শুভঙ্কর চক্রবর্তী
একসময় বাঙালির গর্ব ছিল তার শিক্ষা ও সংস্কৃতি। সেই বাংলার জনপ্রতিনিধিদের হলফনামার বিশ্লেষণ ভোটের আগে সাধারণ মানুষের মধ্যে শোরগোল ফেলে দিয়েছে। সোমবার প্রকাশিত অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মস (এডিআর)-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, বিধানসভা এখন আর শিক্ষিতদের তপোবন নয়, তা কার্যত পরিণত হয়েছে কোটিপতিদের নিলামকেন্দ্রে। শিক্ষার আলো সেখানে ম্রিয়মাণ, আর সম্পদের আস্ফালন দৃষ্টিকটুভাবে প্রকট। রাজ্যের ২৯৪টি আসনের মধ্যে ডোমকল, কৃষ্ণনগর উত্তর এবং তেহট্ট, তিন বিধানসভায় আপাতত বিধায়ক নেই। তথ্য বলছে, বাকি ২৯১ জন বিধায়কের মধ্যে ১৫২ জনই কোটিপতি, যা মোট বিধায়কের অর্ধেকেরও বেশি (৫২ শতাংশ)। এই সম্পদের পাহাড়ের চূড়ায় বসে থাকা জনপ্রতিনিধিরা যখন আইন প্রণয়ন করেন, তখন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যন্ত্রণার কথা তাঁরা কতটা উপলব্ধি করতে পারেন, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
২৯১ জন বিধায়কের ঘোষিত মোট সম্পদের পরিমাণ ৮২১.৫০ কোটি টাকা। সম্পদের এই দৌড়ে শাসক ও বিরোধী, দুই পক্ষই প্রায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ছুটছে। রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের ২২৩ জন বিধায়কের মধ্যে ১২৮ জন (৫৭ শতাংশ) কোটিপতি, আর পিছনের সারিতে থাকা বিজেপির ৬৪ জনের মধ্যে ২১ জন (৩৩ শতাংশ) বিধায়কের সম্পত্তির পরিমাণ এক কোটির গণ্ডি পেরিয়েছে। অন্যদিকে, বাংলার রাজনীতিতে যে চরম বৈষম্য বিরাজ করছে, তা বোঝা যায় বাঁকুড়ার নির্মলকুমার ধাড়ার মতো বিধায়কদের দেখলে, যাঁর সম্পত্তির পরিমাণ মাত্র ১,৭০০ টাকা।
উত্তরবঙ্গের পাহাড় থেকে সমতল, সর্বত্রই এই বৈভবের ছড়াছড়ি। দার্জিলিং, কালিম্পং বা উত্তরের অন্যান্য জেলার নেতারাও পিছিয়ে নেই। কালিম্পংয়ের বিধায়ক রুদেন সাদা লেপচার সম্পত্তির পরিমাণ ১৮ কোটির বেশি। পাহাড়ের এই নেতা রাজ্যের শীর্ষ দশ ধনী বিধায়কের তালিকায় ষষ্ঠ স্থানে জ্বলজ্বল করছেন। শুধু তাই নয়, ১২ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়ে তিনি রাজ্যের সর্বাধিক দায়গ্রস্ত বিধায়কদের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন। আবার বার্ষিক আয়ের নিরিখে রাজ্যের দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন রায়গঞ্জের বিধায়ক কৃষ্ণ কল্যাণী। ২০২২-২০২৩ অর্থ বছরে আয়কর রিটার্নে তাঁর নিজস্ব আয় দেখানো হয়েছে ২ কোটি ৭৬ লক্ষ টাকারও বেশি। এই তথ্যগুলি প্রমাণ করে যে, উত্তরবঙ্গের পিছিয়ে পড়া বা অনুন্নত তকমা থাকলেও, সেখানকার জনপ্রতিনিধিদের ব্যাংক ব্যালেন্স যথেষ্টই পুষ্ট।
সম্পদের পাশাপাশি যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক, তা হল অপরাধের সঙ্গে রাজনীতির ক্রমবর্ধমান সখ্য। শিক্ষাগত যোগ্যতা যেখানে ক্রমশ গুরুত্ব হারাচ্ছে, সেখানে পেশিশক্তি এবং অপরাধের খতিয়ান যেন রাজনীতির ময়দানে টিকে থাকার নতুন মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজ্যের ১৩৬ জন বিধায়ক (৪৭ শতাংশ) নিজেদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার কথা হলফনামায় সগর্বে ঘোষণা করেছেন। এর মধ্যে ১০৯ জনের বিরুদ্ধে রয়েছে খুন, খুনের চেষ্টা বা নারীর ওপর অত্যাচারের মতো গুরুতর অপরাধের অভিযোগ। অপরাধের এই কালিমালিপ্ত তালিকায় শাসকদলের ৪১ শতাংশ এবং বিজেপির ৬৬ শতাংশ বিধায়ক রয়েছেন। উত্তরবঙ্গও এই কলঙ্ক থেকে মুক্ত নয়। কোটিপতি হওয়ার পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের জনপ্রতিনিধিরা অপরাধের খাতাতেও নাম তুলেছেন। দিনহাটার বিধায়ক উদয়ন গুহ ৫ কোটি টাকার বেশি সম্পত্তির মালিক এবং তিনি খুন ও খুনের চেষ্টার মতো গুরুতর ফৌজদারি মামলার আসামি। একইভাবে চোপড়ার বিধায়ক হামিদুল রহমান ১ কোটি টাকার বেশি সম্পত্তির অধিকারী হয়েও খুন এবং ধর্ষণের মতো জঘন্য অভিযোগে অভিযুক্ত।
ঐশ্বর্যের সমান্তরালে শিক্ষার খাতাটি যেন বড়ই মলিন। আগেকার দিনে জননেতা মানেই ছিলেন এক-একজন সুপণ্ডিত, যাঁদের বাগ্মিতায় যুক্তির পিঠে যুক্তি সাজানো থাকত। বর্তমান পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, কোটিপতি বিধায়কের সংখ্যা যখন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, তখন উচ্চশিক্ষার হার সেখানে নিম্নমুখী। ২৯১ জন বিধায়কের মধ্যে একজন নিরক্ষর বিধায়ক রয়েছেন, যিনি তৃণমূল কংগ্রেসের। আবার শুধু স্বাক্ষর করতে পারেন এমন একজন গত পাঁচ বছর ধরে বিজেপির টিকিটে জয়ী হয়ে জনপ্রতিনিধি হিসাবে বিধানসভায় রয়েছেন। রাজ্য বিধানসভায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী বিধায়কের সংখ্যা ৫৮ হলেও, অষ্টম শ্রেণি উত্তীর্ণ বিধায়কের সংখ্যা ১৬। শিক্ষার আলোর যখন সমাজকে পথ দেখানোর কথা, তখন আমাদের জনপ্রতিনিধিদের বড় অংশের কাছে পাঠ্যবইয়ের চেয়ে হলফনামার মামলার সংখ্যা অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এই নিম্নগামী শিক্ষা আর ঊর্ধ্বমুখী সম্পদের গ্রাফ আসলে এক গভীর সংকটের ইঙ্গিতবাহী। যে জাতির কান্ডারিদের অভিজ্ঞতার ঝুলিতে খুনের চেষ্টা কিংবা ধর্ষণের মতো জঘন্য মামলার কালিমালিপ্ত ইতিহাস থাকে, তাঁদের কাছ থেকে সুশাসন প্রত্যাশা করা যেন মরুভূমিতে মরীচিকার সন্ধান করা।
পেশিশক্তি আর অর্থের জোরে যখন আইন প্রণেতা হওয়া যায়, তখন সেখানে জনকল্যাণ ব্রতটি নিছকই এক আলংকারিক শব্দে পরিণত হয়। উত্তরবঙ্গের জনপদগুলোর সমস্যা সমাধানে এই বিশাল সম্পদ বা মামলার পাহাড় কতটা কার্যকর হবে, তা সময়ই বলবে। তবে এই রিপোর্ট সাধারণ পাঠকের মনে এক তীব্র বিড়ম্বনা তৈরি করেছে। শিক্ষার পীঠস্থান হিসেবে পরিচিত বাংলা বিত্ত আর বিকৃতির কাছে মাথা নোয়াচ্ছে। গণতন্ত্রের উৎসবে আমাদের দেওয়া ভোটের বিনিময়ে কি কেবল এক ঝাঁক ‘ধনী ও দাগি’ প্রতিনিধি পাওয়াই ছিল নিয়তি? সেই প্রশ্নই বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।
