এখন চর্চার কেন্দ্রে ডিম। পুষ্টিগুণের আলোচনাকে ছাপিয়ে ডিম হয়ে উঠেছে হেনস্তার হাতিয়ার। বাংলা অভিধানে যেন ‘ডিম্বাস্ত্র’ শব্দটি স্থান পেয়েই গেল। কত যে ডিমের অপচয় হচ্ছে এভাবে, তার হিসেব নেই। অপছন্দের লোকের ওপর হামলা চালাতে ডিম হয়ে উঠেছে কিছুটা নরম অস্ত্র। এতে তেমন আঘাত লাগে না। ক্ষতবিক্ষত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু ডিমে মাখামাখি হয়ে চরম অস্বস্তি হয়। প্রকাশ্যে মর্যাদাহানি তো হয়ই।
বিধানসভা ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকে এই বহুল ব্যবহারে ডিম ব্যবসায়ীদের ভাগ্যে লক্ষ্মীলাভ। ডিমের দাম একধাক্কায় বেড়ে গিয়েছে। গরিবের পাতে ডিম পড়া কঠিন হয়ে উঠছে দামবৃদ্ধির কারণে। শাসক শিবির ও উত্তেজিত জনতার কাছে কদর বাড়ার বিপরীতে স্কুলের মিড-ডে মিল ও অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে বাচ্চাদের খাদ্যতালিকা থেকে ডিম বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সরকার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না করলেও স্কুলশিক্ষা মন্ত্রী দীপক বর্মনের মন্তব্যে সেই আশঙ্কা অমূলক নয়।
তিনি ডিমের চেয়ে রাজমা, সয়াবিনের বেশি পুষ্টিগুণের পক্ষে সওয়াল করেছেন। সরকার না বললেও ইসকনকে দায়িত্ব দেওয়ায় মিড-ডে মিলে ডিম বাদ পড়ার জল্পনা শুরু হয়েছে। ইসকনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে শুধু কলকাতায়। যেটা পাইলট প্রোজেক্ট বলা হচ্ছে। সফল হলে গোটা রাজ্যে কাজটা করবে ইসকন। বৈষ্ণবধর্মের প্রতিষ্ঠান ইসকন যে ডিম রান্না করে খাওয়াবে না, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
এতে কোনও সন্দেহ নেই যে, পুষ্টির ক্ষেত্রে ডিমের বিকল্প আছে। নিরামিশাষীরা সেই বিকল্পগুলি গ্রহণ করে পুষ্টির সংস্থান করেন। তবে এই নিয়ে আলোচনার আগে একটা প্রশ্ন ওঠে- ভারত যেহেতু একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, ফলে সেখানে স্কুলের পড়ুয়াদের পুষ্টি বিধানের দায়িত্ব কোনও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত! এধরনের প্রতিষ্ঠানের সেবামূলক কর্মসূচি থাকে। সেগুলিকে সামাজিক স্বার্থে স্বাগত জানাতে হয়।
কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে স্কুল পড়ুয়া ও অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে শিশুদের খাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত ডিম বাদ দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের খাদ্যাভ্যাস, শিশুদের খাদ্যের ধরন, পছন্দ ইত্যাদি বিবেচনা করা উচিত। ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে নয়, বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টি থেকে স্কুল ও অঙ্গনওয়াড়ির খাদ্যতালিকা তৈরি করা বাঞ্ছনীয়। গত বাজেটে রাজ্য সরকার মিড-ডে মিলের বরাদ্দ বাড়িয়েছে। যা অত্যন্ত জরুরি ছিল। এই সিদ্ধান্ত সাধুবাদযোগ্য। এতে সপ্তাহে ডিম বরাদ্দের পরিমাণ আরও বাড়ানো ও সামগ্রিক খাদ্যের গুণ বৃদ্ধি করা যায়।
বাঙালি সংস্কৃতিতে ডিম একটি অত্যন্ত উপাদেয় খাবার। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে তো বটেই। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, যেদিন মিড-ডে মিলে ডিম দেওয়া হয়, সেদিন স্কুলে পড়ুয়াদের উপস্থিতি ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। সরকারি স্কুলে গরিব, নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা বেশি পড়ে। তাদের কাছে ডিম অত্যন্ত আকর্ষণীয়। বরং রাজমার সঙ্গে তাদের তেমন পরিচিতি নেই। সয়াবিন অনেকের পছন্দের তালিকায় নেই। হেনস্তার জন্য ডিম ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করে পড়ুয়াদের পুষ্টি বিধানে নজর দেওয়া জরুরি।

