রাহুল মজুমদার, শিলিগুড়ি: মাসদুয়েক শীতঘুমে থেকে খাদ্য সুরক্ষার স্পেশাল টাস্ক ফোর্স অভিযানে নামতেই পর্দাফাঁস হল শহরের নামীদামি খাবারের দোকানের। অভিযোগ, মুরগির কাঁচা মাংসে পোকা ধরেছে আর মোমোতে বাসা বেঁধেছে ছত্রাক। এমন অবস্থার পরও রেস্তোরাঁটির ঝাঁপ বন্ধ করেননি আধিকারিকরা। নমুনা সংগ্রহের পর বেরিয়ে যান। এর আগেও অবশ্য শিলিগুড়ির বিভিন্ন খাবারের দোকান থেকে নমুনা সংগৃহীত হয়েছিল, যার রিপোর্ট জনসমক্ষে আসেনি আজও।
শনিবার সকালে ঘটনাটি শিলিগুড়ি পুরনিগমের ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের এনটিএস মোড় সংলগ্ন এলাকায় (Siliguri)। সেখানে একটি নামী রেস্তোরাঁর দ্বিতীয় আউটলেট রয়েছে। প্রথমটি অবস্থিত হাকিমপাড়ায়। খাদ্যপ্রেমীদের কাছে পেছনদিকের উঠোনে বসার জায়গাটি বেশ জনপ্রিয়। ফুড ভ্লগার, সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদেরও মাঝেমধ্যে ঢুঁ মারতে দেখা যায়। সেখানেই এবার ফ্রিজে মজুত রাখা মাংসে পোকা কিলবিল করতে দেখা গেল। অভিযানের ভিডিও সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই শহরবাসীর ‘পেট গোলানো’ শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে, দেশবন্ধুপাড়ায় একটি বিতর্কিত মিষ্টির দোকানের ফ্রিজ থেকে রান্না করা মাংস মিলেছে। ওই দোকানের কারখানাটিতে ঢুকেও চরম অব্যবস্থার ছবি ধরা পড়ল। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রান্না হচ্ছিল বলে অভিযোগ।
রেস্তোরাঁ ও মিষ্টির দোকানের মালিকদের শুধুমাত্র নোটিশ ধরিয়েছে অভিযানকারী দলটি। অথচ, এদিনই এনটিএস মোড় সংলগ্ন একটি বিরিয়ানির দোকানে হানা দিয়ে শাটার নামিয়ে দেন আধিকারিকরা। তাঁদেরও নোটিশ দিয়ে ঊর্ধ্বতন আধিকারিকদের সঙ্গে দেখা করতে বলা হয়েছে। যা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরিয়ানিতে ফুড কালার বেশি পরিমাণে ব্যবহার করার যুক্তিতে এনটিএস মোড়ের দোকান বন্ধ করে দেওয়া হলেও রেস্তোরাঁ বা বড় দোকানটির ক্ষেত্রে কেন কড়া পথে হাঁটলেন না অভিযানকারীরা, সেই প্রশ্ন উঠছে। স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের এক সদস্য যদিও বললেন, ‘সকলকেই নোটিশ দিয়ে জবাব জানতে চাওয়া হয়েছে। দ্বিচারিতা হয়নি।’
বিরিয়ানির মাংসে পোকা পাওয়ার পরেই তড়িঘড়ি টাস্ক ফোর্স গঠন করেছিল পুরনিগম। ওই দলে পুরনিগম, পুলিশ, দমকলের পাশাপাশি স্বাস্থ্য, খাদ্য সুরক্ষা আর ক্রেতা সুরক্ষা দপ্তরের আধিকারিকরা রয়েছেন। প্রতি সপ্তাহে অভিযান চালিয়ে মেয়র গৌতম দেবের কাছে রিপোর্ট দেওয়ার কথা ছিল তাঁদের। অথচ এক সময় অজানা কারণে সাপ্তাহিক অভিযান বন্ধ হয়ে যায়। শহরের খাবারের দোকানগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি ভঙ্গের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে উত্তরবঙ্গ সংবাদে তিন কিস্তিতে খবর প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি। এরপরই নড়েচড়ে বসেন গৌতম। ফের সক্রিয় হওয়ার নির্দেশও দেন। গৌতমের বক্তব্য, ‘মানুষের স্বাস্থ্যের সঙ্গে কোনও আপস নয়। আমি আজ দেখলাম, কড়া পদক্ষেপ করা হবে।’
শনিবার ওই বিশেষ দল এনটিএস মোড়, দেশবন্ধুপাড়ায় অভিযান চালায়। এনটিএস মোড়ের বিরিয়ানির দোকানে দেখা যায়, মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণে ফুড কালার ব্যবহার হচ্ছিল। এরপর খানিকটা এগিয়ে একটি নামী রেস্তোরাঁর আউটলেটে ঢোকেন তাঁরা। হেঁশেলে ঢুকতেই মাথায় হাত পড়ে আধিকারিকদের। অভিযোগ, সুপে ভেসে বেড়াচ্ছিল আরশোলা। নোংরা আসবাবপত্রে রাঁধতে ও খাবার রাখতে যেমন চোখে পড়েছে, তেমন দেখা গিয়েছে বাসন ধোয়া হচ্ছে অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতিতে। রেস্তোরাঁর মালিকের নামে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে বেরিয়ে যায় দলটি।
তারপরের গন্তব্য ছিল দেশবন্ধুপাড়ার মিষ্টির দোকান। ফ্রিজে মিষ্টি তৈরির সামগ্রীর সঙ্গে ছিল রান্না করা মুরগির মাংস। এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে আরশোলা। বাসনপত্র অপরিচ্ছন্ন। ওই দোকানের মালিককেও নোটিশ ধরানো হয়। দোকানটির বিরুদ্ধে এর আগে টক টু মেয়র-এ অভিযোগ হয়েছিল। তবুও পদক্ষেপ করা হয়নি বলে অভিযোগ।
বিষয়টি জানাজানি হতেই ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়েছে নাগরিকদের মধ্যে। স্থানীয় সুজাতা পাল বলছিলেন, ‘অনেকেই ওই দোকান থেকে মিষ্টি কিনে পুজোতে ভোগ দেয়। কোন বুদ্ধিতে মাংস রাখা হল একসঙ্গে। মালিকের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ করতে হবে।’ দোকান মালিকের মেয়ে অন্বেষা মণ্ডলের যুক্তি, ‘কর্মীদের কেউ হয়তো খাবারের জন্যে ওই মাংস এনেছিল। ভুলবশত ওখানে রেখেছিল।’ অপরিচ্ছন্নতার অভিযোগ উড়িয়ে তাঁর দাবি, প্রতিদিনই নাকি রান্নাঘর পরিষ্কার করা হয়।
