সৌরভ রায়, কুশমণ্ডি: ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির প্রথম দিক অবধি সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ মাধব সরকার, লোকনাথ সরকারদের মতো মুখোশশিল্পীদের গ্রামে। কারণ, এই সময়টায় চোখে সর্ষে ফুল দেখতে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার সিরিকুল গ্রামে ভিড় করেন দেশ-বিদেশের পর্যটকরা। শুধু কি সর্ষেফুল? উঁহু। দিগন্তবিস্তৃত হলুদে মোড়া সর্ষেখেতের মধ্যে মুখোশশিল্পীদের ছবি তোলাটাই এক্ষেত্রে মূল আকর্ষণ। মুখোশের ছবি তুলতে আগ্রহী ফোটোগ্রাফারদের কাছে তাই এটাই দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার এই প্রান্তিক জনপদে ঘুরতে আসার ‘সিজন’।
লন্ডনের গ্লাসগো শহর থেকে শুরু করে পৃথিবীর বেশকিছু দেশে বেশ কয়েক বছর আগেই পৌঁছে গিয়েছে কুশমণ্ডি (Kushmandi) ব্লকের মহিষবাথানের মুখোশ। রবিবার সেই মুখোশের ছবি তুলতে থাইল্যান্ড সহ কলকাতার একদল আলোকচিত্রী চলে আসেন খাগাইল গ্রামে মুখোশশিল্পী মাধব সরকারের বাড়িতে। ব্যাংকক নিবাসী নাসোনজাই (নিসা) এবং নাপোল লাপোর্ন সিরিকুল গ্রামে ঘুরে ঘুরে দেখলেন কাঠ কেটে কীভাবে তৈরি হয় মুখোশ। এরপর সেটায় রং লাগানো শেষ হলে, একজন তা মুখের ওপরে শক্ত করে বেঁধে পোশাক পরে কীভাবে হয়ে ওঠেন পারফর্মার। দেখে অভিভূত থাইল্যান্ডের আলোকচিত্রী নাসোনজাই (নিসা) বলেই ফেললেন, ‘আমার এমন অভিজ্ঞতা এই প্রথম।’ মানলেন, অন্যান্য দেশে মুখোশের ছবি তুললেও এমন অভিজ্ঞতা আগে কখনও হয়নি। এখানকার মুখোশ একেবারেই ভিন্ন।
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কুশমণ্ডি এসেছেন আরেক ফোটোগ্রাফার নাপোল লাপোর্ন সিরিকুল। ছবি তুলে খুশি তিনি। আলোকচিত্রী দলের সঙ্গে ছিলেন অয়ন মণ্ডল। তিনি জানালেন, পরপর দুই বছর এখানে ছবি তুলতে এসেছেন তাঁরা। থাইল্যান্ডের দুই ফোটোগ্রাফার সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন।
তাঁদের পাশাপাশি খুশি মুখোশশিল্পী মাধব সরকার, লোকনাথ সরকার, গন্ডুয়া সরকার, গজেন সরকার, গণেশ সরকাররা। মাধব ও লোকনাথ দুজনেই মুখোশ তৈরির কারিগর। নিজেরাই দল পরিচালনা করেন। গত দুইদিন ধরে শিল্পীরা আলোকচিত্রীদের পছন্দগত পজিশনে দাঁড়িয়ে কখনও নেচে ছবি তোলার মুহূর্ত তৈরি করে দিয়েছেন। মাধব বলছিলেন, ‘সারাবছর টুকটাক সরকারি ও বেসরকারি অনুষ্ঠান থাকলেও ডিসেম্বর মাস থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত একটা সিজন ধরে নিয়ে আমরা প্রস্তুত থাকি। বাইরে থেকে আলোকচিত্রীরা যোগাযোগ করেন কয়েক মাস আগে থেকেই। কারণ জানুয়ারি মাসে মাঠে মাঠে সর্ষে গাছে হলুদ ফুল ভরে থাকে। আলোকচিত্রীদের কাছে এটা প্রিয়।’ লোকনাথের কথায়, ‘গত কয়েক বছর ধরে দেশ ও বিদেশের মানুষ মুখোশ কেনা ছাড়াও মুখোশ তৈরি এবং মুখোশ নৃত্যের ছবি তোলার জন্য আসছেন। আমরা মুখোশ তৈরি করি আবার মুখোশ পরে নাচি। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেই যোগাযোগ করেন বেশিরভাগ মানুষ। এই সিজনে সমস্ত শিল্পী বাড়তি আয় করতে পারেন।’ শিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এই সিজনে ৫ থেকে ৭টা দলও যদি ছবি তুলতে আসে তাহলে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয় একেকজন শিল্পীর।
তবে দেশ-বিদেশের বড় বড় ফোটোগ্রাফাররা এই গ্রামে ছবি তুলতে এলেও এখানে থাকেন না। অনেকেই কালিয়াগঞ্জ কিংবা অন্যত্র হোটেলে থাকেন। কারণ গ্রামে তো প্রায় সবই মাটির বাড়ি। তাই তাঁদের অনুরোধ, সরকার থেকে যদি ইকো ট্যুরিজম প্রকল্পে তাঁদের ঘর বানিয়ে দেয় আর সেকথা সরকারিভাবে প্রচারও করে, তাহলে স্থায়ী আয়ের পথ খুঁজে পাবেন তাঁরা।
