সমীর দাস, জয়গাঁ: ‘পাড়া’ বলতে সাধারণত কোনও শহর বা বড় জনবসতির নির্দিষ্ট কোনও এলাকাকে বোঝায়। তবে চা বলয় অধ্যুষিত ডুয়ার্সে (Dooars Information) একাধিক জনপদের নামের সঙ্গে ‘পাড়া’ শব্দটি যুক্ত রয়েছে। ডুয়ার্সের যেসব এলাকার নামের সঙ্গে ‘পাড়া’ শব্দটি যুক্ত রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম জয়গাঁর দলসিংপাড়া (Historical past of Dalsingpara)। ৪৮ নম্বর এশিয়ান হাইওয়ে হয়ে জয়গাঁ তথা ভুটান যাওয়ার পথে জয়গাঁ থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার আগে পড়বে দলসিংপাড়া। সেখানে রয়েছে দলসিংপাড়া চা বাগান। অনেকে মনে করেন দলসিংপাড়া চা বাগান থেকেই জনবসতির নাম হয়েছে দলসিংপাড়া। তবে দলসিংপাড়া চা বাগান প্রতিষ্ঠার বহু বছর আগেই দলসিংপাড়া জনবসতি গড়ে উঠেছিল বলে বিভিন্ন তথ্য ঘেঁটে জানা গিয়েছে। দলসিংপাড়া যে একজন শ্রমিক সর্দারের নামেই স্থাপিত হয়েছিল সেই বিষয়ে নিশ্চিত অনেকেই। ওই সর্দারের নাম ছিল দলসিং মঙ্গর। তিনি নেপালি মঙ্গর জনজাতির মানুষ ছিলেন। আবার দল বা গোষ্ঠীকে নেতৃত্ব দিয়ে তাঁর নাম দলসিং হয়েছিল বলেও মনে করেন অনেকে।
চা বাগান আর বনবস্তিতে ঘেরা ওই জনবসতি ভুটানের খুব কাছে অবস্থিত। ২০২৪ সালের ভোটার তালিকায় দলসিংপাড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের জনসংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার। তবে সমগ্র এলাকা মিলে জনসংখ্যা আরও কিছুটা বেশি। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী দলসিংপাড়া জনবসতি গড়ে উঠেছিল ১৮১৬ সালে। তার বহু বছর পর ব্রিটিশ শাসকরা ওই এলাকায় চা বাগান তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সেই হিসেবে দলসিংপাড়া জনবসতি স্থাপিত হয়েছিল প্রায় ২০০ বছর আগে। দলসিংপাড়া চা বাগানের অবসরপ্রাপ্ত কর্মী সহদেব শিবা বলেন, ‘দলসিংপাড়া, বীরপাড়ার দলমোড় ও দলগাঁও চা বাগানগুলো একসময় একই মালিকানাধীন ছিল। কোনও প্রামাণ্য নথি না থাকলেও আমাদের ধারণা, দলসিং মঙ্গরের নাম থেকেই তিনটি চা বাগানের নামকরণ করা হয়েছিল।’ দলসিংপাড়া চা বাগানের কর্মী মহম্মদ সাজু বলেন, ‘ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে দলসিং মঙ্গর একজন বিখ্যাত মানুষ ছিলেন। সেই সময় এলাকায় কোনও চা বাগান ছিল না। তবে জনবসতির নাম অনুসারে পরবর্তীতে চা বাগানের নাম রাখা হয়েছিল দলসিংপাড়া।’
চা বাগান বনিকসভা আইটিপিএ’র ডুয়ার্স শাখার সম্পাদক রামঅবতার শর্মা জানিয়েছেন, ১৮৯৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্রশাসনের তরফে ৫ জন ব্রিটিশ সাহেব- এফজি ক্লার্ক, এফএইচ বে, জি হ্যান্ডারসন, জিএস ফ্রেসার ও এএইচ অ্যাব্রডের নামে ওই এলাকায় চা বাগান তৈরির জন্য প্রচুর জমির লিজ ইস্যু করা হয়েছিল। তার বহু বছর আগে ওই এলাকাটি ভুটানের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ভুটানের সেসময়ের রাজা নেপাল থেকে দেশের উন্নয়নের কাজের জন্য প্রচুর শ্রমিক নিয়ে এসেছিলেন। সেই শ্রমিকদের সর্দার অথবা মুখিয়া ছিলেন দলসিং মঙ্গর। পরবর্তীতে তিনি ওই এলাকায় ছোট জনবসতি গড়ে তুলেছিলেন বলেই এলাকার নাম হয়েছিল দলসিংপাড়া। তাঁর কথায়, ‘১৯১১ সালে জলপাইগুড়ি জেলা গঠনের পর জনগণনার তথ্যে উল্লেখ রয়েছে দলসিংপাড়াতে মঙ্গর জনজাতির মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ছিল। এখনও কালচিনি ব্লকের মধ্যে মঙ্গর জনজাতির বেশিরভাগ মানুষ দলসিংপাড়া এলাকায় বসবাস করেন।’ তাঁর বক্তব্য, মঙ্গর জনজাতির বিশিষ্ট ব্যক্তি ডাঃ জীবন রানা তাঁর লেখা বইয়ে দলসিং মঙ্গরের নাম উল্লেখ করেছেন। তিনি নিজেও একাধিক পত্রিকায় দলসিংপাড়া নামের ইতিহাস প্রসঙ্গে লিখেছেন।
