ফাড়ুয়া বেলচার গণতন্ত্র

ফাড়ুয়া বেলচার গণতন্ত্র

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


মোস্তাক মোরশেদ হোসেন

এবারে ভোটের ডিউটি পড়েছিল আলিপুরদুয়ারের রায়ডাক চা বাগানে। ভোটের মরশুমে উত্তরবঙ্গের চা বাগানগুলোর মেজাজটাই আলাদা। চারদিকে সবুজ চা পাতার গালিচা, আর তার মাঝেই শুরু হয় গণতন্ত্রের উৎসব। প্রিসাইডিং অফিসারের তকমা পিঠে সেঁটে যখন বুথে গিয়ে বসলাম, তখন মনে হচ্ছিল যেন কোনও এক যুদ্ধজয়ের দায়িত্ব আমার কাঁধে। আমার বুথের ভোটারদের নিরানব্বই শতাংশই আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ। সরল, সোজা এবং মেজাজি। পটাপট ভোট পড়ছে। দেখে অবাক হলাম, ওখানকার আদিবাসীরা বাংলা ভাষায় দারুণ সাবলীল। নিজের মনেই ভাবলাম, ‘যাক, ভাষা অন্ততপক্ষে কাজের মাঝে দেওয়াল খাড়া করবে না!’

দুপুরবেলা ফার্স্ট পোলিং অফিসার যখন খেতে গেলেন, তখন চেয়ার ছেড়ে আমিই বসলাম তাঁর কাজে। চোখে চশমা, বেশ একটা ‘ইনচার্জ ইনচার্জ’ ভাব। পোলিং এজেন্টরা একে একে নাম ঘোষণা করছেন, আর আমি তালিকায় টিক দিচ্ছি। বুথের জানলাগুলো বন্ধ, আলো একটু কমই বলা চলে। তায় আবার আমার চশমাটা এখন বিশ্বাসঘাতকতা শুরু করেছে, পাওয়ার বদলানো দরকার। আবছা আলোয় নামগুলো ঠিক পড়া যাচ্ছিল না। ঠিক তখনই বুথে ঢুকলেন মাঝবয়সি যুস্টিন খাড়িয়া।

আমি চশমাটা নাকে ঠিক করে বসিয়ে নামটা উচ্চারণ করলাম— ‘খ্রিস্টিন খাড়িয়া’। আর যায় কোথায়! যুস্টিন সাহেব অমনি ব্রেক কষলেন। দাঁড়িয়ে পড়ে ভ্রূ কুঁচকে বললেন, ‘স্যর, এটা কী করলেন? আমার নাম তো যুস্টিন। আপনি খ্রিস্টিন ডাকলেন কেন?’ ভালো করে দেখে বুঝলাম, ও হরি! ভুলটা তো আমারই। ভদ্রতার খাতিরে চট করে মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল— ‘সরি!’ কিন্তু ওই এক শব্দেই হিতে বিপরীত। যুস্টিন তেড়েমেরে এলেন, ‘সরি বললে হবে? আমার নাম বদলে দেবেন আপনি?’ আত্মপক্ষ সমর্থনে কোনওমতে বললাম, ‘দাদা, চোখের চশমাটা ঠিকঠাক কাজ করছে না, তাই নামটা ভুল পড়েছি।’ যুস্টিনের পালটা যুক্তি অকাট্য, ‘আমিও তো চশমা পরি। আমারও তো চোখ খারাপ। আমার তো এমন ভুল হয় না!’ রেহাই পেতে শেষমেশ হাতজোড় করে বলতে হল, ‘দাদা, আর এমন ভুল কোনওদিন হবে না।’ এবার যুস্টিন খুশি। মুখে একরাশ আত্মতৃপ্তির হাসি নিয়ে ভোট দিলেন। হয়তো মনে মনে ভাবলেন, ‘শহুরে অফিসারকে কেমন টাইট দিলাম!’ পোলিং এজেন্ট আর আমার সহকর্মীরা তখন মিটিমিটি হাসছেন। আমি তখন যেন লজ্জায় মাটিতে মিশে যাচ্ছি।

স্মৃতির সরণি বেয়ে তখন মনে পড়ে গেল বাবার মুখে শোনা সেই চার দশক আগের কাহিনী। ভুটান সীমান্তের রামঝোরা চা বাগানের কথা। তখন ভোট মানেই এলাহি কারবার। আর পোলিং অফিসার মানে গ্রামের চোখে আধ-সরকারি আর আধ-যমরাজ। সেই গুরুদায়িত্ব পড়েছিল এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের ওপর। তিনি শুধু মাস্টারমশাই নন, ছিলেন ঘোর আরএসপি কমরেড। ভোটের ক’দিন আগে তিনি ওই এলাকাতেই লালঝান্ডা হাতে ভোট চেয়ে মিটিং করে এসেছেন। ফলে তাঁর মুখ চেনে না, এমন মানুষ ওই তল্লাটে কমই ছিল।

ভোটের দিন সকাল থেকে তিনি বেশ কড়া মেজাজে বুথ সামলাচ্ছেন। যেন গণতন্ত্রের সবটুকু দায় তাঁর একারই কাঁধে। এমন সময় বুথে ঢুকলেন এক চা শ্রমিক। পরনে ময়লা গেঞ্জি আর বহুদিনের পুরোনো হাফপ্যান্ট। বুথে ঢুকেই মাস্টারমশাইকে দেখে লোকটির চোখ চকচক। তারপর বুথ কাঁপিয়ে একগাল হেসে চেঁচিয়ে উঠলেন- ‘আরে কমরেড! লাল হিন্দ!’ বলেই এমন একখানা সেলাম ঠুকলেন যে মনে হচ্ছিল বুথ নয়, ভুল করে লোকাল পার্টি অফিসে ঢুকে পড়েছেন। মাস্টারমশাইয়ের মুখ তখন চুন। পাশে বসে আছেন কংগ্রেসের পোলিং এজেন্ট, যাঁর চোখ দুটো আবার বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ। একটু এদিক-ওদিক হলেই ‘নিরপেক্ষ নির্বাচন’ সোজা পুলিশ স্টেশনে গিয়ে দমে যাবে! মাস্টারমশাই তড়িঘড়ি গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক আছে, আগে ভোট দিন, জলদি ভোট দিন… বেশি কথা বলবেন না!’ কিন্তু সেই ভোটার তখন আবেগে ভেসে যেতে পারলে বেঁচে যান। যাওয়ার সময় মাস্টারমশাইকে শুনিয়ে বললেন, ‘কমরেড, পরে কিন্তু আবার মিটিং হবে!’ মাস্টারমশাই প্রায় হাতজোড় করেই তাঁকে বুথের বাইরে পাঠালেন। লোকটি বেরিয়ে যেতেই তিনি এমন এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন, যেন একা হাতে একাই গণতন্ত্রকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। বলে রাখা ভালো, সেই পোলিং এজেন্টটি ছিলেন আমারই প্রয়াত বাবা।

চা বাগানে আসলে জীবনের সমীকরণগুলো অন্যরকম। চলন্ত ট্রেনের জানালা দিয়ে যখন আমরা দিগন্তবিস্তৃত চা বাগান দেখি, তখন আমাদের রেটিনায় কেবল সবুজের মায়া তৈরি হয়। ডিএসএলআর নিয়ে ঘুরতে যাওয়া শহুরে পর্যটকদের কাছে সোমরা, মংরা বা বুধুয়ারা কেবল ‘সাবজেক্ট’। কিন্তু কুয়াশা সরতেই সেখানে শুরু হয় এক অসম লড়াই। মাথায় ঝুড়ি আর হাতে কচি পাতার স্পর্শ নিয়ে ওদের প্রতিদিনের পথ চলা। রোদে পোড়া দুপুর হোক বা ঝুম বৃষ্টির দিন— ওদের জীবনযুদ্ধ থামে না। দারিদ্র্য আর অভাব ওদের চিরস্থায়ী সঙ্গী। তবু এই কঠিন জীবনের খাঁজেই লুকিয়ে থাকে অফুরন্ত হাসির রসদ। সামান্য ভুল বোঝাবুঝি বা চটুল খুনশুটি ওদের নিস্তরঙ্গ জীবনে বড় আনন্দের ঢেউ নিয়ে আসে।

ভোট এলেই চা শ্রমিকদের কদর হঠাৎ আকাশছোঁয়া হয়ে যায়। বছরের বাকি সময় যাদের কেউ ফিরেও তাকায় না, ভোটের মরশুমে তারাই হয়ে ওঠেন ভিআইপি। নেতা-নেত্রীদের আনাগোনা, মিষ্টি হাসি আর কাঁধে হাত রেখে ‘উন্নয়ন হবেই’ গোছের প্রতিশ্রুতির বন্যায় ভেসে যায় বাগান। নেতারা আবার মাঝেমধ্যে ছোটখাটো পরীক্ষাও নেন— ‘চিহ্নটা চিনেছেন তো?’ সহজ-সরল শ্রমিকরা মাথা নেড়ে সায় দেন। নেতারাও খুশিতে গদগদ হয়ে ফিরে যান।

২০১৬ সালের কথা। ডুয়ার্সের চা বাগানজুড়ে তখন রাজনৈতিক দলবদলু হাওয়া বইছে। বামেদের কেল্লাগুলো একে একে তৃণমূলের দখলে যাচ্ছে। যেন ফুটবলের ট্রান্সফার উইন্ডো চলছে— আজ আরএসপি, কাল সিপিএম, পরশু তৃণমূল! বীরপাড়ার মান্নালাল জৈন তখন শাসকদলের দাপুটে নেতা। তাঁর লক্ষ্য ডিমডিমা চা বাগানের পুরোনো বাম ঘাঁটি ভাঙা। সেই দুর্গের অন্যতম স্তম্ভ ছিলেন প্রবীণ বুধুয়া কাকা। বহু বছরের পুরোনো আরএসপি কর্মী। এমন মানুষ তিনি, যিনি ভোটের দিন ঘুম থেকে উঠে আগে তাঁর ‘কোদাল-বেলচা’ প্রতীকটা স্মরণ করতেন, তারপর চা খেতেন।

অনেক তোড়জোড় আর বোঝানোর পর যুব কর্মীরা একদিন খবর দিল— ‘দাদা, কেল্লা ফতে! বুধুয়া কাকা এখন আমাদের লোক!’ মান্নালালবাবু বেশ খুশি। একদিন গেলেন বাগানের কাজ তদারকি করতে। চারপাশে উৎসবের আমেজ। কেউ পতাকা বাঁধছে, কেউ স্লোগান দিচ্ছে। তখনই হাফপ্যান্ট পরে কাঁধে গামছা ঝুলিয়ে হাজির বুধুয়া কাকা। যুব কর্মীরা গর্ব করে বলল, ‘দাদা, এই যে বুধুয়া কাকা। এখন পাকা ঘাসফুল।’ মান্নালাল একটু হাসলেন। বুধুয়াকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন— ‘তা বলো বুধুয়া, এবারে তুমি কাকে ভোট দেবে?’ বুধুয়া কাকার জবাব এল এক সেকেন্ডও দেরি না করে— ‘কেন? মমতাকে!’ মান্নালাল ভীষণ খুশি। বাহ, মগজ ধোলাই তো দারুণ হয়েছে! আরেকটু নিশ্চিত হতে দ্বিতীয় প্রশ্নটি করলেন— ‘বলি মমতার প্রতীক চিহ্নটা কী বলো দেখি?’ বুক ফুলিয়ে প্রবল আত্মবিশ্বাসে বুধুয়া কাকার উত্তর— ‘ফাড়ুয়া বেলচা!’ অর্থাৎ সেই কোদাল-বেলচা! মান্নালালের তখন অজ্ঞান হওয়ার জো! পাশে থাকা যুব কর্মীদের মুখ চা বাগানের শুকনো পাতার মতো ফ্যাকাশে। আসলে লাল পার্টির নেতারা তাঁকে বুঝিয়েছিলেন যে এবারের ভোটের আসল প্রতীকই হল ‘কোদাল-বেলচা’। বুধুয়া কাকাও সেটা এমনভাবে বিশ্বাস করেছিলেন যে মমতার কথা উঠলেই তাঁর মনে কোদাল-বেলচার উদয় হচ্ছিল। রাজনীতির ইতিহাসে আদর্শ বদলানো হয়তো সহজ, কিন্তু আজীবনের লালন করা ওই ভোটের প্রতীক বদলানো যে কতটা কঠিন, তা সেদিন হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলেন নেতারা।

চা বাগানের শ্রমিকরা যেমন সহজ-সরল, তেমনই দুঁদে। ওদের কাছে ছাগল, শুয়োর বা মুরগিও বড় সম্পদ। আর হবে না-ই বা কেন? ওগুলোই তো ওদের বিপদের বন্ধু। আর সেই সম্পদ রক্ষায় ওরা চিতাবাঘের সঙ্গে লড়াই করতেও পিছপা হয় না। সম্প্রতি দলমোড় চা বাগানে গিয়ে দেখি, সিমাল ওরাওঁ বাজি ফাটিয়ে গোরু-ছাগল চরাচ্ছেন। হাতে তাঁর পালোয়ান সাইজের গুলতি। বললাম, ‘চিতাবাঘ এলে কী করবেন?’ গুলতি বাগিয়ে দাঁত খিঁচিয়ে সিমাল বললেন, ‘আসতে দে শালাকে! মাথা ফাটিয়ে দেব!’ চিতাবাঘও চা বাগানের আর এক অংশ। গত নভেম্বরে ডিমডিমায় এক চিতাবাঘ বিকাশ ওরাওঁয়ের উঠোনে ঢুকে তাঁর প্রিয় শুয়োরটাকে কামড়ে ধরেছিল। বিকাশ কুড়ুল হাতে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। যদিও চিতাবাঘ বাজিমাত করে শুয়োর নিয়ে চম্পট দেয়। বিকাশ হাঁফাতে হাঁফাতে বলেছিলেন, ‘আরেকবার আসিস, তোর কপালে মরণ নিশ্চিত!’ আবার বান্দু লোহারের বাড়িতে ঢুকে মুরগি নিয়ে পালাচ্ছিল এক চিতাবাঘ। বান্দু খালি হাতেই তাঁর পিছু নিয়েছিলেন। চিতাবাঘ বেপাত্তা হয়ে যাওয়ার পর বান্দুর চিল চিৎকার, ‘চোর, চোর, চোর…!’

রাজনীতি, দারিদ্র্য আর চিতাবাঘ–­–সব মিলেমিশে চা বাগানে অদ্ভুত এক রসায়ন। সেখানে সরু পিচ রাস্তার ধারে বসে থাকা মংরার অট্টহাসি কিংবা বুধুয়া কাকার ‘ফাড়ুয়া বেলচা’র গল্পই শহুরে মানুষের কাছে জীবনের এক অন্য মানে তৈরি করে দেয়। চা পাতার সুবাস আর শ্রমিকদের এই অকৃত্রিম রসিকতাই তো উত্তরবঙ্গের প্রাণ!



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *