খাদের কিনারা থেকে বিশ্বজয়ের রূপকথা

খাদের কিনারা থেকে বিশ্বজয়ের রূপকথা

শিক্ষা
Spread the love


(ফর্ম সাময়িক, ক্লাস চিরস্থায়ী— এই মন্ত্রে ভর করেই সমালোচকদের কড়া জবাব দিয়ে খাদের কিনারা থেকে দেশকে বিশ্বকাপ এনে দিলেন সঞ্জু-অভিষেকরা)

কুশল হেমব্রম

আহমেদাবাদে টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের পর গোটা দেশ এখন উৎসবের ঘোরে ভাসছে। কিন্তু এই বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসের আড়ালে একটি রূঢ় সত্য নগ্নভাবে ফুটে উঠেছে— এ দেশের ক্রিকেট-জনতার আবেগ চরম পরিবর্তনশীল। গতকাল যাঁরা খলনায়ক ছিলেন, আজ রাতারাতি তাঁরাই জাতীয় বীর! গৌতম গম্ভীর বা অজিত আগরকারের দিকে কিছুদিন আগেও ধেয়ে আসছিল তীক্ষ্ণ কটাক্ষের বাণ, আজ তাঁদের মাথাতেই উঠছে জয়ের মুকুট। সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে সমালোচনা এখন আর গঠনমূলক নেই, তা অত্যন্ত বিষাক্ত ও নির্মম। কয়েকটা ইনিংসে রান না পেলেই খেলোয়াড়দের তুলোধোনা করা আমাদের যেন অলিখিত জাতীয় অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে। ক্রমাগত নেতিবাচক কোলাহল একজন খেলোয়াড়ের মানসিক স্থিতি নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু গম্ভীর এবং তাঁর থিংকট্যাংক ঠিক এই বিষাক্ত কোলাহলকেই ড্রেসিংরুমের দরজার বাইরে আটকে রাখতে পেরেছিলেন।

ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্টের আসল জয়টা মাঠের ২২ গজে নয়, হয়েছে ড্রেসিংরুমের চার দেওয়ালের অন্দরে। বাইরে যখন সমালোচনার প্রবল ঝড়, ফর্মে না থাকা খেলোয়াড়দের ছাঁটাইয়ের দাবিতে যখন সোশ্যাল মিডিয়া সোচ্চার, ম্যানেজমেন্ট তখন ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা দেখিয়েছে। ঈশান কিষান, সঞ্জু স্যামসন বা তরুণ অভিষেক শর্মা— টপ অর্ডারের এই তিন ব্যাটারই ধারাবাহিকতার অভাবে ভুগেছেন। কখনও শুরুটা ভালো করেও উইকেট ছুড়ে দিয়েছেন, তো কখনও খাতা খোলার আগেই ফিরেছেন। কিন্তু গম্ভীর এবং দলের অধিনায়ক তাঁদের ওপর থেকে এক মুহূর্তের জন্যও বিশ্বাস হারাননি। তাঁদের একটাই অমোঘ মন্ত্র ছিল— ‘ফর্ম সাময়িক, কিন্তু ক্লাস চিরস্থায়ী’। খেলোয়াড়দের যোগ্যতার ওপর ম্যানেজমেন্টের এই অবিচল বিশ্বাসই শেষপর্যন্ত ম্যাজিকটা করে দেখাল। যখন দলের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, ঠিক সেই মোক্ষম সময়েই, সব চাপের পাহাড় টপকে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজেদের জাত চেনালেন তাঁরা।

এই প্রত্যাবর্তনের সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ নিঃসন্দেহে সঞ্জু স্যামসন। গত রাতের মহাকাব্যিক ইনিংসের পর তাঁর বলা কথাগুলো শুধু ক্রিকেটের ব্যাকরণ নয়, যেন জীবনেরই এক অমোঘ মন্ত্র। টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কার হাতে নিয়ে তাঁর চোখেমুখে ছিল অদ্ভুত প্রশান্তি। ব্যক্তিগত সেঞ্চুরির মাইলস্টোনের প্রতি তাঁর বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। আমাদের রেকর্ড-সর্বস্ব ক্রিকেট সংস্কৃতিতে যা এক বিরল ঘটনা। নিজের রেকর্ড বিসর্জন দিয়ে দলকে জেতানোই তাঁর কাছে প্রাধান্য পেয়েছে, যা প্রমাণ করে তিনি কতটা পরিণত এবং দলের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ।

তবে এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে এক দীর্ঘ যন্ত্রণার ইতিহাস। ২০২৪ সালের বিশ্বকাপে ব্রাত্য থাকার কষ্ট তাঁকে কুরে খেয়েছে। সেই দিনগুলোতে তিনি হাল না ছেড়ে বারবার এই বিশ্বজয়ের মুহূর্তটা কল্পনা করতেন। এরপর নিউজিল্যান্ড সিরিজের পর মনোবল পুরোপুরি ভেঙে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল, এবার হয়তো সব শেষ! কিন্তু ঈশ্বরের পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন। সঞ্জুর কথায়, ‘স্বপ্ন দেখার সাহস দেখিয়েছিলাম বলেই আজ এই পুরস্কার পেলাম।’ গত কয়েক মাস ধরে শচীন তেন্ডুলকারের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ এবং অমূল্য পরামর্শ সঞ্জুকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলেছে। যখন চারপাশের সবাই মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন একজন কিংবদন্তির গাইডেন্স কতটা আত্মবিশ্বাস জোগাতে পারে, গত রাতে সঞ্জুর ব্যাট তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

একই রকম গভীর মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে গেছেন তরুণ ওপেনার অভিষেক শর্মাও। বিশ্বকাপ ফাইনালের মহারণে দাঁড়িয়ে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ্যে আনার জন্য বুকের পাটা লাগে। অভিষেক অকপটে সেই দ্বন্দ্বের কথা স্বীকার করেছেন। আইপিএলে দুর্দান্ত পারফর্ম করলেও, বড় টুর্নামেন্টের মাঝপথে এসে তিনি নিজের সামর্থ্য নিয়েই সন্দিহান হয়ে পড়েছিলেন। চরম হতাশায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে চোখে জল নিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন কোচ আর অধিনায়কের কাছে। তাঁরা তিরস্কার করেননি, বরং বুকে টেনে নিয়ে বলেছিলেন, ‘তুমিই আমাদের বড় ম্যাচগুলো জেতাবে। তোমার ওপর আমাদের পূর্ণ আস্থা আছে।’ এই একটা কথাই জিয়নকাঠির মতো কাজ করেছিল। নিজের ওপর বিশ্বাস হারানো একজন তরুণ যখন দেখেন গোটা দল তাঁর পাশে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে, তখন অসম্ভবকে সম্ভব করার স্পর্ধা জন্মায়। গতকাল আহমেদাবাদের মাঠে অভিষেকের ব্যাট যেন সেই ফিরে পাওয়া আত্মবিশ্বাসেরই জ্বলন্ত বিস্ফোরণ।

ঈশান কিষানের গল্পটাও অভিন্ন। চরম রানখরার পরেও ম্যানেজমেন্ট তাঁর সামর্থ্যে আস্থা রেখে দলে টিকিয়ে রেখেছিল। এই ত্রয়ীর ঘুরে দাঁড়ানোর অসামান্য আখ্যান আসলে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের এক দারুণ অনুপ্রেরণা। ক্রিকেট এখানে শুধু খেলা নয়, জীবনের নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। আমাদের জীবন সব সময় সরলরেখায় চলে না। চরম ব্যর্থতা বা লোকসানে ডুবে গিয়ে অনেক সময় মনে হয়, পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে। চারপাশের মানুষের সমালোচনা আর কটাক্ষ যখন বিষাক্ত তিরের মতো বেঁধে, তখন লড়াইয়ের ময়দান ছাড়তে ইচ্ছে করে। কিন্তু ঠিক সেই সময়টাতেই হাল না ধরে মাটি কামড়ে পড়ে থাকাটা সবচেয়ে বেশি জরুরি।

সঞ্জু, অভিষেক বা ঈশানরা গতকাল রাতে শুধু বিশ্বকাপ জেতেননি, চরম বাস্তব শিক্ষা দিয়ে গেলেন— মেধা থাকলেই হয় না, কঠিন সময়ে নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে প্রতিনিয়ত চেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়। একটা পুরোনো প্রবাদ আছে, ঈশ্বর তাঁদেরই সাহায্য করেন, যাঁরা নিজেদের সাহায্য করে। ঈশ্বর আপনার হয়ে মাঠে নেমে রান করে দেবেন না, কিন্তু নেটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘাম ঝরালে এবং ব্যর্থতার পরেও ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখলে, সুযোগ ঠিকই আসে। এই তরুণ তুর্কিরা প্রমাণ করলেন, স্বপ্ন দেখার সাহস আর অদম্য জেদ থাকলে খাদের কিনারা থেকেও বিশ্বজয় সম্ভব। বাইরের কোলাহল আর ট্রোলিংকে দূরে সরিয়ে নিজের কাজের ওপর ফোকাস করাই আসল চাবিকাঠি। এই জয় শুধু ভারতীয় ক্রিকেটের নয়, মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তির, হার না মানা বিশ্বাসের। আগামী প্রজন্মের কাছে এই বিশ্বকাপ জয় তাই শুধুমাত্র একটি ট্রফি হয়ে থাকবে না, হয়ে থাকবে প্রত্যাবর্তনের এক মহাকাব্যিক রূপকথা।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *