শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি: প্রাথমিক বা মাধ্যমিক স্কুল শিক্ষকের নিয়োগ পরীক্ষায় আগেই নানা দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। এবার কলেজ সার্ভিস কমিশন (সিএসসি)-এর স্টেট এলিজিবিলিটি টেস্ট (সেট)-এ (SET) উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় (NBU) পরীক্ষাকেন্দ্রে বড়সড়ো অনিয়মের অভিযোগ উঠল। সহকারী অধ্যাপক নিয়োগের যোগ্যতা নির্ণয়ের জন্য সেট নেওয়া হয়। রবিবার রাজ্যজুড়ে সেই পরীক্ষা হয়েছে। অভিযোগ, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রে পরীক্ষা সংক্রান্ত নানা গোপন তথ্য পরীক্ষার আগেই ফাঁস হয়ে গিয়েছে তৃণমূলের অধ্যাপকদের সংগঠন ওয়েবকুপার হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে। তথ্য ফাঁস করেছেন, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ভাস্কর বিশ্বাস এবং পরীক্ষাকেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা কোঅর্ডিনেটর অরিন্দম বসাক। এমনকি ওই রাজনৈতিক গ্রুপে আলোচনা করেই কারা কারা ইনভিজিলেটর হবেন তা ঠিক করা হয়েছে। অনিয়মের কথা প্রকাশ্যে আসতেই হইচই পড়ে গিয়েছে শিক্ষা মহলে। অসৎ উদ্দেশ্যেই পরিকল্পনামাফিক গোপন তথ্য ফাঁস করা হয়েছে বলেই অভিযোগ উঠেছে।
কোন ইনভিজিলেটর পরীক্ষাকেন্দ্রের কোন ঘরে দায়িত্বে থাকবেন, সংশ্লিষ্ট ঘরে কোন বিষয়ের এবং কোন রোল নম্বরের পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষা দেবেন এই তথ্যগুলি অত্যন্ত গোপনীয় বলেই জানিয়েছেন সিএসসি’র আধিকারিকরা। শুক্রবারই সেইসব যাবতীয় তথ্য ওয়েবকুপার হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ফাঁস করেছেন অরিন্দম। হোয়াটসঅ্যাপের যে কথোপকথন সামনে এসেছে তা দেখে আশ্চর্য হয়ে গিয়েছেন শিক্ষাবিদরা। কথোপকথনে দেখা যাচ্ছে, দিনকয়েক আগেই ওয়েবকুপার উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে একটি মেসেজ করেন ভাস্কর। কারা কারা সেট-এর ইনভিজিলেটর হতে ইচ্ছুক তাঁদের নাম জানতে চান তিনি। সেইমতো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অনেকেই ইনভিজিলেটর হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। সেইমতো তালিকা তৈরি করে অরিন্দম গ্রুপে জানাবেন বলেও জানান ভাস্কর। অরিন্দম ইনভিজিলেটরদের লম্বা তালিকাও গ্রুপে পোস্ট করেন। কোন কোন সহযোগী কর্মীরা কোথায় দায়িত্বে থাকবেন তা-ও গ্রুপে জানিয়ে দেওয়া হয়। যেভাবে পরীক্ষার গোপনীয়তা নষ্ট করা হয়েছে তা শুনে হতবাক কোচবিহার পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য এবং সেট-এর জলপাইগুড়ি জেলার স্পেশাল অবজার্ভার দেবকুমার মুখোপাধ্যায়। তাঁর কথা, ‘যেসব অভিযোগ উঠেছে তা ভয়ংকর। সেসব সত্য হলে পরীক্ষার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।’
সব শুনে কার্যত বিস্মিত সিএসসি’র চেয়ারম্যান সৌরিন বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কথা, ‘যেসব তথ্য নির্দিষ্ট একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে দেওয়া হয়েছে তা অনুচিত। পদ্ধতিগতভাবেই যাবতীয় কাজ হওয়া উচিত ছিল। কোন গ্রুপে কে তথ্য ফাঁস করেছে তা আমার পক্ষে জানা সম্ভব নয়। ভোট আসছে। রাজনীতি করার জন্য কেউ ওই ধরনের কাজ করতে পারেন। তবে কোনও লিখিত অভিযোগ পাইনি। পেলে অবশ্যই পদক্ষেপ করব।’ শুধু তথ্য ফাঁস করাই নয়, ভাস্করের বিরুদ্ধে বেআইনিভাবে পরীক্ষা চলাকালীন প্রতিটি পরীক্ষা হলে ঢোকার অভিযোগও উঠেছে। সেই অভিযোগ স্বীকার করে নিয়েছেন সেট-এর দার্জিলিং জেলার নোডাল অফিসার দেবাশিস দত্ত। তাঁর বক্তব্য, ‘ভাস্কর বিশ্বাস ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার হলেও পরীক্ষার কেন্দ্রে কোনও দায়িত্বে ছিলেন না। তাই পরীক্ষা হলে ঢোকার কোনও বৈধতা তাঁর নেই। তবুও তিনি পরীক্ষা হলে ঢুকে খবরদারি করেছেন। আমি বিষয়টিতে আপত্তি জানিয়েছি। সিএসসি-কেও লিখিতভাবে বিষয়টি জানিয়েছি।’
অভিযোগের কথা সরাসরি অস্বীকার করেননি ভাস্কর। তাঁর বক্তব্য, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যাতে ইনভিজিলেটর হতে পারেন তাই তাঁদের সঙ্গে আলোচনার জন্য হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বিষয়টি জানিয়েছিলাম। অন্যভাবে ভাবিনি।’ পরীক্ষা হলে ঢোকার কথাও মেনে নিয়ে ভাস্কর দাবি করেছেন তিনি হলে ঢুকতে পারেন। যদিও সিএসসি’র আধিকারিকরা জানিয়েছেন কোনও অবস্থাতেই ভাস্কর পরীক্ষাকেন্দ্রে ঢুকতে পারেন না। কেন তিনি প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা হলে গিয়েছিলেন তা নিয়ে তৈরি হয়েছে রহস্য। অরিন্দম অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সম্পর্কে স্পষ্ট করে কিছু বলতে চাননি। নানা প্রশ্ন করলেও ‘নো কমেন্টস’ বলে বিষয়গুলি এড়িয়ে যান তিনি। কয়েকমাস আগেই স্কুল সার্ভিস কমিশনের শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষায় অরিন্দমের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল। এসএসসি’র উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষাকেন্দ্রের পরীক্ষার্থী ছিলেন অরিন্দমের স্ত্রী। আর নোডাল অফিসার হিসাবে সেই কেন্দ্রের পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন অরিন্দম নিজেই। সেই সময় ভেনু ইনচার্জ ছিলেন ভাস্কর। এসএসসিতে অনিয়ম করা ভাস্কর ও অরিন্দম জুটির বিরুদ্ধে সিএসসিতেও একগুচ্ছ অভিযোগ উঠল। গোটা বিষয়টি তদন্ত করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
