শিলিগুড়ি: রাশ, রাশ। কভার, কভার। বুইয়াহ…
সন্তানের মুখে শব্দগুলো প্রথম প্রথম অচেনা ঠেকলেও খুব বেশি গা করেননি দেশবন্ধুপাড়ার সুদীপ্তা সান্যাল। বরং ছেলে যাতে বাইরের ধুলোবালিতে খেলতে না যাওয়ার বায়না করে, সেজন্য মোবাইল দিয়ে রাখতেন সর্বক্ষণ (On-line Video games)। এভাবেই চলছিল টানা প্রায় এক বছর। লাটে উঠেছিল পড়াশোনা। ক্লাস এইটের রেজাল্ট খারাপ হওয়ার পর টনক নড়ল সুদীপ্তার। কাউন্সেলিং করানোর পর বুঝতে পারলেন, মোবাইল হাতে শুধু পড়াশোনার সর্বনাশ নয়, ছেলেকে তিনি ঠেলে দিচ্ছিলেন ভয়ংকর বিপদের মুখে। এ যাত্রায় অবশ্য রেহাই পেয়েছেন।
সুদীপ্তার মতো আপনার সন্তানও কি স্কুলের পড়ার ফাঁকে বা ছুটির অলস দুপুরে মুখ গুঁজে থাকে মোবাইলে? তার আঙুলও কি ক্ষিপ্রগতিতে চলে ‘রোবলক্স’, ‘মাইনক্র্যাফট’, ‘ফোর্টনাইট’ বা ‘ফ্রি ফায়ার’-এর মতো গেমের পর্দায়? উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তবে জেনে রাখুন- আপনার সন্তান তো বটেই, বাড়ির অন্দরমহলও কিন্তু আর নিরাপদ নেই। কারণ, আপনার সন্তানের খেলার সঙ্গীটি হয়তো স্কুলের টিফিন শেয়ার করা বন্ধু নয়, বরং সাত সমুদ্র পারের কোনও জঙ্গি সংগঠনের দক্ষ রিক্রুটার। মালদা থেকে মাথাভাঙ্গা, বারবিশা থেকে বামনগোলা- উত্তরবঙ্গের প্রতিটি কোণ এখন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদীদের নিশানায়।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাম্প্রতিক রিপোর্ট এবং ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার ‘রেড অ্যালার্ট’ বলছে, যুদ্ধের কৌশল বদলে গিয়েছে। জঙ্গিরা এখন আর হাতে বন্দুক ধরিয়ে দিচ্ছে না, বরং তাদের সফট টার্গেট হয়ে উঠছে ৮ থেকে ১৫ বছর বয়সি কিশোর-কিশোরীদের অপরিণত ও কৌতূহলী মন। তাই এখন থেকেই অভিভাবকদের সচেতন ও সতর্ক হওয়ার বার্তা দিচ্ছেন সাইবার বিশেষজ্ঞ সন্দীপ সেনগুপ্ত। তাঁর কথায়, ‘বাচ্চাদের হাতে মোবাইল তুলে দেওয়াটা ঘোর বিপদ। যদি একান্ত দিতেই হয়, তাহলে বাবা-মায়েদের নজর রাখতে হবে ছেলেমেয়ে মোবাইলে কী করছে তার ওপর। তাছাড়া মোবাইলে যে অপরাধের ফাঁদ রয়েছে, সেটাও বোঝাতে হবে সন্তানকে। তাতে একান্ত কাজ না হলে পেরন্টাল লক অ্যাপ ব্যবহার করতে হবে।’
সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন আর সিরিয়া বা আফগানিস্তানের ধুলোমাখা পথ নয়, যুদ্ধ চলছে ইন্টারনেটের অপটিকাল ফাইবার দিয়ে। এই ‘ডিজিটাল জিহাদ’-এর (Digital Jihad) কৌশলটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং মারাত্মক। প্রথমে জনপ্রিয় মাল্টিপ্লেয়ার গেমের চ্যাটরুমে ঢুকে এরা ছদ্মনামে বন্ধুত্ব পাতায়। বাচ্চার বিশ্বাস অর্জন করতে তারা কখনও দাদা, কখনও বা সমবয়সি বন্ধুর মুখোশ পরে। গেমের লেভেল পার করে দেওয়া, উপহার হিসেবে গেমের কারেন্সি (যেমন ভি-বাকস বা রোবাক্স) দেওয়ার নাম করে তাদের ধীরে ধীরে গ্রাস করে। এরপরের ধাপটি আরও ভয়ানক। গেমের চ্যাটবক্স থেকে তাদের বের করে নিয়ে যাওয়া হয় ডিসকর্ড, টেলিগ্রাম বা হোয়াটসঅ্যাপের মতো এনক্রিপ্টেড অ্যাপে। সেখানেই চলে আসল মগজধোলাই। বাচ্চারা ভাবছে, তারা গেমের সঙ্গী পেয়েছে, অথচ অজান্তেই তারা জড়িয়ে পড়ছে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের এক ভয়ংকর জালে।
আমাদের দেশেই ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা এই আশঙ্কার ভিত আরও মজবুত করেছে। গাজিয়াবাদের ঘটনাটি হয়তো অনেকেরই মনে আছে। সেখানে অনলাইন গেমের মাধ্যমে পরিচয় হওয়া এক ব্যক্তির প্ররোচনায় পড়ে জৈন পরিবারের এক নাবালক ধর্মান্তরিত হয়েছিল। ‘বদ্দ্যো’ নামের এক হ্যান্ডলার গেমের চ্যাটবক্সকে ব্যবহার করেই দিনের পর দিন ওই কিশোরের মগজধোলাই করেছিল, যা তাকে উগ্র মানসিকতার দিকে ঠেলে দেয়। ওই কিশোর এতটাই প্রভাবিত হয়েছিল যে, সে জিমে যাওয়ার নাম করে দিনে পাঁচবার প্রার্থনা করতে যেত। শুধু তাই নয়, দক্ষিণ ভারতের মেঙ্গালুরুতেও জঙ্গি-যোগ সন্দেহে যখন তল্লাশি চালানো হয়, তখনও উঠে আসে অনলাইন গেমের চ্যাটরুমের (Gaming chatroom risks) মাধ্যমে যোগাযোগের তথ্য। এনআইএ-র তদন্তে বারবার উঠে এসেছে যে, আইএসআই-এর মতো জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো এখন ‘লোন উলফ’ তৈরির জন্য গেমিং প্ল্যাটফর্মগুলোকেই সবথেকে নিরাপদ হিসেবে বেছে নিচ্ছে।
যাঁরা ভাবছেন উত্তরবঙ্গ বা পশ্চিমবঙ্গ এই মানচিত্রের বাইরে, তাঁরা বড় ভুল করছেন। বিপদ এখন আপনার দরজায় কড়া নাড়ছে না, বিপদ ঘরের ভেতরেই বসে আছে। সম্প্রতি পুনের এক কিশোরী অনলাইন গেমের মাধ্যমে পরিচয় হওয়া এক তরুণের টানে বাড়ি ছেড়ে সোজা চলে এসেছিল জলপাইগুড়ি জেলার নাগরাকাটায়। পুলিশ তাকে উদ্ধার করলেও গেমের চ্যাটবক্স যে কতটা শক্তিশালী ব্রেনওয়াশ করতে পারে, এই ঘটনা তার জলজ্যান্ত প্রমাণ।
রাজ্যের বিশিষ্ট সাইবার বিশেষজ্ঞ রজতকান্তি রায়ের পরামর্শ, এই পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের ভূমিকা সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। তাই আতঙ্কিত হয়ে আচমকা বাচ্চার হাত থেকে ফোন কেড়ে নিতে বারণ করছেন তিনি, কারণ তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে। সন্তান জেদি বা বিদ্রোহী হয়ে উঠতে পারে, এমনকি লুকিয়ে ফোন ব্যবহারের প্রবণতাও বাড়তে পারে। তিনি বলছেন, ‘এক্ষেত্রে স্মার্ট পেরন্টিং প্রয়োজন। সন্তান গেমের আড়ালে কার সঙ্গে কথা বলছে, তার ভার্চুয়াল বন্ধুরা আসলে কে, সেদিকে কড়া নজরদারি দরকার। প্রয়োজনে সন্তানের সঙ্গে বসে গেমটি বুঝুন, তার অনলাইন বন্ধুদের সম্পর্কে জানুন।’
শিলিগুড়ির একটি ইংরেজিমাধ্যম স্কুলে পড়ান দেবার্ঘ্য রাহা। তাঁর কথায়, ‘বাবা-মায়েরা অনেকসময় ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে সন্তানের হাতে ফোন তুলে দেন। কিন্তু নজরদারি রাখেন না বা রাখা সম্ভব হয় না। মোবাইল আসক্তি কমাতে অভিভাবকদের পাশাপাশি স্কুলের তরফেও বাচ্চাদের সচেতন করা হয়। আসলে ওদেরও বুঝতে হবে যে স্ক্রিনের ওপারে কতটা ভয়ংকর বিপদ রয়েছে। সেটা আমরা সবাই সম্মিলিতভাবে বোঝাতে পারলে, তবেই এই সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে।’
প্রযুক্তির যেমন ভালো দিক রয়েছে, তেমনই খারাপও রয়েছে প্রচুর। তাই চোখ বুজে থাকার দিন শেষ। আপনার সন্তানের শৈশব জঙ্গিদের বারুদের স্তূপে চাপা পড়ার আগেই তাকে রক্ষা করার দায়িত্ব কিন্তু আপনারই।
