মোস্তাক মোরশেদ হোসেন, রাঙ্গালিবাজনা: ঐরাবতের পান, গুটখা চিবোনোর অভ্যেস নেই! আবার দাঁত মাজার রেওয়াজও নেই! লবণ, লবঙ্গ দেওয়া পেস্ট ব্যবহার তো দূর অস্ত। ফলে ‘মাশুড়ে পে জান’ আসবে কোত্থেকে? হয়তো বয়স বেশি হয়েছে। কিংবা সংক্রমণে পোকায় ধরেছিল দাঁতে। শেষপর্যন্ত ধান চিবোতে গিয়ে খসেই পড়ল হাতির দাঁত। বেচারা বুনো! মাঠেই দাঁত ফেলে তাকে ফিরতে হল বনে। শনিবার বিকেলে ওই দাঁত উদ্ধার করে বনকর্মীদের জিম্মায় দিলেন গ্রামবাসীরা। ঘটনাটি মাদারিহাটের (Madarihat) পশ্চিম খয়েরবাড়ির।
এদিকে মাঠে হাতির দাঁত পাওয়া গিয়েছে! এখবর ছড়িয়ে পড়তেই দলে দলে স্থানীয়রা ভিড় করছেন ঘটনাস্থলে। তবে সেটি ছিল চোয়ালের দাঁত। বন দপ্তরের পোষা হাতি, সার্কাসের হাতি, বন থেকে গ্রামে হানা দেওয়া হাতির লম্বা দাঁত দেখেছেন অনেকেই। তবে হাতির চোয়ালের দাঁত দেখার ‘সৌভাগ্য’ আর কয়জনের হয়! বিশেষ করে দাঁত খসে পড়ার ঘটনা স্মৃতি হাতড়েও মনে করতে পারছেন না বয়োজ্যেষ্ঠরা। ঘটনাস্থলে যান খয়েরবাড়ির পঞ্চায়েত প্রধান মন্টু রায়। তিনি বললেন, ‘এরকম ঘটনা ঘটতে পারে কল্পনাও করিনি। হাতির দাঁতের চোরাকারবার হয়। তবে গ্রামবাসীরা হাতির দাঁতটি বনকর্মীদের হাতে তুলে দিয়ে সচেতন নাগরিকের পরিচয় দিয়েছেন।’
মাদারিহাটের রেঞ্জ অফিসার শুভাশিস রায়ও বলছেন, ‘হাতির চোয়ালের দাঁত সাধারণত এভাবে খসে পড়ে না। হতে পারে সংক্রমণ বা অন্য কোনও কারণে দাঁতটি দুর্বল হয়ে পড়েছিল।’
পশ্চিম খয়েরবাড়িতে এখন চলছে ধান কাটার পালা। কৃষিজমি খালি হচ্ছে। জমিতে গবাদি প্রাণী চরাতে যাচ্ছেন এলাকার অনেকেই। তাঁরা জানালেন, দিন দুই ধরে দাঁতটি পড়ে ছিল মাঠে। তবে অনেকেই সেটিকে কোনও মৃত প্রাণীর হাড় মনে করে এড়িয়ে যান। শনিবার গোরু চরাতে গিয়ে কৌতূহলবশত দাঁতটি হাতে তুলে নেন পশ্চিম খয়েরবাড়ির বীরেন বর্মন। তিনি বলছিলেন, ‘খুঁটিয়ে দেখে বুঝতে পারি, ওটা হাতির চোয়ালের দাঁত। দাঁতটিতে পোকায় ধরেছিল। খাঁজে খাঁজে আটকে ছিল ধান। এরপরই নিশ্চিত হয়ে এলাকার পঞ্চায়েতকে খবর দিই।’
মাদারিহাট-বীরপাড়া পঞ্চায়েত সমিতির স্থানীয় সদস্যর ললিত বর্মনের বক্তব্য, ‘খবর পেয়ে মাঠে ছুটে যাই। হাতির দাঁত দেখতে পেয়ে বনকর্মীদের খবর দেই। এভাবে হাতির দাঁত যে খসে পড়তে পারে তা জানতাম না।’
পশ্চিম খয়েরবাড়ি এবং উত্তর রাঙ্গালিবাজনার ভেতর দিয়ে খয়েরবাড়ি ফরেস্ট এবং ধুমচি ফরেস্টের মধ্যে হাতি চলাচলের করিডর রয়েছে। শুক্রবারও একপাল হাতি ধানখেতে হানা দেয়। কোনওটা দাঁতাল, কোনওটা বা মাকনা। যৌবনে টগবগ হাতিগুলির দাপটে ত্রস্ত এলাকার বাসিন্দারা। তবে দাঁত খসে পড়া হাতিটি বুড়ো হয়ে গিয়েছে বলে মনে করছেন এলাকাবাসী। উত্তর রাঙ্গালিবাজনার হরিশংকর বর্মনের কথায়, ‘যৌবন এবং ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। হাতির দাঁত খসে পড়ার ঘটনা থেকে এটা ফের প্রমাণিত। আমাদের জন্য ঘটনাটি শিক্ষামূলক।’
২০২২ সালের ২১ অক্টোবর পশ্চিম খয়েরবাড়ি লাগোয়া উত্তর রাঙ্গালিবাজনার সুনীল বর্মনের সেগুন গাছের বাগানে হানা দিয়েছিল একপাল হাতি। গাছের শক্ত ছাল তুলতে গিয়ে একটি হাতির দাঁতের সামনের অংশ আটকে যায়। শেষপর্যন্ত সেটি ভেঙে আটকে থাকে গাছের ছালে। পরদিন দাঁতটি উদ্ধার করে বনকর্মীদের জিম্মায় দেয় দশম শ্রেণির পড়ুয়া মণীশ বর্মন। শনিবার ফের চর্চায় উঠে আসে ২০২২ সালের ঘটনাটি।
