দীপঙ্কর মিত্র, রায়গঞ্জ: উত্তরের হিমেল হাওয়ায় প্রতি বছর ডানায় ভর করে হাজার হাজার মাইল পেরিয়ে যারা দুই দিনাজপুরে আসত, সেই পরিযায়ী পাখিদের (Migratory Birds) সংখ্যায় এবার বড়সড়ো টান পড়েছে। রায়গঞ্জ বন বিভাগের অধীনে থাকা উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুরের জলাশয়গুলোতে এবার শীতকালীন জলজ পাখির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় দু’হাজার পাখি কম আসায় দুশ্চিন্তার ভাঁজ পরিবেশপ্রেমীদের কপালে। দীর্ঘদিনের চেনা জলাশয়গুলোতে এখন আর আগের মতো কলকাকলি শোনা যাচ্ছে না।
জানুয়ারি মাসে দুই জেলার ৩৯টি জলাভূমিতে পাখি গণনা চলে। এতে অংশ নিয়েছিলেন ৩১ জন পরিবেশপ্রেমী ও বনকর্মীরা। সমীক্ষার রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, এবার মোট ৮৬টি প্রজাতির ৩২,২৭৫টি জলজ পাখি এসেছে। অথচ ২০২৫ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩৪,২৭৬। বিশেষ করে সরাল বা লেসার হুইসলিং ডাকের সংখ্যা এবার ২৮,০৭২টি। এছাড়া মেটেমাথা টিটি ৫১৫টি, পাতি তিলিহাঁস ৫০০টি এবং রাজহাঁসের উপস্থিতি ছিল ৩০০টি। চোপড়া, করণদিঘি, রায়গঞ্জ, কুলিক, কুশমণ্ডি এবং বালুরঘাট রেঞ্জের অধীনে থাকা জলাশয়গুলোতে এই সমীক্ষা চালানো হয়।
পাখিদের এই খামখেয়ালিপনায় উদ্বিগ্ন বন দপ্তরও। তবে দপ্তরের আধিকারিকরা পাখির সংখ্যা কমার কারণ স্পষ্ট করে বলতে পারেননি। রায়গঞ্জ বিভাগীয় বন আধিকারিক ভূপেন বিশ্বকর্মা বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এবার পাখির সংখ্যা কিছুটা কমেছে। পাখির সংখ্যা কেন কমল, তার কারণ বিশেষজ্ঞরা খতিয়ে দেখছেন। সেই বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে।’ মনে রাখতে হবে, পরিযায়ী পাখির সংখ্যা কম থাকায় এবার গণনার দিনক্ষণ এক সপ্তাহ পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
এদিকে, পক্ষীপ্রেমীরা কিন্তু পাখি কমে যাওয়ার পেছনে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়াকেই দায়ী করছেন। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে পাখিদের নিয়ে কাজ করা বাসুদেব চক্রবর্তী বলেন, ‘বিগত ৩০ বছর আগে যে জলাভূমিগুলো এই এলাকায় ছিল, সেগুলো এখন আর নেই। শিলিগুড়ি মোড়, কাশিবাটি বা এফসিআই মোড় সংলগ্ন জলাভূমিগুলোতে এখন কচুরিপানা ও পানিফল চাষ হচ্ছে। নেহালি বিলে একসময় বিরল প্রজাতির পাখি আসত। কিন্তু এখন সেখানে মাছ চাষের জন্য ব্যবসায়িক কারণে প্রচুর কীটনাশক ও ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে পাখিদের প্রাকৃতিক খাবার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে তারা এখন ওডিশার দিকে চলে যাচ্ছে।’ তাঁর অনুরোধ, সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে সেমিনারের আয়োজন করতে হবে বন দপ্তরকে।
অন্যদিকে পাখিপ্রেমী কৌশিক মৈত্রর মতে, অতিরিক্ত নগরায়ণ আর দূষণই কাল হচ্ছে। তাঁর কথায়, ‘পাঁচ বছর আগে যে সংখ্যক জলাশয় ছিল, এখন তার অধিকাংশই বুজিয়ে বড় বড় আবাসন তৈরি হয়েছে। জমিতে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারের ফলে খাবার সংগ্রহ করতে গিয়ে বিষক্রিয়ায় পাখি মারা যাচ্ছে। জলাশয়ে পাতা জালের কারণে অনেক সময় পাখিরা নামতেই পারছে না। আবার প্লাস্টিক খেয়েও অনেক পাখির মৃত্যু হচ্ছে।’
