উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: লুপাস এটি একটি অটোইমিউন অসুখ (Lupus)। এক্ষেত্রে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সুস্থ কোষ ও টিস্যুকে আক্রমণ করে। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় না হওয়া বা দেরিতে ধরা পড়া একটি বড় সমস্যা। তাই সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। লিখেছেন কলকাতার এশিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ইমিউনোলজি ও রিউমাটোলজির কনসালট্যান্ট রিউমাটোলজিস্ট ও অ্যাকাডেমিক ডিরেক্টর ডাঃ অর্ঘ্য চট্টোপাধ্যায়।
লুপাস রোগটিকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনও কারণ নেই। কারণ পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বজুড়ে প্রতি ১ লক্ষ মানুষের মধ্যে ২০ থেকে ১৫০ জন লুপাসে আক্রান্ত। প্রতি বছর অনেক নতুন রোগী শনাক্ত হন। উদ্বেগের বিষয়, আক্রান্তদের প্রায় ৯০ শতাংশই সন্তান ধারণে সক্ষম বয়সের নারী। ভারতে সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় না হওয়া বা দেরিতে ধরা পড়া একটি বড় সমস্যা, তাই সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।
এবছর ১০ মে ছিল বিশ্ব লুপাস দিবস। এই দিনের প্রধান লক্ষ্য শুধু সচেতনতাই ছিল না, বরং লুপাস আক্রান্তদের দৃশ্যমানতা, সক্রিয় পদক্ষেপ এবং আশার আলো দেখানোও অন্যতম উদ্দেশ্য। এবছরের থিম ছিল, ‘পরিবর্তনের লক্ষ্যে পদক্ষেপ’ এবং ‘কাজের মধ্যে আশা ঃ লুপাসের ভবিষ্যৎ’ (‘Steps for Change’ and ‘Hope in Motion : The Way forward for Lupus’ )। এই থিম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সিস্টেমিক লুপাস এরিথমেটোসাস (এসএলই) শুধু চিকিৎসা সংক্রান্ত একটি অবস্থা নয়, বরং এমন এক জীবনসংগ্রাম যা প্রায়ই লোকচক্ষুর অন্তরালে ও ভুল বোঝাবুঝির মধ্যে থেকে যায়।
লক্ষণ
লুপাসকে প্রায়ই ‘গ্রেট মিিমকার’ বলা হয়। কারণ, এর লক্ষণগুলো একেকজনের ক্ষেত্রে একেকরকম হয়। প্রধান লক্ষণের মধ্যে রয়েছে- গাঁটে গাঁটে ব্যথা এবং প্রচণ্ড ক্লান্তি (প্রায় ৮০–৯০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে দেখা যায়)। এছাড়া ত্বকে র্যাশ, চুল পড়া ও জ্বর হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে কিডনি (৪০–৬০ শতাংশ), মস্তিষ্ক এবং রক্তকণিকা আক্রান্ত হয়। লক্ষণগুলি কখনও বাড়ে, আবার কখনও কমে যায় বলে রোগ নির্ণয়ে প্রায়ই দেরি হয়। এই জায়গাতেই লুপাসকে ‘দৃশ্যমান’ করার প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি। শুরুতেই রোগের লক্ষণ বোঝা এবং চিকিৎসা করানো একান্ত জরুরি।
নারী ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব
হরমোনের প্রভাব, জিনগত কারণ এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার পার্থক্যের কারণে লুপাস প্রধানত তরুণীদের বেশি আক্রমণ করে। আর এর প্রভাব জীববিজ্ঞানের গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও অনেক দূর বিস্তৃত। যখন একজন মানুষ কেরিয়ার, সম্পর্ক বা পরিবার গড়ার স্বপ্ন দেখেন, ঠিক সেই সময়েই এই রোগ চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়। ফলে এর মানসিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী, প্রায় ২৫–৪০ শতাংশ রোগী বিষণ্ণতায় এবং ৫০ শতাংশ পর্যন্ত রোগী উদ্বেগে ভোগেন। বাইরে থেকে সুস্থ মনে হলেও, ক্লান্তি আর অনিশ্চয়তা লুপাসকে একটি ‘অদৃশ্য অসুস্থতা’ করে তোলে, যার প্রভাব জীবনের ওপর পড়ে।
সামাজিক প্রভাব ও আশার কথা
সামাজিক ক্ষেত্রেও লুপাসের প্রভাব বেশ গভীর। লুপাসের কারণে শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা ব্যাহত হয়। বিশেষ করে বিয়ে, গর্ভাবস্থা এবং সামাজিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে রোগীরা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন। পরিবারও আর্থিক এবং মানসিকভাবে এই বোঝা ভাগ করে নেয়। তবে আধুনিক চিকিৎসার কল্যাণে আজ ছবিটা বদলেছে। সঠিক চিকিৎসা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকলে লুপাস আক্রান্ত নারীরাও এখন সফলভাবে মা হতে পারছেন।
চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত
‘পরিবর্তনের লক্ষ্যে পদক্ষেপ’ আসলে এক সম্মিলিত ডাক— যাতে আরও বেশি সচেতনতা, দ্রুত রোগ নির্ণয়, উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা এবং শক্তিশালী সামাজিক সমর্থন গড়ে তোলা যায়। অন্যদিকে, কাজের মধ্যে আশা ‘লুপাস-কেয়ারের’ পরিবর্তনকে প্রতিফলিত করে। শুরুতেই রোগ নির্ণয়, নিরাপদ ওষুধ, লক্ষ্যভিত্তিক থেরাপি এবং ব্যক্তি-উপযোগী চিকিৎসাপদ্ধতি উল্লেখযোগ্য ফল দিতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির ফলে লুপাস রোগীদের মধ্যে ৯০ শতাংশেরও বেশি দীর্ঘায়ু লাভ করছেন এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন।
বায়োমার্কার, প্রিসিশন মেডিসিন এবং আরও কার্যকরি থেরাপির ওপর আলোকপাত করে গবেষণা চলছে। ফলে উন্নত লুপাস চিকিৎসার ভবিষ্যৎ এখন অনেক বেশি উজ্জ্বল। তবে সচেতনতা প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কারণ, লুপাস জটিল হতে পারে, কিন্তু এটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য। সঠিক যত্ন ও সচেতনতা থাকলে লুপাস জীবনের গতি থামিয়ে দিতে পারে না। সচেতনতাই হোক সুস্থতার পথে প্রথম পদক্ষেপ।
