Potato farming loss in North Bengal | উদ্বৃত্ত ফলনেই বিপত্তি! উত্তরবঙ্গে আলু চাষি ও ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত, কোটি কোটি টাকা লোকসানের আশঙ্কা

Potato farming loss in North Bengal | উদ্বৃত্ত ফলনেই বিপত্তি! উত্তরবঙ্গে আলু চাষি ও ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত, কোটি কোটি টাকা লোকসানের আশঙ্কা

ব্লগ/BLOG
Spread the love


সপ্তর্ষি সরকার, ধূপগুড়ি: আলুর উদ্বৃত্ত ফলনে বড় ধাক্কা খাওয়ার আশঙ্কা উত্তরবঙ্গের কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে (Potato farming loss in North Bengal)। শুধু চাষিরা নন, আড়তদার থেকে ফড়ে, সার বিক্রেতা থেকে হিমঘর মালিক, সকলেই লগ্নির কোটি কোটি টাকা ক্ষতির আশঙ্কা করছেন। রপ্তানিতে ভাটার টানে ভালো ফলন সত্ত্বেও লোকসান গুনছেন প্রাক মরশুমি আলুচাষিরা। চাষের জন্যে নেওয়া নগদ বা বন্ধকি ঋণের টাকা, সার-বীজের দোকানে ধার ফেরত দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে কৃষকদের পক্ষে। প্রাক মরশুমি আলুর এই হাল দেখে বড় বিপদের আশঙ্কায় থরহরিকম্প আলুচাষি থেকে ব্যবসায়ীরা।

আলু বিক্রি করে ঋণ মিটিয়ে লাভের টাকা ঘরে তোলার ভাবনা থাকে কৃষকদের। বাজারদর যদি তলানিতে ঠেকে তাহলে ঋণ ফেরাতে চরম বিপদে পড়েন চাষিরা। আবার বীজ, সারের টাকা তুলতেও নাজেহাল অবস্থা হয় ব্যবসায়ীদের। সেক্ষেত্রে বাজারদরে কৃষকদের আলু কিনে হিমঘরে রাখলেও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হয়।

মরশুমি আলু ওঠার মুখে দাঁড়িয়ে আপাতত চাপানউতোরে দিন কাটাচ্ছেন আলু চাষ ও কারবারের সঙ্গে যুক্ত সকলেই। ব্যবসায়ীদের তরফে পাওয়া তথ্য অনুসারে চলতি মরশুমের জন্যে পোখরাজ, জ্যোতি, হল্যান্ড প্রজাতি মিলিয়ে পঞ্জাব থেকে ধূপগুড়িতে আলুবীজ এসেছে ২৫০০ লরির বেশি। অসম সহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় সেই বীজ ছড়িয়ে পড়ার পরে স্থানীয় আড়তদারদের হাত ধরে স্থানীয় বাজারেও বিক্রি হয়েছে সেই বীজ। চিরাচরিত নিয়মে স্থায়ী বড় আড়তগুলো কৃষকদের ধারে বীজ দিয়েছে এবারেও। সাধারণত আলু তোলার মরশুমে বাইরে বিক্রি করে নগদে বা বীজ বিক্রেতা আড়তদারকেই আলু দিয়ে ঋণ শোধ করেন চাষিরা। এই কারবারিরাই জানাচ্ছেন মাঝারি থেকে বড় আড়তগুলো দশ কোটি বা তারও বেশি অঙ্কের বীজ বাকিতে দেন কৃষকদের। দাম তলানিতে ঠেকলে আলুর মাধ্যমে ধার শোধ হওয়া মুশকিল। সেক্ষেত্রে বীজের বকেয়া আদায়ে চরম সমস্যার মুখে পড়বেন কারবারিরা।

উত্তরবঙ্গ আলু ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাবলু চৌধুরী বলেন, ‘কৃষকের সঙ্গে স্থায়ী আড়তদারদের সম্পর্ক জল ও মাছের মতো। এঁরা কেউই কাউকে ছাড়া বাঁচবেন না। আলুর যা অবস্থা তাতে কৃষক দাম না পেলে মোটা অঙ্কের বীজের বাকি টাকার জন্যে ব্যবসায়ীদের অবস্থা হবে শোচনীয়। সরকারিভাবে আলু রপ্তানির সুযোগ না তৈরি হলে এবার চাষি থেকে ব্যবসায়ী সকলেই অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়বেন।’

এই পরিস্থতিতে সবথেকে খারাপ অবস্থা তাঁদের, যাঁরা অন্যের জমি চড়া দরে ভাড়া নিয়ে আলু চাষ করেছেন। চাষের খরচের পাশাপাশি তাঁদের ঘাড়ে চেপেছে জমির ভাড়া বাবদ মোটা বিনিয়োগ। কিষান ক্রেডিট কার্ডের ঋণ বা কৃষকবন্ধু ভাতার বাইরেও আলু চাষের জন্যে খোলাবাজার থেকে, এমনকি স্বর্ণ ঋণ সংস্থাগুলো থেকেও মোটা টাকা ঋণ নেন কৃষকরা। আলুর বাজার মন্দা হলে সেই ঋণ ফেরত দেওয়া নিয়েও চরম অনিশ্চয়তা দেখা দেবে। বীজ বিক্রেতাদের মতো আলুর বাজারদরের দিকে তাকিয়ে সার ও কীটনাশক বিক্রেতারাও।

আলুর কারবারের খবর অনুযায়ী, শুধুমাত্র ধূপগুড়ি (Dhupguri) মহকুমা এলাকাতেই আলুর মরশুমে সার ও কীটনাশক মিলে প্রায় একশো কোটি টাকা বাকি দেন ব্যবসায়ীরা। আলুর বাজার মন্দা হলে সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে ধূপগুড়ি সার ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক বাপ্পা পাল বলেন, ‘যেসব কৃষক সারাবছর বীজ, সার, কীটনাশক কেনেন তাঁদের সঙ্গে সম্পর্কের জেরেই আলুর মরশুমে ধার দেন ব্যবসায়ীরা। কৃষক আলুর দাম না পেলে আমরাই বা সেই টাকা চাইব কীভাবে? পোখরাজের মন্দা বাজার দেখে সার ব্যবসায়ীদের বুক কাঁপছে। মরশুমি আলুর বাজার যদি ভালো না হয় তাহলে মাথায় হাত পড়বে আমাদের।’

অতীতের তথ্য বলছে, শুরুতে আলুর বাজারে (Potato Market) মন্দা থাকলে হিড়িক পড়ে হিমঘরে আলু রাখার। অতি বর্ষা বা অন্য কোথাও আলুর টান তৈরি হলে বাজার ওঠার আশায় অপেক্ষার পথেই হাঁটেন চাষি ও কারবারিরা। হিমঘরের বন্ডের যত চাহিদা বাড়ে ততই বাড়ে কালোবাজারি, রাজনৈতিক লড়াই এবং গণ্ডগোল, যা গড়ায় পথ অবরোধ, ঘেরাও, মারামারি, আগুন ধরিয়ে দেওয়া পর্যন্ত। সরকারি নির্দেশিকায় ভাগবাঁটোয়ারা সিস্টেমে যে ৩০ শতাংশ বন্ড কৃষকদের জন্যে সংরক্ষিত থাকে তা থেকে একেকজনের নামে জারি হয় সর্বাধিক ৭০ প্যাকেট আলু রাখার বন্ড। বাস্তবে এক বিঘাতেই ৭০ প্যাকেটের বেশি আলুর ফলন হয়। ফলে একদম ছোট মাপের আলুচাষিরও প্রয়োজন হয় বেশি বন্ডের। সেই বন্ড পেতে দিতে হয় চড়া দর বা পিছু ধরতে হয় কোনও ক্ষমতাবান রাজনৈতিক নেতার। বন্ডের কালোবাজারিতেই লাখ লাখ টাকা ফাটকা কামাই করেন অনেকে।

সামান্য অগ্রিমের ভিত্তিতে জারি করা বন্ডে আলু হিমঘরে ঢোকার পর মাসে ১৫-২০ লক্ষ টাকার বিদ্যুৎ বিল সহ অন্যান্য খরচ মিটিয়ে আলু বের হওয়ার অপেক্ষায় থাকেন হিমঘর মালিক। বাজার ভালো না হলে সব আলু বের হয় না। গত মরশুমেও দাম তলানিতে ঠেকায় বেশিরভাগ হিমঘর থেকে সব আলু বের হয়নি, যা লোকসান গুনিয়েছে হিমঘরগুলিকেও। এবারেও আলুর বাজার মন্দার ধাক্কা প্রসঙ্গে এক হিমঘর মালিক বলেন, কৃষক-প্রশাসন-রাজনৈতিক নেতা-লগ্নিকারী ব্যাংকের মধ্যে পড়ে হিমঘর মালিকদের অবস্থা বলির পাঁঠার মতো। যে কেউ যখন-তখন ক্ষোভ মেটায় হিমঘরের ওপরেই। মোটা ঋণ নিয়ে, বিদ্যুৎ বিল সহ অন্যান্য খরচ সামলে হিমঘর চালাতে আমাদের অবস্থাও ভালো নয়। বন্ডের বাড়তি চাহিদা হলে পরিস্থতি কী দাঁড়াবে ভাবলেই অসুস্থ মনে হয় নিজেকে।

পোখরাজে লোকসান এই মুহূর্তে বাস্তব। মরশুমি সাদা জ্যোতি এবং লাল হল্যান্ডের বাড়তি ফলনের আভাসে আপাতত সম্ভাব্য লোকসান ধরেই বিকল্প খুঁজতে ব্যস্ত আলুচাষি থেকে সার, বীজ, হিমঘর ব্যবসায়ী এমনকি লগ্নকারীরাও।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *