ভালোবাসার সপ্তাহ চলছে। এই সময়কালে উত্তরবঙ্গ সংবাদে ভালোবাসায় মাখা নানা কাহিনী পাঠকদের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে। আজ শিলিগুড়ির এমনই এক গল্প।
প্রিয়দর্শিনী বিশ্বাস, শিলিগুড়ি: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর কবিতায় আক্ষেপ করে লিখেছিলেন, ‘তেত্রিশ বছর কাটল, কেউ কথা রাখেনি।’ তবে শিলিগুড়ির (Siliguri) ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের নিরঞ্জননগরের বাসিন্দা চিন্ময় সরকার কিন্তু কথা রেখেছেন। বুক ফুলিয়ে সে কথা বলছেনও। দীর্ঘ ১৬ বছর পার করে এসেও সঙ্গিনী অঞ্জলির (Blind Couple Love Story) প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি। চিন্ময় এবং অঞ্জলি- দুজনেই দৃষ্টিহীন। তবে অন্ধের ভরসা কেবল হাতের শক্ত লাঠি নয়, বরং অন্য এক দৃষ্টিহীন মানুষের নিখাদ ও নির্ভেজাল ভালোবাসা হতে পারে তা এই দম্পতি প্রমাণ করেছেন। তাঁদের জীবনে প্রতিবন্ধকতা আছে। কিন্তু তা তাঁদের জীবনে কোনওদিনই বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং পারস্পরিক বন্ধনটা আরও শক্তপোক্ত করেছে।
চোখের দৃষ্টি না থাকলেও তাঁরা একে অপরের জন্য জামাকাপড় কেনেন, পরম মমতায় সঙ্গীর জন্য রান্না করেন এবং আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতোই স্বাভাবিক ছন্দে সংসার সামলান। যে মানুষটির সঙ্গে তাঁরা দীর্ঘ দেড় দশক ঘর করছেন, তাঁকে হয়তো কোনওদিন চোখে দেখেননি, এমনকি যে ঘরটিতে তাঁদের বসবাস সেটি দেখার ভাগ্যও তাঁদের হয়নি, তবু মনের মণিকোঠায় তাঁরা এক নিখুঁত ছবি এঁকেছেন যেখানে প্রতিটি স্মৃতি অত্যন্ত স্পষ্ট। ভালোবাসার সপ্তাহে বুধবার ‘প্রমিস ডে’ বা ‘অঙ্গীকার দিবস’। চিন্ময়–অঞ্জলির গল্প এ দিনটির এক সার্থক প্রতিচ্ছবি।
একসময় তাঁদের জীবন (Inspirational Story) ঘোর অন্ধকারে ঢেকে গিয়েছিল, আর ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণেই একে অপরের জীবনে আলোর দিশারি হয়ে তাঁদের প্রবেশ ঘটে। অনেকটা ফিল্মি কায়দায় এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে মন্দিরে গিয়ে তাঁরা বিয়ে করেন। ২০০১ সালে অঞ্জলির ভাইয়ের হাত ধরেই চিন্ময়ের যাতায়াত শুরু হয় অঞ্জলিদের বাড়িতে। সেখান থেকেই পরিচয় এবং মনের টান তৈরি হয়। চিন্ময় স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘তাঁর অবর্তমানে মেয়ের দেখাশোনা কে করবে তা নিয়ে অঞ্জলির মা প্রায়ই দুশ্চিন্তা করতেন।’ সেদিন সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে চিন্ময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, নিজের মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত তিনি অঞ্জলির খেয়াল রাখবেন। তবে তাঁদের এই মেলামেশা নিয়ে প্রতিবেশীরা নানা কটু কথা বলতে শুরু করলে চিন্ময় অঞ্জলির সম্মানের কথা ভেবে যাতায়াত বন্ধ করে দেন। কয়েক বছর তাঁদের মধ্যে কোনও যোগাযোগ ছিল না। হঠাৎ একদিন অঞ্জলির মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে চিন্ময় নিজেকে সামলে রাখতে পারেননি। গিয়ে দেখেন বিনা যত্নে অঞ্জলির সারা গায়ে ঘা হয়ে গিয়েছে। পকেটে সেদিন পাঁচটা টাকাও ছিল না। কিন্তু সেদিনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন অঞ্জলিকে আগলে রাখার। নিজের মোবাইল ফোনটি পাঁচ হাজার টাকায় বিক্রি করে বৈশাখ মাসের ১২ তারিখে তাঁরা শিব মন্দিরে বিয়ে করেন।
এ পর্যন্ত পড়ে যদি মনে হয় তারপর থেকেই সবই ভালো, তা কিন্তু মোটেও নয়। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি তাঁদের আশ্রয় দেয়নি। অন্ধত্বের কারণে তাঁদের অনেক কটু কথা শুনতে হয়। ঘরছাড়া হয়ে চারদিন অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নেওয়ার পর দুজনে আশিঘরে এক চিলতে ঘরভাড়া নেন। প্রতিবন্ধী ভাতা আর মানুষের দয়ায় কয়েক বছর কাটার পর ২০১২ সালে তাঁরা আবার নিরঞ্জননগরের পুরোনো বাড়িতে ফিরে আসেন। সংসার চালানোর তাগিদে বর্তমানে দুজনে মিলে ঘুরে ঘুরে লটারির টিকিট বিক্রি করেন। প্রতিদিন সকাল ৮টায় যখন তাঁরা বের হন, তখন চিন্ময়ের হাতে থাকে লাঠি আর তাঁর কাঁধে অঞ্জলির হাত। সেই হাতই চিন্ময়কে প্রতিনিয়ত সব জয়ের আশা জোগায়। বাড়িতে ফিরে চিন্ময় নিপুণ হাতে সবজি কাটেন ও রান্না করেন, আর অঞ্জলি কাপড় কাচা ও বাসন মাজার কাজ সামলান।
১৯৮১ সালে টাইফয়েডে চিন্ময় দৃষ্টি হারান। তার আগে তিনি রাঁধতে জানতেন বলেই আজও প্রিয়তমার জন্য খুন্তি ধরেন। পুজোর সময় জামাকাপড় কেনার সময় অঞ্জলি রঙের নাম শুনে জেনে নেন কোন পোশাকে চিন্ময়কে বেশি মানাবে। ষাটোর্ধ্ব চিন্ময় আর পঞ্চাশোর্ধ্ব অঞ্জলির কাছে অভাব এখন তুচ্ছ, কারণ একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা তাঁদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। প্রায় ষোলো বছর আগে দেওয়া সেই অঙ্গীকার আজও পরম যত্নে লালিত হয়ে চলেছে। আমৃত্যু ওই অঙ্গীকার বজায় রাখতে দুজনেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
