তন্দ্রা চক্রবর্তী দাস, কোচবিহার: রাজবংশী ভাষায় ‘কুড়া’ শব্দের অর্থ অগভীর জলাশয়। পাটাকুড়ায় (Patakura) একসময় ছিল ছোট ছোট কুড়া। কুড়াতে পাট জাগ দেওয়া হত। সেখান থেকেও এই পাটাকুড়া নামকরণ বলে জনশ্রুতি রয়েছে। বর্তমানে পাটাকুড়া এলাকাটি দুটি ভাগে বিভক্ত- পাটাকুড়া ১৬ আর ১৮ নম্বর মিলে পাটাকুড়া। নিউ পাটাকুড়া পড়েছে গুড়িয়াহাটি-১ গ্রাম পঞ্চায়েত এলকায়। কোচবিহারের ইতিহাস গবেষক স্বপনকুমার রায় বলছেন, ‘পাটাকুড়া হয়তো রাজাদের কোনও রাজপাট অথবা কোন দেবদেবীর পাট। কোচবিহারের বিভিন্ন জায়গায় গর্ত করে মাটি তুলে সেই মাটি দিয়ে উঁচু বাড়ি হয়েছে। সাগরদিঘি থেকে শুরু করে কোচবিহার শহরের বুকে বিভিন্ন দিঘিতে এর প্রমাণ দেখা যায়। অনুমান করা যেতেই পারে, সেরকমই এখানে কুড়া বানিয়ে এই মাটি বাড়ি তৈরির কাজে লাগানো হয়েছিল।’
বন্যায় বাড়ি ভাঙা পড়েছিল মহারাজার ল’ অ্যাসিস্ট্যান্ট অখিলচন্দ্র পালিতের। ৮০ জনের পরিবার রাতারাতি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গিয়েছিল সেসময়। নিউ পাটাকুড়ায় জমি দেওয়া হলেও সেখানে তাঁরা যাননি। তাঁর বংশধর অনিরুদ্ধ পালিতের মুখে জানা গেল পাটাকুড়া নামের আরও একটি তথ্য। তিনি বললেন, ‘মহারাজার দর্জি প্রমোদরঞ্জন বোসের (খোকা দর্জি) মুখে শুনেছি, গোলবাগান চত্বরে কোনও এক সময় একটা জলাশয় ছিল। কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগে বা ভূমিকম্পে সেটি দু’ভাগে ভাগ হয়ে যায়। ওই সময় থেকে ওই অঞ্চলকে বলা হত ফাটা কুড়া। পরবর্তীতে যা পাটাকুড়াতে এসে দাঁড়িয়েছে।’
অনেকে বাড়ি বিক্রি করে চলে গেলেও, পাটাকুড়ায় এখনও বহু পুরোনো পরিবার রয়েছে। বোস বাড়ির চতুর্থ প্রজন্ম সোমনাথ বোসের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ‘আমাদের পাটাকুড়ার ইতিহাস যাতে হারিয়ে না যায় সে জন্য বয়স্কদের সঙ্গে কথা বলে লেখা, অডিওর মাধ্যমে আমরা যতটা পারছি পাড়ার ইতিহাস রক্ষা করার চেষ্টা করছি।’
সালটা ১৯৫৪। ভয়ংকর রূপ নেয় তোর্ষা। এমনিতেই পাহাড়ে মানে ভুটানে বৃষ্টি হলে তোর্ষায় জল বাড়ে। তার উপর এই একটানা বৃষ্টিতে সেই নদী জলে টইটুম্বুর। প্রবল জলরাশি নিয়ে তোর্ষার সে এক ভয়ংকর রূপ। দেখতে দেখতে নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে একের পর এক চর, এ টিম মাঠ, বি টিম মাঠ, কোচবিহার মহাশ্মশান, কারিশাল মসজিদ। একটু একটু করে শহরের দিকে সরে আসছে তোর্ষা। ভাঙন শুরু হল বৃষ্টি থামার পর। পাটাকুড়া অঞ্চলে ছিল রাজবাড়ির উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের বাড়ি, চাপরাশিপট্টি। ভাঙনে তলিয়ে গেল। রাজপরিবারের রানিবাগান বা কেশব আশ্রমও বাদ গেল না। তলিয়ে গেল কেশব আশ্রমের অর্ধেকের বেশি। পাটাকুড়া থেকে হাজরাপাড়া, চোখের সামনে ভেঙে ভেঙে পড়েছিল দালানকোঠা। প্রত্যক্ষদর্শীরা কয়েকজন আজও বেঁচে আছেন। ৮৮ বছরের মলয়কুমার বোসের মুখ থেকে বেশ কিছু ঘটনার কথা জানা গেল। সেসময় নৌকাডুবি হতে দেখেছেন শিবরঞ্জন দে (৮২)। নদীগর্ভে মহাশ্মশান তলিয়ে যাওয়ায় শ্মশানটি বর্তমান স্থানে (বিবেকানন্দ স্ট্রিট) স্থানান্তরিত হয়। পাটাকুড়ায় একটা বড় অংশ তোর্ষার গ্রাসে চলে যাওয়ায় শহরের অপরপ্রান্তে সূচনা হয় নিউ পাটাকুড়ার। বাড়িঘর হারিয়ে দিশেহারা প্রায় ৫০০ পরিবারকে সরকারের তরফে শহরের পূর্বপ্রান্তে জায়গা দেওয়া হয় বসবাসের। নিজেদের শিকড়কে মনে রাখার জন্য বাসিন্দারা সেই পুরোনো নামেই তাঁদের নতুন জায়গার নামকরণ করেন। পাটাকুড়ার গোলবাগানের আদলে সেই নতুন বা নিউ পাটাকুড়াতেও তৈরি হয় আরেকটি গোলবাগান। এখানে দেখা হল অশোক চাকির সঙ্গে। তাঁর ঠাকুরদা দেবেন্দ্রনাথ চাকি তোর্ষার ভাঙনে বাড়িঘর হারিয়ে নিউ পাটাকুড়ায় নতুন করে বাড়ি তৈরি করেছিলেন। রানিবাগানের কাছে থাকত উপেন্দ্রনাথ দেবের পরিবার। ঘরবাড়ি হারিয়ে তাঁরাও এসে উঠেছিলেন এই নিউ পাটাকুড়াতে বলে জানালেন উপেন্দ্রনাথের বংশধর উদয়শংকর দেব।
