কুমারগঞ্জ: কনকনে ঠান্ডায় কাবু গোটা উত্তরবঙ্গ। এই পরিস্থিতিতে যখন সাধারণ মানুষের জবুথবু, ঠিক সেই সময়েই উলটো ছবি দেখা গেল কুমারগঞ্জ ব্লকের উজিরপুর পাহানপাড়া এলাকায় এসআইআরের হেয়ারিংএর লাইনে। কনকনে ঠান্ডায় পেশায় কৃষি শ্রমিক ৪৫ বছর বয়সী নিমাই পাহান অনায়াসেই খালি পায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন (Kumarganj Barefoot Life) মাঠ থেকে এসআইআর হেয়ারিংয়ের (SIR Listening to) লাইনে। প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও তিন দশক আগে নেওয়া এক জেদই আজ তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিমাইয়ের এই অদ্ভূত অভ্যাসের নেপথ্যে রয়েছে তাঁর ছোটবেলার এক বিচিত্র সমস্যা। কিশোর বয়সে তিনি যেখানেই যেতেন, জুতো খুলে সেখানেই ফেলে রেখে আসতেন। জুতো হারানো যেন তাঁর স্বভাবে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। স্কুল হোক কিংবা খেলার মাঠ—বাড়ি ফিরতেন খালি পায়েই। বারবার জুতো হারানোর ফলে দরিদ্র পরিবারে বাড়ত আর্থিক চাপ, জুটত বাবা-মায়ের কড়া বকুনি আর মার। সেই অপমান আর শাসনের হাত থেকে বাঁচতেই ১৫ বছর বয়সে এক কঠিন শপথ নেন নিমাই। জুতো পরলে যদি বকুনি খেতে হয়, তবে আর জুতোই পরবেন না তিনি। সেই শপথ নেওয়ার দিন থেকে আজ অবধি টানা ৩০ বছরে তাঁর পা আর জুতোর স্পর্শ পায়নি। তাই খালি পায়েই চলাফেরা করেন কুমারগঞ্জ ব্লকের উজিরপুর পাহানপাড়া এলাকার বাসিন্দা নিমাই পাহান (Nimai Pahan)।
বর্তমানে ৪৫ বছর বয়সী নিমাই পাহান পেশায় একজন কৃষি শ্রমিক। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন মাঠে-ঘাটে কাজ করতে হয় তাকে। শীত, গ্রীষ্ম কিংবা বর্ষা—কোনও ঋতুতেই তাঁর পায়ে জুতো দেখা যায় না। এমনকি এই হাড় কাঁপানো শীতেও তিনি খালি পায়েই এসআইআর হেয়ারিংয়ের লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। কনকনে ঠান্ডায় যখন অন্যরা মোটা জুতো, মোজা পরে কাঁপছেন, তখন নিমাই অনায়াসেই খালি পায়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার এই ব্যতিক্রমী জীবনযাপন এলাকায় ব্যাপক কৌতূহল ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নিমাই জানান, ছোটবেলায় তার একটাই সমস্যা ছিল—যেখানেই জুতো খুলতেন, পরে আর তা পরার কথা মনে থাকত না। স্কুলে যাওয়া, মাঠে খেলা কিংবা আত্মীয়ের বাড়ি যাওয়া—প্রায় সর্বত্রই জুতো হারিয়ে ফেলতেন। এর জেরে বাড়িতে বাবা-মায়ের বকাঝকা তো ছিলই, অনেক সময় মারধরও সহ্য করতে হয়েছে। বারবার জুতো হারানোয় পরিবারের উপর বাড়তি চাপ তৈরি হত। শেষ পর্যন্ত কিশোর বয়সেই তিনি কঠোর সিদ্ধান্ত নেন, জুতো পরলে যদি এত সমস্যাই হয়, তবে আর জুতো পরবেন না।
সেই সিদ্ধান্তই ধীরে ধীরে তার জীবনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। খালি পায়ে হাঁটতে হাঁটতে শরীরও যেন তার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে। বিয়ের সময়ও তিনি খালি পায়েই বিয়ে করতে গিয়েছিলেন। বিয়ে করেও ফিরেছিলেন সেভাবেই। বিষয়টি নিয়ে তার পরিবারের কারও কোনও আপত্তি নেই। নিমাইয়ের দুই ভাই সিরিশ পাহান ও বিকাশ পাহান এবং স্ত্রী পারুল মুর্মু—সবাইই জুতো পরেন, কিন্তু নিমাইয়ের এই অভ্যাসকে স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিয়েছেন পরিবারের লোকেরা।
নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়ে নিমাই বলেন, ‘ছোটবেলায় অনেক জুতো হারিয়েছি। বাবা-মায়ের খুব বকুনি আর মার খেতে হয়েছে। তখনই ঠিক করি, আর জুতো পরব না। এখন তো অভ্যেস হয়ে গেছে। গরম হোক বা ঠান্ডা—কোনও কিছুতেই আর তেমন অসুবিধা হয় না।’
স্ত্রী পারুল মুর্মু বলেন, ‘বিয়ের আগেই জেনেছিলাম উনি জুতো পরেন না। প্রথমে বিষয়টা একটু অদ্ভুত লেগেছিল। পরে বুঝেছি, এটাই ওর স্বভাব। এখন আর কোনও সমস্যা মনে হয় না।’
নিমাই পাহানের খালি পায়ে ত্রিশ বছরের এই জীবনযাপন আজ কুমারগঞ্জের উজিরপুর এলাকায় এক ব্যতিক্রমী ও চর্চিত গল্প হিসেবেই পরিচিত হয়ে উঠেছে।
