অরুণ ঝা, ইসলামপুর: দাম্পত্য জীবনের ৫৫টি বসন্ত পার হয়েছে। তবে তাতে কী! বাণী ও বীণার প্রেম আজও অটুট। ভাতের মাড় গালতে না জানা তরুণীর সন্তান কোলে ব্যবসায়ী ও সংসারী হয়ে ওঠার কাহিনী সুপারহিট সিনেমার চিত্রনাট্যকেও অনায়াসে হার মানাবে। স্ত্রীর জন্য সমাজসেবার নেশায় মগ্ন স্বামীর টানও ভালোবাসার বহু না বলা কথা সহজে শেখাতে সক্ষম।
ইসলামপুর (Islampur) শহরের থানা কলোনির বাসিন্দা বছর ৮০-র বাণীপ্রসাদ নাগ ও ৭৪ বছরের বীণাপাণি নাগ ২ মার্চ দাম্পত্য জীবনের ৫৬তম বছরে পা দেবেন। বাণীপ্রসাদ ইসলামপুর হাইস্কুলে পড়াতেন। স্ত্রী পুরোনো হলেও ভালোবাসা আজও সেই প্রথম দিনের মতোই টাটকা। অ্যালবাম বের করে সাদা–কালো একটি ছবি দেখিয়ে বললেন, ‘অষ্টমঙ্গলা করতে গিয়ে তুলেছিলাম।’ হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘বীণার অন্নপ্রাশনের একটি স্মৃতিচিহ্ন আমার কাছে রাখা আছে।’ ৭৪ বছরের পুরোনো কৌটোটি যখন দেখাচ্ছিলেন স্ত্রীর মুখ তখন আক্ষরিক অর্থেই রাঙা। স্বামী বলে চলেন, ‘বীণা একা হাতে অভাবের সংসার, ব্যবসা ও সন্তানদের কীভাবে মানুষ করেছে ওই জানে। আমি কিচ্ছুটি টের পাইনি।’
বীরভূমের তারাপীঠ সংলগ্ন বড়তুরি গ্রামে জন্ম নেওয়া বাণীপ্রসাদ ছোটবেলা থেকেই অধ্যাত্মমনা। মেলায় গেলে কালীমূর্তি কিনতেন। শ্মশানে ঘোরার নেশা আর সমাজসেবার টানে সংসারধর্মের প্রথাগত ব্যাকরণ মেনে চলতে পারেননি। ইসলামপুর শহরের সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির, ইসলামপুর সতী পুকুর শ্মশান, স্টেট ফার্ম কলোনির শ্মশানঘাটের সৌন্দর্যায়নে বাণীর কতটা অবদান তা এই শহর বিলক্ষণ জানে। তৎকালীন পশ্চিম দিনাজপুর জেলার জাগ্রত বোল্লাকালী এলাকা সংলগ্ন তিওর গ্রামে বীণার জন্ম। ১৯৭০ সালে যখন তাঁদের বিয়ে হয়, তখন বাণীপ্রসাদের শিক্ষকতার বেতন ছিল মাত্র ৫০ টাকা। মাটির ঘরে শুরু হওয়া সংসারে অভাব তখন নিত্যসঙ্গী। সমাজসেবার নেশায় মত্ত স্বামী যখন শ্মশানঘাট সাজানো কিংবা আর্তের সেবায় ব্যস্ত থাকতেন, তখন নবপরিণীতাকে একা হাতে সবকিছু সামলাতে হত।
স্মৃতির পাতা ওলটাতে ওলটাতে বাণীপ্রসাদ আবেগঘন হয়ে পড়েন, ‘বীণা ভাতের মাড় গালতে পর্যন্ত জানত না। তবুও নিজের হাতেই সংসারের সমস্ত দায়িত্ব তুলে নিয়েছিল।’ সংসারে একটু সুখের আশায় বাণী বইয়ের দোকান দিয়েছিলেন। বীণা সেটির দায়িত্বও স্বেচ্ছায় নিজের কাঁধে তুলে নেন। গর্বিত স্বামী বলে চলেন, ‘বাপের বাড়ি থেকে পাওয়া এবং আমার অল্প কিছু দেওয়া সোনার গয়না পর্যন্ত বিক্রি করে ওই আজকের সুখের সংসারের ভিত গড়েছে। পোস্ট অফিসের স্মল সেভিংস এজেন্সি নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরেছে। আমার সামাজিক কাজে ও আত্মীয়দের জন্য গয়না বিক্রি করতে গিয়ে একটুও ভাবেনি।’
চার দশক আগে ইসলামপুর থেকে রায়গঞ্জ যাওয়া যে কী কঠিন পরিশ্রমের ছিল তা এই প্রজন্ম বুঝবে না। সেই সময় বীণা একা বইয়ের দোকান সামলেছেন। সন্তান কোলে একা রায়গঞ্জ যাতায়াত করে বই নিয়ে এসেছেন। সঙ্গে সংসারের হেঁশেলও সামলেছেন। বাণী যখন এসমস্ত জানাচ্ছিলেন সেই কথার রেশ ধরেই বীণা বলে উঠলেন, ‘রান্নার তো কিছুই জানতাম না। তুমিই তো সব শিখিয়েছিলে।’
স্ত্রীকে স্বামী নিজের মতো করে উড়তে দিয়েছিলেন। বীণা তাই আজও বইয়ের দোকানে বসেন, বিক্রিবাটার হিসেব রাখেন। অবসরে গান শোনেন। বাণী অবসরে কবিতা লেখেন আর ছাদবাগানে গাছের পরিচর্যা করেন। ছেলে অনির্বাণ, পুত্রবধূ পাপিয়া মিলে বাণী–বীণাকে দারুণভাবে আগলে রাখেন। মেয়ে অনিন্দিতা নিজের সংসারের পাশাপাশি সবসময়ই বাবা–মায়ের খোঁজ রাখেন। নিজের নিয়মেই ভালোবাসা বেড়ে চলে।
