শুভঙ্কর চক্রবর্তী, ফাঁসিদেওয়া: ‘দ্যাখ তো বাবা, কী ওষুধ লিখেছে।’ ওষুধের দোকানে বিক্রেতার হাতে প্রেসক্রিপশন দিয়ে কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করলেন বিলকিস বেওয়া। পরনে রংচটা শাড়ি, চটির ফিতের একটা অংশ ছিঁড়ে কোনওরকমে আটকে আছে। বয়স এবং অসুস্থতার ভারে খানিকটা বেঁকে গিয়েছেন। ভালো করে প্রেসক্রিপশন দেখে বিক্রেতা তরুণ বললেন, ‘ইসিজি করতে বলেছে। পাঁচ রকমের রক্ত পরীক্ষাও করতে হবে। সব এখানে হবে না। শিলিগুড়ি (Siliguri) যেতে হবে।’ ভালো করে শুনতে না পেয়ে ধুলোমাখা পায়ে আরেকটু এগিয়ে যান বৃদ্ধা। তরুণ এবার একটু জোরে ফের তাঁকে কথাগুলো বলেন। শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন বিলকিস। গজগজ করতে করতে বলেন, ‘এই হাসপাতালে তো কিছুই হয় না। কত টাকা যে লাগবে কে জানে।’ বিক্রেতা তরুণ পরামর্শ দেন, ‘ভোট আছে। নেতার কাছে যান। ব্যবস্থা করে দেবে এখন।’ শুনে তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন বৃদ্ধা, ‘ভোট তো দিয়েই যাচ্ছি। এখনও খাবার জলের ব্যবস্থা করতে পারল না, আর চিকিৎসা…।’ ফাঁসিদেওয়া (Phansidewa) বিধানসভার এলাকায় এলাকায় ঘুরে দিনভর ক্ষোভের এমন নানা কথা শোনা গেল। ভোটের মুখে যা রাজনীতির হালচাল বুঝিয়ে দেয়।
মহাভারতের সেই অমোঘ কুরুক্ষেত্রের মতো ফাঁসিদেওয়া আপাতত রাজনীতির এক জটিল ব্যূহ। তরাইয়ের চা বাগানের নিস্তব্ধ সবুজ আজ কথা বলছে না, গুমরে মরছে এক অব্যক্ত যন্ত্রণায়। মেচির চরে চরে যে রাজনীতির পলি জমেছে, তা কেবল ক্ষমতার সমীকরণ নয়, বিশ্বাসঘাতকতা আর দহনের নতুন অধ্যায় লিখছে। যে মাটি একদা কাস্তে-হাতুড়ির লাল রঙে রঞ্জিত ছিল, সেখানে আজ গেরুয়া পাতাকা আর ঘাসফুলের লড়াই এক অদ্ভুত মরীচিকা তৈরি করেছে। ফাঁসিদেওয়ার বাতাস ভারী হয়ে আছে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার ক্ষোভে, আর শাসকদলের অন্দরে বয়ে চলা চোরাস্রোতের বিষাক্ত নিঃশ্বাসে।
তপশিলি উপজাতিদের জন্য সংরক্ষিত এই জনপদে গত নির্বাচনে পদ্ম ফুটেছিল একরাশ প্রত্যাশা নিয়ে। কিন্তু বিধায়ক দুর্গা মুর্মু সাধারণ মানুষের কাছে এক বিস্মৃত অধ্যায়। জননেতা হওয়ার পরিবর্তে তিনি হয়ে উঠেছেন এক অদৃশ্য ছায়া। পাঁচ বছরের খতিয়ানে উন্নয়নের ঝুলি শূন্য, তৃষ্ণার্ত মানুষের জন্য এক গ্লাস পানীয় জলের প্রতিশ্রুতিও পূরণ করতে পারেননি তিনি। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হল, এই চরম ব্যর্থতা সত্ত্বেও বিজেপির পালে হাওয়া দিচ্ছে এক অদ্ভুত নেতিবাচক সমীকরণ। বামেদের ক্ষয়িষ্ণু কঙ্কাল আজ আর মাথা তুলে দাঁড়ানোর ক্ষমতা রাখে না, তাই তৃণমূলকে হটানোর মরিয়া তাগিদে সেই পুরোনো বাম কর্মীরাই আজ গোপনে রামের মন্দিরে নৈবেদ্য সাজাচ্ছেন। অাদর্শ নয়, এই ভোটবদল আসলে প্রতিহিংসার কথা বলে।
ফাঁসিদেওয়ার চা শ্রমিকদের বস্তিতে আরএসএস-এর নিঃশব্দ পদচারণা আর রাজবংশী হৃদয়ে গ্রেটার কোচবিহার আন্দোলনের নেতা নগেন রায়ের ‘গুরু’ সুলভ প্রভাব বিজেপিকে (BJP) এক দুর্ভেদ্য বর্ম পরিয়ে দিয়েছে। নেপালি ভোটারদের মনও পাহাড়ের বাঁক পেরিয়ে পদ্মবনেই থমকে আছে। কিন্তু এই গেরুয়া সাম্রাজ্যের বিপরীতে তৃণমূলের একমাত্র অস্ত্র হল সংখ্যালঘু ভোটব্যাংক এবং একজন ‘গ্ল্যামারাস’ আদিবাসী-কন্যা— রোমা রেশমি এক্কা। রোমা কেবল একজন রাজনীতিক নন, তিনি আদিবাসী সেলুলয়েডের রুপোলি পর্দার নায়িকা, এক আধুনিক যুব আইকন। তাঁর কথাবার্তা, সাধারণ চালচলন, সহজেই সকলের সঙ্গে মিশে যাওয়ার দক্ষতায় জনসংযোগের জাদু আছে। তৃণমূলের (TMC) পঙ্কিল রাজনীতিতে রোমা যেন এক সতেজ পদ্ম। কিন্তু রাজনীতির অন্দরে তো কেবল বহিরঙ্গ থাকে না, থাকে কুটিল ষড়যন্ত্রের পিচ্ছিল পথ।
ফাঁসিদেওয়ার মাটিতে তৃণমূলের আসল শত্রু বিজেপি নয়, বরং তাদের নিজেদের ছায়ার মতো লেগে থাকা গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। কাজল ঘোষের মতো প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে রোমার সম্পর্ক সাপে-নেউলে। অর্থ আর বাহুবলের অধিপতি কাজলের পছন্দের নেত্রী ফাঁসিদেওয়া পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি রিনা এক্কা। রিনাও প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে রয়েছেন। প্রভাবশালী কাজলের পূর্ণ সমর্থন না পেলে এই কেন্দ্রে তৃণমূলের আশা হতাশায় পরিণত হতে সময় লাগবে না। রোমার ব্যক্তিগত ক্যারিশমা সেই দেওয়াল ভাঙতে পারবে কি না, সেটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন।
আইনুল হক আর আখতার আলির প্রকাশ্য কলহ যেন এই নাটকের অন্য এক ট্র্যাজিক অঙ্ক। ধর্মীয় রাজনীতির বাজারে আখতারের নানা পদক্ষেপ পরোক্ষে বিজেপির পথ প্রশস্ত করছে। তৃণমূল কি তবে নিজের ঘরের আগুনেই ভস্মীভূত হতে চলেছে? এই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন নীচুতলার তৃণমূল নেতা-কর্মীরা।
এদিকে, বিধানসভাজুড়ে মাফিয়াদের রাজত্ব আজ বিভীষিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জমি-বালি আর মাদকের সিন্ডিকেট শাসকের ছত্রছায়ায় তরাইয়ের মাটি কলুষিত করছে। ফলে সাধারণ মানুষ ক্ষোভে ফুঁসছেন। বিধায়কের অকর্মণ্যতা এই ক্ষোভের লাভার নীচে ঢাকা পড়ে গিয়েছে। মানুষের প্রধান ‘শত্রু’ হয়ে দাঁড়িয়েছে তোলাবাজি আর মাফিয়া সিন্ডিকেট। বিজেপি কোনও কাজ না করেও, স্রেফ এই গণঘৃণার মুনাফা কুড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। শাসকের কৃতকর্ম, বিনা পরিশ্রমে বিজেপিকে ফসল তোলার সুযোগ করে দিচ্ছে।
প্রাক-নির্বাচনি গোধূলিতে দাঁড়িয়ে ফাঁসিদেওয়ার সাধারণ ভোটারদের মন পড়লে বোঝা যায়, লড়াইটা এবার আর ইস্তাহারের নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার। মানুষ যেন মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। এরপরেও বলা যায়, যদি রোমা রেশমি তাঁর দলের বিভীষণদের সামলাতে পারেন, তবেই হয়তো ঘাসফুলে নতুন করে জল পড়বে। নয়তো, তরাইয়ের চা বাগানের ছায়াঘেরা পথে আবারও দেখা যাবে সেই পরিচিত গেরুয়া মিছিলের পদধ্বনি, যেখানে জয়ের চেয়েও বড় হয়ে উঠবে শাসকের পরাজয়ের উল্লাস।
