সাগর বাগচী, শিলিগুড়ি : নদীর চরের মধ্যে অসংখ্য পাকা ও টিনের বাড়ি। তবে কোনওটি বৈধভাবে তৈরি নয়। চরের জমি দখল করে তৈরি।
গত ৬ অক্টোবর ভোররাতে মহানন্দা যেভাবে পোড়াঝাড়কে ভাসিয়েছিল ঠিক একইভাবে বালাসনের জল মাটিগাড়া–১ গ্রাম পঞ্চায়েতের নিমতলা এলাকায় ঢুকে পড়েছিল। প্রাণ বাঁচাতে বাসিন্দারা তাঁদের সমস্ত সামগ্রী ঘরেই ফেলে রেখে বাইরে বেরিয়ে এসেছিলেন। নয়তো সলিলসমাধি নিশ্চিত ছিল। চরের প্রতিটি বাড়িতে হুহু করে জল ঢুকে পড়ার পর থেকেই বাসিন্দারা আতঙ্কে। টাকা দিয়ে নদীর চরে বাড়ি বানিয়ে যে তাঁরা ভুল করেছিলেন তা প্রকাশ্যে স্বীকারও করছেন। পাশাপাশি, আবারও যাতে বিপদে না পড়তে হয় সেজন্য এখানে দ্রুত এখানে নদীবাঁধ দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন।
বালাসনের চরে অগুনতি ঘরবাড়ি গড়ে উঠেছে। কাওয়াখালির নিমতলা এলাকা যদি ধরা যায়, সেখানে নদীর চরে শয়ে-শয়ে ঘরবাড়ি রয়েছে। গাইসাল শ্মশান সংলগ্ন এলাকা থেকে মা তারা নদীঘাট সহ আশপাশের এলাকায় টিনের পাশাপাশি পাকা ঘর গড়ে উঠেছে। এখানে ঘরবাড়ি তৈরির নিয়ম নেই। তা সত্ত্বেও এখানে তা তৈরি হওয়ায় বিরোধীরা প্রতিবাদে সরব হয়েছেন। মাটিগাড়া-নকশালবাড়ির বিধায়ক বিজেপির আনন্দময় বর্মনের অভিযোগ, ‘তৃণমূল কংগ্রেস নেতারা বাইরে থেকে আসা মানুষের কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা নিয়ে তাঁদের এখানে বসিয়েছেন। সেই টাকার ভাগ তৃণমূলের শীর্ষ নেতাদের কাছেও গিয়েছে। বাঁধের অবস্থা এমনিতে খারাপ। বালাসনের বাঁধ মেরামত করার কথা বিধানসভায় তুলেছিলাম। কিন্তু সরকার কিছুই করেনি।’ বিধায়কের সংযোজন, ‘তৃণমূলের নেতারা সাধারণ মানুষকে নদীর চরে বসিয়ে কার্যত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। যাঁরা টাকা নিয়েছেন তাঁদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের তদন্ত করা উচিত।’
যে সময়ে নদীর একের পর এক পাকা ঘরবাড়ি গড়ে উঠছিল সেই সময় প্রশাসনের তরফে কেন কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে প্রশ্ন উঠেছে। তৃণমূল নেতা তথা স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান কৃষ্ণ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বললেন, ‘প্রধান হয়ে আসার পর থেকে এই এলাকায় নতুন করে কোনও ঘরবাড়ি তৈরি হয়নি। জায়গা কেনাবেচা নিয়েও কোনও খবর নেই। সংশ্লিষ্ট এলাকায় বাঁধের সংস্কার করা গেলে ভালো হয়। কিন্তু কেন্দ্র থেকে কোনও টাকা পাওয়া যাচ্ছে না।’
সোমবার এলাকায় গিয়ে দেখা গেল বালাসন নদী থেকে খুব বেশি হলে ২০ মিটার দূরে চরের মধ্যে পরপর বাড়িঘর গড়ে উঠেছে। কাওয়াখালির বাসিন্দা পঙ্কজ সরকার এদিন নিমতলা এলাকায় গিয়েছিলেন। পঙ্কজের কথায়, ‘শাসকদলের কিছু নেতা নদীর চর দখল করে বিক্রি করে দিয়েছেন। যাঁদের এখানে বসানো হয়েছে, তাঁরা সকলেই বহিরাগত। শিলিগুড়ির বাইরে থেকে এসে এখানে ঘরবাড়ি তৈরি করে থাকছেন। আগামীতে নদীতে জলস্ফীতি হলে আবারও একই ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।’
নদীর চরে বাড়ি বানিয়ে বীথিকা রায় বেশ কয়েক বছর ধরে এখানে বসবাস করছেন। কাজের খোঁজে স্বামীর সঙ্গে মাথাভাঙ্গা থেকে শিলিগুড়িতে এসেছিলেন। এলাকার এক ব্যক্তির হাতে টাকা দিয়ে চরের মধ্যে বাড়ি বানিয়েছিলেন। সেই থেকেই এখানে বসবাস। এভাবে বাড়ি তৈরি যে বেআইনি সেটি বীথিকার ভালোমতোই জানা আছে। তিনি বললেন, ‘জমির কোনও কাগজপত্র নেই। কোনওমতে মাথা গুঁজে রয়েছি। এখানে নদীর জল ঢুকে পড়ার পর থেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে খুবই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম।’ উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুরের বাসিন্দা প্রতিমা বর্মন, শম্পা বর্মন, ধূপগুড়ির বাসিন্দা রণজিৎ রায়, শর্মিলা দাসরাও এখানে এভাবে ঘরবাড়ি তৈরি করে বসবাস করছেন। প্রতিমা বললেন, ‘নদীর চরে বাড়ি তৈরির পর থেকে কোনওদিন সমস্যা হয়নি। এবারই প্রথম। সরকার কোনও ব্যবস্থা না নিলে খুবই সমস্যা হবে। অন্তত এখানে বাঁধ করে দেওয়া প্রয়োজন।’ রণজিতের বক্তব্য, ‘অন্যত্র গিয়ে যে থাকব সেই আর্থিক অবস্থা নেই। কোনও রকমে মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছে। সরকার চাইলে বাঁধ দিয়ে জল ঢোকা কিছুটা হলেও আটকাতে পারে।’
কিন্তু প্রশাসনের তরফে কোনও ব্যবস্থা কি আদৌ নেওয়া হবে? শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদের সভাধিপতি অরুণ ঘোষের আশ্বাস, ‘মহকুমাজুড়ে বিভিন্ন নদীতে বাঁধ চেয়ে সেচ দপ্তরের কাছে আবেদন করা হয়েছে। সেচ দপ্তর প্রয়োজন মনে করলে বালাসন নদীতেও বাঁধ দেওয়ার ব্যবস্থা করবে।’
