অনীক চৌধুরী, জলপাইগুড়ি: পয়লা বৈশাখে হালখাতা বা মিষ্টিমুখ ছাড়া যেমন বাঙালি অসম্পূর্ণ, তেমনই প্রতিটি বাড়িতে এদিন একটি করে পঞ্জিকা পৌঁছে যাওয়াই রীতি। মাঝারি মাপের গোলাপি মলাটের ওই বইটির সঙ্গে বাঙালির দিনক্ষণ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নতুন বছরের প্রথম দিনটায় পঞ্জিকার পাতা উলটে বাৎসরিক রাশিফল, পুজোর দিনক্ষণ দেখে নিতে অনেকেই ভালোবাসেন। যদিও সময় বদলেছে। ইন্টারনেটের দুনিয়ায় এখন এক ক্লিকেই সবকিছু দেখে নেওয়া যায়। তাই নতুন প্রজন্মের অনেকের ধারণা, আলাদা করে পঞ্জিকার দরকার কমেছে। তবে মঙ্গলবার জলপাইগুড়ি (Jalpaiguri) শহরের বুকে সেই ধারণার সপক্ষে যুক্তি মিলল না। দিনবাজার, টেম্পল স্ট্রিট, পান্ডাপাড়া সহ বেশ কিছু জায়গার দশকর্মা ভাণ্ডারগুলিতে পঞ্জিকা কিনতে মানুষ ভিড় করলেন। নববর্ষ আসতে অবশ্য কয়েকদিন বাকি। দিনবাজারের একটি দোকানে পঞ্জিকার পাতা ওলটাতে ওলটাতে বছর ষাটের দীপালি রায়ের কথায়, ‘হাতে অ্যানড্রয়েড ফোন থাকলেও পঞ্জিকার জুড়ি মেলা ভার।’
তাঁর পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন শহরের আরেক বাসিন্দা অনীতা বর্মন। তিনি বলেন, ‘মোবাইলে কোনও শুভ অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ দেখে ভরসা পাই না। একবার পঞ্জিকা না দেখা অবধি ঠিক তৃপ্তি বোধ হয় না।’ মাসের কবে একাদশী, দুর্গাপুজোর নির্ঘণ্ট কী, কবে অম্বুবাচি, তিথি অনুযায়ী কোনটা শুভক্ষণ, সমস্ত প্রশ্নের উত্তর পেতে পঞ্জিকাই একমাত্র ভরসা। সঞ্জয় সাহা, তপন সেন, শান্তনু রায়ের মতো শহরের অধিকাংশ দোকানদারেরই বক্তব্য যে পয়লা বৈশাখ আসার আগে থেকেই দোকানে পঞ্জিকার খোঁজ করা শুরু হয়ে গিয়েছে। সঞ্জয় বললেন, ‘এক একটি বান্ডিলে ৩০টি করে পঞ্জিকা থাকে। দশকর্মা ভাণ্ডার থেকে ছোট বইয়ের দোকানদাররা কেউ ২০ বা ৩০টি করে কিনে নিয়ে যান। স্টক শেষ হলে ফের নিয়ে আসতে হয়।’ তাই দোকানদারদের সকলের মতে পঞ্জিকার চাহিদা কোনওদিনই কমবে না।
যদিও আজকাল মোবাইল অ্যাপে পঞ্জিকা দেখা যায়। তবু বাড়িতে একটি পঞ্জিকা থাকলে পূজার্চনায় বেশ সুবিধে হয় বলেই জানান শহরের বধূ সুস্মিতা চক্রবর্তী। তিনি বলেন, ‘মা-বাবার কাছ থেকে আমরা অনেক ধৈর্য নিয়ে পঞ্জিকা দেখা শিখেছিলাম। এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের কাছে তো পঞ্জিকা দেখা শিখতে যাওয়া মানে সময় নষ্ট করা।’ এবিষয়ে পুরোহিত দেবাংশু চক্রবর্তীও পরিষ্কার জানান যে, ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিয়ে, অন্নপ্রাশন, উপনয়নের সময়, তারিখ, তিথি, নক্ষত্র দেখা তিনি একদমই পছন্দ করেন না। তাঁর মতে, ‘পঞ্জিকাই সবচেয়ে ভালো। এর কোনও বিকল্প নেই।’ তাই ডিজিটাল যুগে পুরোনো অনেক কিছুই ব্রাত্য হয়ে যেতে বসলেও নববর্ষের আগে পঞ্জিকার চাহিদা একইরকম থাকবে তা বলাই যায়।
