উত্তরবঙ্গে শিক্ষাবিস্তারে মিশনারিদের ভূমিকা—ঐতিহ্য, সামাজিক পরিবর্তন ও আধুনিক শিক্ষার ভিত্তি নির্মাণ।
শৌভিক রায়
বহুদিন আগের কথা। তখন ডিসেম্বর মাস এলেই অপেক্ষায় থাকতাম, কবে সেভেনথ ডে অ্যাডভেন্টিস্ট চার্চ থেকে ছাত্রছাত্রীরা বাইবেল বিতরণ করতে আসবে। উত্তরের ছোট্ট জনপদে তখনও অবশ্য বড়দিনের জাঁকজমক সেভাবে ছিল না। কেক, পেস্ট্রি ইত্যাদি পাওয়াও অনেক দূরের ব্যাপার। তবে চার্চ যে স্কুলটি পরিচালনা করত, সেই স্কুলের খ্রিস্টান শিক্ষকদের কোয়ার্টার্সে গেলে, ঘরে বানানো সুস্বাদু পাই পাওয়া যেত। শোনা যেত ক্রিসমাস ক্যারল। সবুজ ক্রিসমাস ট্রি সহ নানা রঙে চার্চ ও স্কুল সেজে উঠত।
তখনও জানতাম না, ১৯৪৯ সালে এমজে চ্যাম্পিয়ন তাঁর সহযোগী জেনসেনকে নিয়ে সুদূর কার্মাটাড় থেকে রবিনসন এসডিএ হাইস্কুল-কে সরিয়ে এনেছিলেন সেদিনের ছোট্ট ফালাকাটায়। ৫০০ একর জমি কেনা হয়েছিল শুভানুধ্যায়ী মিসেস রেমন্ডের আর্থিক সহযোগিতায়। বদলে গিয়েছিল স্কুলের নাম। সেদিন থেকেই শিক্ষা বিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে স্কুলটি। তবে শুধু শিক্ষাদান নয়। স্বাস্থ্যক্ষেত্রেও তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তৈরি হচ্ছে বিরাট হাসপাতাল। আসলে গোটা বিশ্বে শিক্ষা-স্বাস্থ্য পরিষেবায় সেভেনথ ডে অ্যাডভেন্টিস্ট চার্চের নাম প্রথম সারিতে। ফলে, শুধু ফালাকাটা নয়, উত্তরের বহু জনপদে তাদের সেবামূলক কাজ চলে নিঃশব্দে।
এটা ঠিক যে, মূলত ধর্ম প্রচারের জন্যই খ্রিস্টান মিশনারিরা উত্তরবঙ্গে (North Bengal) পা রেখেছিলেন। কিন্তু তাঁরা শুধুমাত্র সেই গণ্ডির মধ্যে নিজেদের আটকে রাখেননি। কোচবিহারের (Cooch Behar) কথাই ধরা যাক। ১৮৭৮ সালে মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণের সঙ্গে বিবাহের পর কোচবিহারে এসে, মহারানি সুনীতি দেবী এখানে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পেরেছিলেন। অনুভব করেছিলেন, মহিলাদেরও শিক্ষিত করে তুলতে হবে। তাঁর অনুরোধে মধ্যপ্রদেশ থেকে সুইডিশ মিশনের লিডিয়া ম্যাগুনসন কোচবিহারে আসেন। তাঁকে মহারানি প্রতিষ্ঠিত সুনীতি অ্যাকাডেমির সেলাই শিক্ষিকা হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। লিডিয়া চেয়েছিলেন মহারাজার নিজস্ব ব্যান্ড পার্টিতে কর্মরত খ্রিস্টান পরিবারের সন্তানরাও শিক্ষিত হয়ে উঠুক। তাঁর অনুরোধে সুনীতি দেবী মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণকে এ ব্যাপারে উদ্যোগী হতে অনুরোধ করেন। কিন্তু রাজ আমলে কোচবিহারে মিশনারিদের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। সুইডিশরা ছাড়া আর কোনও ইউরোপিয়ান মিশনারি শিক্ষা বিস্তার করতে পারবে না, এই শর্তে লিডিয়া ম্যাগুনসনের আবেদন গ্রাহ্য হয়। মধ্যপ্রদেশ থেকে নিয়ে আসা হয় লিলি উইলম্যানকে। ১৯০০ সালে তাঁর উদ্যোগে তৈরি হয় একটি হোম স্কুল। কালক্রমে সেটি শাখাপ্রশাখা বিস্তার করে আজ শহরের অন্যতম নামী স্কুল বলে পরিচিত। সুইডিশ মিশনের সঙ্গে আজ অবশ্য সেই স্কুলের সম্পর্ক নেই। তবে নর্দার্ন ইভাঞ্জেলিক্যাল লুথারেন চার্চের অধীনে রয়েছে অন্ধদের জন্য একটি স্কুল। আজ কোচবিহারে সুইডিশ মিশন বলতে সেটিকেও বোঝেন অনেকে।
আলিপুরদুয়ার (Alipurduar) শহরের একটি স্কুল, প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ ও আধিকারিক পিএন ম্যাকউইলিয়ামের নামে হলেও, তিনি কিন্তু সরাসরি মিশনারিদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। যেমন ছিলেন না ব্রিটিশ আধিকারিক ক্যাপ্টেন ফ্রান্সিস জেনকিন্স। তাঁর নাম উল্লেখ করলাম কারণ ওই নামে, ১৮৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত স্কুলটি আজ শুধু কোচবিহারের নয়, গোটা রাজ্যের গর্ব। তবে আলিপুরদুয়ার জেলার মহাকালগুড়ির শতবর্ষ প্রাচীন স্কুলটির ক্ষেত্রে স্কটিশ মিশনারি এডব্লিউএফ ম্যাককাচেনের প্রধান ভূমিকা ছিল। এই অঞ্চলটি বক্সা অরণ্যের রায়ডাক ডিভিশনের কাছাকাছি ও প্রত্যন্ত বলেই পরিচিত। আদিবাসী অধ্যুষিত এই এলাকায় শিক্ষাবিস্তারের প্রয়োজন নিয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। নারীশিক্ষার গুরুত্ব বুঝে এখানে মেয়েদের জন্যও আলাদা স্কুল স্থাপন করা হয়েছিল। আসলে পরবর্তী প্রজন্মকে শিক্ষিত করে তুলতে সবার আগে নারী শিক্ষার প্রয়োজন, সেটা বোধহয় মিশনারিদের চাইতে আর কেউ ভালো বোঝেননি। এই জেলাতেই ব্যাপ্টিস্ট মিশনের স্কুল দেখা যায় বীরপাড়ার মতো চা বাগান ও মেন্দাবাড়ির মতো অরণ্যে ঢাকা জনপদে। প্রেসবিটেরিয়ান, ক্যাথোলিক ইত্যাদি মিশনারিদের অবদানও কম নয় আলিপুরদুয়ার জেলার শিক্ষাবিস্তারে।
জলপাইগুড়ি জেলায় অন্যান্য যে মিশনারি সংস্থাগুলি দেখা যায় তাদের মধ্যে হিমালয়ান ইভাঞ্জেলিক্যাল মিশন, সেলেসিয়ান অফ ডন বসকো, চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়া, মিশনারিজ অফ চ্যারিটি, মান্না মিশন, মিশনারি সিস্টার্স অফ মেরি হেল্প অফ খ্রিস্টানস, বিলিভার্স ইস্টার্ন চার্চ, অ্যাসেম্ব্লিজ অফ গড ইত্যাদি প্রধান। এদের অধীনে থাকা বিভিন্ন স্কুলগুলির শিক্ষার্থীর সংখ্যা কিন্তু কম নয়। শুধু শিক্ষা প্রসারে নয়, এঁরা কাজ করছেন সমাজের নানা ক্ষেত্রে। জলপাইগুড়ির বিভিন্ন চা বাগানে তাঁদের সেবামূলক কাজ ইতিমধ্যেই নজর কেড়েছে। পিছিয়ে পড়া মুসলিম সমাজের জন্যও তাঁদের অবদান ঈর্ষণীয়। লঙ্কাপাড়া, মাকড়াপাড়ার মতো একসময়ের দুর্গম এলাকায়ও তাঁরা অনায়াসে পৌঁছে গিয়েছেন। কদমপুর, সিমলাবাড়িতেও চলছে মিশনারিদের কর্মযজ্ঞ। চালসা, নাথুয়া, বিন্নাগুড়ি ইত্যাদি অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থাও অনেক অংশে নির্ভর করছে মিশনারিদের প্রতিষ্ঠিত স্কুলগুলির ওপর। এই প্রসঙ্গে মালবাজারের শিক্ষাব্রতী রেভারেন্ড জন থ্যাটসের কথা বলতেই হয়। মালবাজারে বেড়াতে এসে তিনি দেখেন যে, এখানকার ছাত্রদের ইংরেজিমাধ্যমে পড়াতে দার্জিলিং, কালিম্পং কিংবা কলকাতায় পাঠানো হচ্ছে। তখনই তিনি এই অঞ্চলে প্রথম ইংরেজিমাধ্যম স্কুল স্থাপনের জন্য মনস্থির করেন। গড়ে ওঠে বয়েজ টাউন নামে অনাথ আশ্রম এবং তার অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয় একটি স্কুল। সেই স্কুল আজকের মালবাজারের গর্ব।
ডুয়ার্সের তরঙ্গায়িত ভূমি ছেড়ে যদি চোখ ফেরাই দার্জিলিং বা কালিম্পঙের পাহাড়ি অঞ্চলে, তাহলে দেখব পাহাড়ের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ক্ষেত্রে খ্রিস্টান মিশনারিরা অন্যদের চাইতে অনেক এগিয়ে। এখানে মূলত স্কটিশ মিশন ও রোমান ক্যাথোলিক মিশনকে চোখে পড়ে। তাঁদের কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছিল ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে। দীর্ঘ সময় ধরে পাহাড়ের সামাজিক বিকাশে তাঁদের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। এই রাজ্যের বহু নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঠিকানা হল দার্জিলিং পাহাড়। ভাবতে অবাক লাগে সেই কবে ১৯০০ সালে, ডক্টর গ্রাহামস হোমসের মতো মানুষ কালিম্পংয়ের ডেলো পাহাড়ের কাছে অনাথ আশ্রম সহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নিজের স্কুল। মনে পড়ছে রেভারেন্ড উইলিয়াম ম্যাকফার্লেনের কথাও। ১৮৭৩ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত স্কুলটি কালিম্পংয়ের প্রথম স্কুল। দার্জিলিংয়ের লরেটো কনভেন্ট অবশ্য আরও পুরোনো। এটির প্রতিষ্ঠা ১৮৪৬ সালে। মাদার টেরেজার সেন্ট হয়ে ওঠার ক্ষেত্রেও কিন্তু দার্জিলিংয়ের অবদান কম নয়। কেননা ভারতে এসে তিনি বেশ কিছুদিন ছিলেন দার্জিলিংয়ে। ফরেন মিশন সোসাইটি অফ প্যারিস, সুইস ক্যানন রেগুলারস, খ্রিস্টান ব্রাদার্স প্রমুখও পিছিয়ে নেই। পাহাড়ের লেপচা, নেপালি, ভুটিয়া সহ সব ধরনের মানুষকেই তাঁরা সামাজিক স্বাস্থ্যবিধি থেকে শুরু করে হাতেকলমে শিক্ষা দিয়েছেন।
একটি পরাধীন দেশের মানুষকে শিক্ষিত করে না তুললে, দেশটি যে এগোবে না সেটি বিলক্ষণ বুঝতেন মিশনারিরা। তাই ধর্মীয় শিক্ষা প্রদানের সঙ্গে, তাঁরা অনুভব করেছিলেন আধুনিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা। সেই সময় এই অঞ্চলের প্রাজ্ঞ মানুষরাও তাঁদের সাহায্য করেন। নিঃস্বার্থভাবে দান করেন স্কুলের জন্য জমি। দেন আর্থিক অনুদান। সামাজিক ও ধার্মিক অসহিষ্ণুতাকে দূরে সরিয়ে রেখে, দেশ গড়ার কাজে ব্রতী হন সকলেই। আজ যে শিক্ষার গর্ব করছি আমরা, তার পেছনে সেই মহাপ্রাণ মিশনারি ও স্থানীয় মানুষদের কথা ভুললে চলবে না।
(লেখক শিক্ষক। কোচবিহারের বাসিন্দা)
