা গোল হয়ে গেল মেসির। মোট গোল দাঁড়াল ২০। প্রথমার্ধে সেভাবে গোলের সুযোগ তৈরি করতে না পারলেও আর্জেন্টিনার দাপটই বেশি ছিল।

তাহলে কি একতরফা হার মানবে কেপ ভার্দে? লড়াকু ফুটবলের কোনও ছাপ রেখে যাবে না? না, এত সহজে ছাড়ার পাত্র তারা নন। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই আচমকাই যেন অন্য রূপে দেখা গেল কেপ ভার্দেকে। এবার লড়াই হবে চোখে চোখ রেখে। বলের দখল রেখে আর্জেন্টিনার বক্সে মুহুর্মুহু আক্রমণ। অনেকক্ষণ চাপ নেওয়ার পর ভাঙল নীল-সাদা জার্সিধারীদের রক্ষণ। ৫৯ মিনিটের মাথায় ডেরোয় ডুয়ার্তে বল পেলেন বক্সের ভিতরে। লিসান্দ্রোর পায়ের তলা দিয়ে জোরালো শট। গোলকিপার এমি মার্টিনেজকে টপকে জালে বল জড়িয়ে গেল। এত বড় মঞ্চে, বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের বিরুদ্ধে এরকম ফিনিশ স্বপ্নের মতো। কিন্তু কেপ ভার্দের কাছে কোনও কিছুই আর স্বপ্ন নয়। বাস্তব।

FIFA World Cup 2026: Lionel Messi’s Argentina and Cape Verde match result
গোলের পর কেপ ভার্দের ডুয়ার্তে

তারপর দেখা গেল কেন ভোজিনহাকে নিয়ে এত মাতামাতি হচ্ছে? ৪০ বছর বয়সি গোলকিপার এবার বিশ্বকাপে অবিশ্বাস্য পারফর্ম করেছেন। মেসির বিরুদ্ধেও কি সেই ভোজবাজি চলবে? প্রথমার্ধে তো একবার পরাস্ত হয়েছেন। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে দেখা গেল ‘চেনা’ ভোজিনহাকে। মেসির একটা ফ্রিকিক শূন্যে উড়ে বাঁচালেন। অবশেষে এল সেই বহুপ্রতীক্ষিত মুহূর্ত। সম্মুখ সমরে মেসি বনাম ভোজিনহা। কিন্তু আর্জেন্তিনীয় কিংবদন্তি বল মারলেন ভোজিনহার গায়ে। দ্বিতীয়ার্ধের শেষ দিকে তেড়েফুঁড়ে উঠেছিল গতবারের বিশ্বজয়ীরা। পরে নামানো হয় জুলিয়ান আলভারেজ, নিকো গঞ্জালেজকে। কখনও রবার্তো লোপেজের ক্লিয়ারেন্স, কখনও ভোজিনহার সেভ। একটি হ্যান্ডবলের আবেদনও নাকচ হয়। সব মিলিয়ে পশ্চিম আফ্রিকার দ্বীপরাষ্ট্রকে টলানো যায়নি। নির্ধারিত সময়ের খেলা শেষ হয় ১-১ গোলে।

FIFA World Cup 2026: Lionel Messi’s Argentina and Cape Verde match result
মেসির শট বাঁচাচ্ছেন ভোজিনহা

অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেই আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন লিসান্দ্রো। প্রথমে অ্যাসিস্ট, তারপর গোল। কর্নার থেকে ভেসে বল নামিয়ে জোরালো শটে গোল করেন তিনি। গতিতে পরাস্ত হন ভোজিনহা। কিন্তু ওই যে বিনা যুদ্ধে সূচ্যগ্র মেদিনীও দেব না। আর সেটা সিডনি লোপেজ কাব্রাল যেভাবে বুঝিয়ে দিলেন, তা চিরকাল ফুটবল প্রেমীদের মনে থেকে যাবে। ডানদিকের বক্সের মাথা থেকে যে কার্লারটা তিনি মারলেন, তা এমি কেন, ন্যয়ার-কাসিয়াস-বুঁফোরাও বাঁচাতে পারতেন না। গোল করেই সোজা গ্যালারিতে উঠে পড়লেন কাব্রাল। খুঁজলেন প্রিয় মানুষকে। অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধের ম্যাচ শেষ হয় ২-২ গোলে। অবশেষে ১১০ মিনিটে ডিনের আত্মঘাতী গোল। মেসির কর্নার থেকে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরা হেড দিতে উঠেছিলেন। কিন্তু তা ডিনের গায়ে লেগে গোল হয়ে যায়। হয়তো এটাই ভবিতব্য ছিল। এত লড়াইয়ের শেষে আত্মঘাতী ২-৩ গোলে হেরে বিদায় কেপ ভার্দের। তাও শেষ দিকে এমি মার্টিনেজ অবিশ্বাস্য কিছু সেভ না করলে হয়তো হেরে আমেরিকা ছাড়তে হত আর্জেন্টিনাকেই। এরকম গা-ছাড়া রক্ষণ নিয়ে ভবিষ্যতে আর্জেন্টিনার কপালে দুঃখ আছে। 

FIFA World Cup 2026: Lionel Messi’s Argentina and Cape Verde match result
গোলের পর কেপ ভার্দের কাব্রাল

অনেকে বলেন, পরাজিতদের কেউ মনে রাখে না। রাখে। যদি লড়াই করে হারে। যারা প্রতিনিয়ত নীচ থেকে লড়াই করে উপরে উঠে আসছে, তারা মনে রাখে। তারা বিশ্বাস করতে শেখে আমরাও পারব। কেপ ভার্দে পারেনি। তার পথ ধরে হয়তো আর কোনও ‘ছোট’ দল উঠে আসবে। পথটা তৈরি করে দিলেন ভোজিনহারা। সেই দিন হয়তো আর বেশি দূরে নেই। 

আরও পড়ুন:

সর্বশেষ খবর

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *