Rangdar robbar | শুধু উদযাপন নয়, প্রতিজ্ঞাও 

Rangdar robbar | শুধু উদযাপন নয়, প্রতিজ্ঞাও 

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


  • রুবাইয়া জুঁই 

স্বাধীনতা একান্ত নিজস্ব এক বোধ। স্বাধীনতার অর্থ প্রতিটি মানুষের কাছে আলাদা। সময়ের সঙ্গে, বয়সের ছায়ায় বদলে যায় তার ব্যঞ্জনা। জীবনের বিভিন্ন অধ্যায়ে তার মানে বদলায়, গড়ে ওঠে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা। শৈশবে, যখন বিকেলের রোদ গড়িয়ে পড়ত পায়ের পাতায়, একবার গোল্লাছুট খেলতে পারলেই মনে হত– এই তো আমার স্বাধীনতা! মুক্তির সেই সামান্য মুহূর্তটুকুই ছিল সমগ্র বিশ্বজয়ের আনন্দ। কিন্তু কিশোরী বয়সে এসে সেই ধারণায় ছেদ পড়ে। তখন প্রস্তুতি চলছে রবীন্দ্রনাথের দেনাপাওনা নাটকে অভিনয়ের। রবিবারের দুপুরে স্কুলে গিয়ে সংলাপ মুখস্থ করা, চরিত্রের ভঙ্গিমা আয়ত্তে আনা- এই ছিল তখনকার স্বপ্ন। এক অনাবিল উত্তেজনা বুকের ভেতর। নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার কথা। তবে যখন সেই প্রতীক্ষিত দিনটি এল, ঠিক সেদিনই আমার স্বাধীনতা আটকে গেল চার দেওয়ালের মাঝে। যেন দুই পায়ে পরানো হল অদৃশ্য এক শৃঙ্খল। পরদিন স্কুলে গিয়ে সহপাঠীদের কৌতুকমিশ্রিত দৃষ্টি, শিক্ষকের কটুবাক্য সব মিলিয়ে নিজেকে মনে হয়েছিল এই পৃথিবীর সবচেয়ে পরাধীন জীব। যেন এক অদৃশ্য কারাগারে বন্দি। যুগে যুগে বোধহয় এভাবেই দমিয়ে রাখা হয় নারীর স্বপ্নকে। তার কণ্ঠ রোধ করা হয় ভয় আর বিধির নামে; পায়ে শিকল-বেড়ি পরিয়ে বন্দি রাখা হয় পুরুষের গড়া সমাজের ছাঁচে।
আবার কখনও স্বাধীনতা ধরা দেয় একটু অন্যভাবে। প্রত্যেক শনিবার বাবার সঙ্গে হাঁটে যেতাম, সেখানেই একটা দোকানে নানা সাইজের টিয়া পাখি বিক্রি হত। কিশোরীবেলার সেই কোমল হৃদয়ে, মনে হত যেদিন আমি সত্যিই স্বাধীন হব, স্বাবলম্বী হব, যেদিন কারও অনুমতির প্রয়োজন হবে না সেদিন সব পাখিদের কিনে নেব। আর এক এক করে খুলে দেব খাঁচার দরজা। তাদের ডানায় লিখে দেব মুক্ত আকাশের ঠিকানা। যদিও তখন স্বাধীনতা চেয়েছিলাম পাখিদের জন্য, অথচ মর্মে ছিল নিজের জন্যও এক নিঃশ্বাসে মুক্ত হওয়ার প্রার্থনা।
জীবনের প্রতিটি মোড়ে, প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রান্তে যেন লুকিয়ে আছে এক অদৃশ্য শৃঙ্খল। যার শিকল বাঁধা আছে সমাজ নামক এক গোলকধাঁধায়। তার কেন্দ্রে অবস্থান করছে পুরুষতন্ত্র। এই শৃঙ্খল আমাদের টেনে ধরে, নত করে রাখে পরাধীনতার দিকে।
ছোটবেলা থেকে মাকে দেখেছি টাকা জমিয়ে রাখতেন সন্তানের নতুন জামা, খেলনার জন্য। নিজের প্রয়োজনকে অগ্রাহ্য করে, নিঃশব্দে তিনি করতেন ভালোবাসার সংরক্ষণ। তারও তো সীমাবদ্ধতা ছিল। আজ বুঝি। অন্যদিকে পিসিকে দেখেছি দিনের পর দিন দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়তে। তবুও স্বপ্ন ছিল। ঘুলঘুলির ফাঁক দিয়ে আসা একটুকরো রোদের মতো স্বাধীনতার আনন্দ ছিল। ক্যালেন্ডার বদলেছে। বছরের পর বছর গড়িয়ে গিয়েছে। আমরা বড় হয়েছি। দেশের স্বাধীনতা প্রাপ্তির প্রায় আট দশক হতে চলল। তবু আজকের দিনে দাঁড়িয়েও মনে হয় স্বাধীনতা যেন শুধুই একটি দিনের উদযাপন! দেশপ্রেমের তিনটে ফেসবুক স্ট্যাটাস!
অথচ স্বাধীনতা তো কেবল একটি দিবস নয়, একটি পতাকা নয়। স্বাধীনতা মানে সাম্য, স্বাধীনতা হল মানবাধিকারের মসৃণ পথ। নারীর কণ্ঠ থেকে চিরস্থায়ী ভয় ঝেড়ে ফেলা আর দলিত, শ্রমজীবী, প্রান্তিক মানুষদের সমান মর্যাদায় বাঁচার জায়গা করে দেওয়া।
স্বাধীনতা মানে তো শুধু শাসকের হাত বদল নয়; স্বাধীনতা মানে মুক্তি, সমতা, মর্যাদা। অথচ আমাদের চারপাশে আজও সেইসব শৃঙ্খলের দাগ স্পষ্ট। দারিদ্র্য, দুর্নীতি, লিঙ্গবৈষম্য, শোষণ, অশিক্ষা, অনাহার এবং সবচেয়ে ভয়ংকর নিরাপত্তাহীনতা। বিশেষ করে মেয়েদের জন্য এই দেশ আজও কতটা অনিরাপদ, সেটা বোঝার জন্য খুব দূরে তাকানোর দরকার পড়ে না। প্রতিদিনের খবরই যথেষ্ট।
স্বাধীনতা সাম্যের কথা বললেও আজও, দেশেরই মাটিতে উচ্চবর্ণের বিবাহ অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ায় দলিত সম্প্রদায়ের মানুষকে সহ্য করতে হয় লাঞ্ছনা, অর্ধমৃত করে ফেলা হয় তাদের শরীরকে, আত্মাকে। এটাই কি স্বাধীনতা? বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকরা আজ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে নিজের মাতৃভাষায় কথা বলার ‘অপরাধে’ অপমানিত হন। কীভাবে ভাষা, পরিচয় আর শ্রেণিই হয়ে ওঠে বিচারের মাপকাঠি? একজন কর্মজীবী নারী যখন রাতে অফিস শেষে ঘরে ফিরছেন, তাঁকে কেন প্রতি মুহূর্তে গুগল ম্যাপে নিজের অবস্থান পাঠাতে হয় পরিবারের কাছে? কেন তাঁর পোশাক, চলাফেরা অন্যের অনুমোদনের ছায়াতলে নির্ভরশীল?
স্বাধীনতার সকাল, এখনও অসম্পূর্ণ এক প্রতিশ্রুতি। একটা দিন, ক্যালেন্ডারের পাতায় লাল করে আঁকা ১৫ অগাস্ট। অনেকেই ভাবেন, এ দিনটাই বুঝি স্বাধীনতা। পতাকা উত্তোলন, মিষ্টি বিতরণ, স্কুলের মঞ্চে বক্তৃতা আর টিভিতে দেশাত্মবোধক গান- এই তো স্বাধীনতা দিবসের গল্প। কিন্তু আদৌ কি তাই? আসলে, সত্যিকারের স্বাধীনতা কি কেবল একদিনের উৎসব হতে পারে? যারা বুকের রক্ত দিয়ে এই দেশের শেকড় রক্ষা করেছেন, তাদের উদ্দেশে পুষ্পার্ঘ্য দিলেই কি তাঁদের স্বপ্নের ভারত গড়ে ওঠে? যারা স্বপ্ন দেখেছিলেন এক শোষণমুক্ত, সমানাধিকারের সমাজের, আমরা কি তাদের সেই স্বপ্নপূরণের দিকে এগোচ্ছি?
ভুলে গেলে চলবে না স্বাধীনতা মানে দায়িত্বও বটে। স্বাধীনতা যদি শালীনতার সীমা ছাড়িয়ে যায় বা অন্যের অস্বস্তির কারণ হয়ে ওঠে তাহলে তাকেও প্রশ্ন করা যায়। সন্দেহ করা যায়। কিন্তু এই যুক্তি তুলে কারও স্বাধীনতাকেই চিরকাল দমন করার চেষ্টাও তো কাম্য নয়। স্বাধীনতা শুধু রাষ্ট্রের দেওয়া অধিকার নয়, এটা এক সামাজিক চুক্তি, নৈতিক দায়িত্ব। যেখানে প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি শ্রেণি, প্রতিটি লিঙ্গ সমানভাবে মর্যাদা পাবে। এ ভারতের অর্ধেক আকাশ নারীর হবে।
আর যখন এই শর্ত ভেঙে যায়, তখন স্বাধীনতা কেবল স্মারক হয়ে পড়ে আদর্শ নয়। কেবল আনুষ্ঠানিকতায় আটকে যায়। যেখানে প্রতিবাদ করলে কণ্ঠ রোধ, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুললে বক্রচক্ষু।
১৫ অগাস্ট মানে তাই কেবল অতীতের প্রতি শ্রদ্ধাই নয়, ভবিষ্যতের প্রতিজ্ঞাও। নতুন করে লড়ার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর, নিজের চারপাশটাকে বদলে ফেলার। আগামীর প্রতিটি ধাপে আমরা যদি সত্যিকারের মুক্তির আলো পৌঁছে দিতে পারি সেই দিনই আসবে আমাদের প্রকৃত স্বাধীনতা। যতক্ষণ না প্রতিটি মুখে সম্মানের হাসি ফুটছে, যতক্ষণ না প্রতিটি নারী এই দেশে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারছে, ধর্ম আর জাতির বৈষম্য ঘুচছে, ততক্ষণ ১৫ অগাস্ট শুধুই একটা উদযাপনের সকাল। তাই স্বাধীনতার সকাল হোক প্রতিজ্ঞার। আমরা শুধু ইতিহাসের গর্ব নিয়ে থাকব না, ভবিষ্যতের দায়ও কাঁধে তুলে নেব।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *