পঙ্কজ মহন্ত, বালুরঘাট: তেলের নজেল হাতে গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে মহিলারা। কখনও দুই চাকার গাড়িতে তেল ভরাচ্ছেন, তো কখনও আবার চার চাকার চালকের থেকে টাকা নিচ্ছেন। ক্যাশ থেকে অনলাইন পেমেন্ট, ইউপিআই ট্রানজ্যাকশন থেকে কার্ড সোয়াইপ- সবটাই দক্ষ হাতে সামলাচ্ছেন তাঁরা। বালুরঘাটের বিশ্বাসপাড়ার একটি পেট্রোল পাম্পে (Petrol Pump Ladies Staff) এই দৃশ্য এখন নিত্যদিনের। বালুরঘাট ব্লকের মাঝিগ্রামের রিনা বর্মন কয়েকবছর ধরে এই পেট্রোল পাম্পে কাজ করছেন। গ্রাম থেকেই প্রতিদিন যাতায়াত করেন তিনি। তাঁর মতোই বিভিন্ন শিফটে কাজ করেন একাধিক মহিলা।
রিনা জানান, গ্রামে তেমন কাজকর্ম ছিল না। কিন্তু তিনি স্বাবলম্বী হতে চেয়েছিলেন। সে সময় পরিচিত একজনের কাছ থেকে জানতে পারেন বালুরঘাটের একটি পেট্রোল পাম্পে মহিলা কর্মী নিয়োগ করা হবে। তাঁর কথায়, ‘মেয়েদের তো পাম্পে কাজ করতে দেখিনি। তখন ভাবলাম, আমিই কেন না প্রথম সেই মেয়ে হই বালুরঘাটে যে পেট্রোল পাম্পে কাজ করবে।’ তারপর পাম্পে যোগাযোগ করে কাজ শুরু করেন তিনি। রিনা জানান, পাম্পের মালিকই তাঁকে ধীরে ধীরে সব কাজ শিখিয়ে দেন। ‘প্রথমে ভয় লাগত ঠিকভাবে কাজ করতে পারব কি না। পরে বুঝলাম এমন কোনও কঠিন কাজ নয়, যা ছেলেরা পারে কিন্তু মেয়েরা পারে না। সেই সাহসের উপর ভর করেই এখনও কাজ করে চলেছি,’ বলেন তিনি।
তবে শুরুতে পরিবারের তরফে আপত্তিও ছিল। রিনা বলেন, ‘আমি পরিবারের লোকজনকে বোঝাই যে, আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হতে চাই। নিজের প্রয়োজনের জন্য বারবার বাড়ি থেকে টাকা চাইতে চাই না।’ এখন নিজের অনেক শখ পূরণ করতে পেরেছেন তিনি। পরিবারও বিষয়টি মেনে নিয়েছে। যদিও গ্রামের অনেকেই প্রথম দিকে তাঁর পাম্পে কাজ করাকে বাঁকা নজরে দেখতেন। রিনার কথায়, ‘মাথায় ছিল আজ যারা আমার কাজকে পছন্দ করছে না, একদিন তারাই প্রশংসা করবে। আগের মতো এখন আর অভাব নেই। জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে।’
পাম্পের আরেক মহিলা কর্মী চন্দনা তপ্ন জানান, আগে থেকেই এখানে মহিলাদের কাজ করতে দেখে তাঁরও সাহস হয়েছে। ‘তাই এখানে কাজ শুরু করি। সহকর্মী ও পাম্প কর্তৃপক্ষের সাহায্যে এখন সব কাজ সামলাতে পারি’, বলেন তিনি। চন্দনা জানান, অনেক মহিলা স্কুটি নিয়ে তেল ভরাতে এসে তাঁদের দেখে প্রশংসা করেন।
পাম্পের মালিক অরিন্দিপ বণিক জানান, বালুরঘাটের অন্য কোনও পাম্পে এখনও মহিলারা কাজ করেন না। তিনি বলেন, ‘আমাদের ইচ্ছে ছিল মেয়েরাও এই ক্ষেত্রে এসে দক্ষতার পরিচয় দিক। পাশাপাশি তাদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করাও আমাদের উদ্দেশ্য ছিল। কাজের ক্ষেত্রে তারা ছেলেদের সমতুল্য এবং প্রতিনিয়ত নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ দিচ্ছে।’ তিনি জানান, এই পাম্পে যাঁরা কাজ করেন তাঁরা অধিকাংশই গ্রাম কিংবা অনেক পিছিয়ে পড়া এলাকা থেকে এখানে কাজ করতে আসছেন। এখানে কাজ করে তাঁরা আত্মবিশ্বাসও ফিরে পেয়েছেন।
স্থানীয় অমিত সাহা বলেন, ‘প্রথম দিকে বিষয়টা একটু অবাক লাগত। কিন্তু এখন দেখছি তাঁরা খুব দক্ষতার সঙ্গে সব কাজ সামলাচ্ছেন। এতে সমাজের অন্য মেয়েরাও কাজ করার উৎসাহ পাবেন বলে মনে হয়।’
