দুটি পাতা একটি কুঁড়ির সবুজ নয়, রুক্ষ্ম-ধূসর এখন চোপড়ার বিস্তীর্ণ প্রান্তর। যেখানে একসময় একের পর এক চা বাগান তৈরি হয়েছিল প্রচুর কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা জাগিয়ে। সিন্ডিকেটরাজের সুবাদে সেখানকার বাতাসে এখন শুধুই হাহাকার ও আক্ষেপ। প্রথম কিস্তি
অরুণ ঝা, চোপড়া: হরিনাথগছ থেকে আমবাড়ি পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী সড়ক যোজনার রাস্তার দু’পাশে চা বাগানের সবুজ গালিচা চোখ জুড়িয়ে দেয়। শীত যাই যাই সময়েও হিমেল হাওয়ার স্পর্শ অদ্ভুত সুখের অনুভূতি মনপ্রাণ ভরিয়ে দেয়। রাস্তার ধারে শিমুল গাছ ভর্তি লাল ফুল দেখতে দেখতে কখনও মনে হবে না আমবাড়ি পৌঁছালে এক নির্মম ছবির মুখোমুখি হতে হবে।
জীবনযন্ত্রণার এক কঠিন বাস্তব যেন পিয়ারিলাল টি এস্টেটে (Pyarelal Tea Property)। বাগানটি বন্ধ প্রায় চার বছর ধরে। এলাকার প্রচুর মানুষ কর্মহীন। দুই মুঠো অন্নের হাহাকারের পাশাপাশি এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে বোমা-বন্দুক, বারুদের কাহিনী। জোর করে বাগানের দখল নেওয়া হয়েছিল। ‘শাসকদলের দাদাদের হাতে এখন বাগানের নিয়ন্ত্রণ’- সামনে মেঠো পথের দিকে চেয়ে বললেন ডোলোরাম সিংহ।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে জানালেন, দখলদাররা ভালোভাবে বাগান চালাতে পারেননি। ডোলোরাম স্থায়ী কর্মী ছিলেন পিয়ারিলাল টি এস্টেটের। এখন? তাঁর গলায় আক্ষেপ, ‘মাসে ১৫ দিনও কাজ পাই না। পেলেও মজুরি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। ছয়জনের সংসার এই উপার্জনে চলে বলুন?’ ওই বাগানে প্রায় ২০ বছর কাজ করেছেন ডোলোরাম । র্যাশন, বোনাস, প্রভিডেন্ট ফান্ড- সবই পেতেন।
তাতে মন্দ চলত না। এই কাহিনী ওই তল্লাটজুড়ে আরও অনেকের। যাঁরা আজ কেউ পরিযায়ী শ্রমিক। কেউ নাইট শিফটে দার্জিলিং জেলার কোনও চায়ের ফ্যাক্টরিতে মাসে হয়তো ১০ দিন দৈনিক মজুরিতে কাজ করেন। এরকমই একজন সন্তোষ সিংহের সঙ্গে দেখা হল আমবাড়ি মোড়ের এক চায়ের দোকানে। তিনি লেবার ঠিকাদারের মাধ্যমে বিধাননগরের একটি ফ্যাক্টরিতে নাইট শিফটে কাজ পেয়েছেন। ৩৩০ টাকা মজুরি পান। কিন্তু মাসে রোজ কাজের নিশ্চয়তা নেই।
সন্তোষের জিজ্ঞাস্য, ‘পাঁচজনের সংসার কি এতে চলে?’ পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন বিমল সিংহ। সন্তোষ তাঁকে ডেকে নেন। বিমলও বাগানের কাজ হারিয়েছেন। কথায় কথায় শুকনো মুখে কঠিন সত্যিটা বললেন বিমল, ‘জানেন তো, বড় রোগে ধরলে শ্মশান আমাদের একমাত্র গতি।’
শুধু কাজ নয়, অনেকে জমিও হারিয়েছিলেন। ষাটোর্ধ্ব তুলেশ্বরী সিংহ বাগানের কাজ থেকে অবসর নিয়েছিলেন। কষ্ট করে জমানো টাকায় কিছুটা জমি কিনেছিলেন গ্রামে। রাজনৈতিক দাদাদের সিন্ডিকেট বাগানটির দখল নেওয়ার পর তাঁর শেষ সম্বল ওই দুই বিঘা জমি বিক্রি করে বাগানের শেয়ার নেওয়ার লোভ দেখায়। লাভের আশায় সিন্ডিকেটের কথা শুনে এখন আফসোস যায় না তুলেশ্বরীর।
বাড়ির একচিলতে বারান্দায় বসে বললেন, ‘দুই বছর আগে কষ্টের জমি বিক্রি করে বাগানের শেয়ারের জন্য এক দাদাকে টাকা দিয়েছিলাম। জমিও গেল, বাগানের লাভও পেলাম না। আদৌ পাব কি না জানি না।’ সিন্ডিকেটের মাথায় তৃণমূল নেতারা আর তাঁদের ঘনিষ্ঠরা। আগের মালিককে তাড়িয়ে তাঁরা দখল নিয়েছিলেন বাগানের। কিন্তু বাগান ভালোমতো চালাতে পারেননি। তাতে তাঁদের কী হয়েছে, তার চেয়ে বড় কথা সর্বস্বান্ত হয়েছেন সুধীর সিংহ, শেফালি সিংহ, রণ সিংহ, উমানি সিংহরা। হাপতিগছ গ্রাম পঞ্চায়েতের এক সদস্য সিন্ডিকেটরাজের দৌরাত্ম্য স্বীকার করে বলেন, ‘আমাদেরও প্রচুর জমি দেওয়া ছিল সিন্ডিকেটকে। এক ছটাকও ফিরে পাইনি।’ সিন্ডিকেটের দখলে থাকা বাগানে রোজ কাজের নিশ্চয়তা নেই। কাজ পেলে দিন প্রতি মেলে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। তবে পাতা বিক্রির টাকা ঢোকে সিন্ডিকেটের দাদাদের পকেটে।
চোপড়ার (Chopra) তৃণমূল (TMC) বিধায়ক হামিদুল রহমান অবশ্য দাবি করলেন, ‘পিয়ারিলাল বাগানের দখল নিয়ে আদিবাসী শ্রমিকদের উসকে দিয়ে অনেকে রাজনৈতিক রং লাগানোর চেষ্টা করেছিল। দলকে একশ্রেণির মানুষ বদনাম করতে এসব করছে।’ কিন্তু স্থানীয়দের শূন্য দৃষ্টি অন্য কথা বলে। সুধীর, শেফালিরা একযোগে বলেন, ‘এভাবে কি বেঁচে থাকা যায়? প্রভাবশালীরা সবই পেলেন। আমাদের প্রাপ্য কি কিছুই ছিল না?’
ভৈষপিটা এমএসকে-কে ডান হাতে রেখে মেঠো পথের পাশে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহে ব্যস্ত ছিলেন অঞ্জলি কুজুর ও আবিতা ওরাওঁ। দুজনই বাগানের স্থায়ী শ্রমিক ছিলেন। কথায় কথায় অঞ্জলি বলেন, ‘২৩ বছরের ছেলে শিলিগুড়িতে গাড়ির চালকের কাজ করে। আমি আর কোথায় যাব? বাগানে কখনও কাজ পেলে ১৫০ টাকা মজুরি পাই।’ আবিতা বলেন, ‘এখানকার পরিবারগুলো কাজ হারিয়ে বাইরে চলে গিয়েছে।’
ফেরার সময় সূর্য অস্তাচলে। দমকা হাওয়ায় মাটি ও বালির ছোট ছোট ঘূর্ণি তৈরি হচ্ছিল। বাগানের পিপুল গাছের পাতায় শিরশিরানি আওয়াজ। ধুলোমাখা পথ, পাতাঝরা গাছ যেন জানান দিচ্ছিল, অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই কতটা কঠিন।
