মানুষের মতো জনপদেরও নাম থাকে। সেই জনপদে প্রাণ সঞ্চার করে কোনও এক জনজীবন। তা আজ স্থানীয় প্রবীণদের স্মৃতির পটে জ্বলজ্বল করলেও, ফিকে হয়েছে বাস্তবের মাটিতে। তবুও সেই রেশ থেকে তৈরি হওয়া নাম আজও ছাড়েনি সেখানকার মানুষদের। দিয়েছে এক বসতির পরিচয়।
সুভাষ বর্মন, ফালাকাটা: ‘কেমন বাঁশি বাজায় শোনো, মাঠেতে রাখাল, তার সুরে বুঝি জাদু আছে, মন হল মাতাল’—সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘গুপী বাঘা ফিরে এলো’তে কানু নামের সেই রাখাল বালক এই গানের মাধ্যমে মন জয় করেছিল সবার। আজও যাঁদের কাছে বিলুপ্তির পথে ধাবিত এই ‘রাখাল’ শব্দটির ছবি তৈরি হয়নি, তাঁরাও এই গানের দৃশ্যপট দেখলে, নিদেনপক্ষে গানটি শুনলে অনায়াসে ছবি এঁকে নিতে পারবেন, সূর্যাস্তের প্রান্তরে পেলব আরামের দূত হিসেবে বাঁশি বাজানো সেই রাখালের।
সময়টা দুশো বছর আগের। বর্তমান ফালাকাটা (Falakata)-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের একটি বড় মৌজার বাড়িতে বাড়িতে ছিল গবাদিপশু। তাই বেশিরভাগ সময় তাদের প্রাণোচ্ছল সঙ্গী ছিল রাখালের দল। একদিকে চরতোর্ষা নদী। অন্যদিকে বুড়িতোর্ষা। এই দুই নদীর চরেই গোরু চরাত রাখালরা। হাতে থাকত বাঁশি। শ্রীকৃষ্ণের আরেক নাম বংশীধর। রাখালের দল আপন করে নিত সেই বংশীধরের আরাধনাকে। সেই থেকেই ফালাকাটার এই মৌজার নাম হয়ে যায় বংশীধরপুর (Historical past of Banshidharpur)। আবার প্রচলিত আছে আরেকটি জনশ্রুতিও—ফালাকাটারই এক বহু পুরোনো বাসিন্দা বংশীধর দুবের নাকি অনেক জমি ছিল। তা থেকেই এই অঞ্চলের নাম হয় বংশীধরপুর। তবে এই দুই নামকরণের নেপথ্যেই কোনও লিখিত নথি নেই৷ মুখে মুখেই এই দুই জনশ্রুতি গ্রামের প্রবীণদের স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে।
ফালাকাটা-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের একটি বড় মৌজা হল বংশীধরপুর। এখানে দুজন পঞ্চায়েত সদস্য রয়েছেন। বুথের সংখ্যাও দুই। এই গ্রামের উত্তরদিকেই জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান। পূর্বদিকে বুড়িতোর্ষা নদী৷ আর পশ্চিমে চরতোর্ষা। এমন জঙ্গল ও নদীবেষ্টিত এলাকায় কয়েকশো বছর ধরে বসবাস নেপালি সম্প্রদায়ের মানুষের। এখনও নেপালিপাড়া রয়েছে এই জনপদে। এছাড়াও আছে রাজবংশী, আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ। দেশভাগের পর ওপার বাংলা থেকে আরও অনেক বাঙালি এই গ্রামে চলে আসে। গড়ে ওঠে ঘন জনবসতি। তবে এখানকার আদি বাসিন্দা নেপালি, রাজবংশী ও আদিবাসীরাই।
গ্রামের প্রবীণ কেশব উপাধ্যায়ের কথায়, ‘বংশীধরপুর নামকরণের কোনও লিখিত নথি নেই। তবে ঠাকুরদা, বাবাদের কাছে শুনেছি দুশো বছর আগে গ্রামে রাখালরা বাঁশি বাজাতেন। গোরু চরাতেন। তাঁরা বংশীধর অর্থাৎ শ্রী কৃষ্ণের পুজো করতেন। সেই থেকেই গ্রামের নাম হয়ে যায় বংশীধরপুর।’ আরেক প্রবীণ প্রভাত অধিকারীর বক্তব্য, ‘রাখালদের বংশীধরপুজো একটি কারণ অবশ্যই। এছাড়াও ফালাকাটার বংশীধর দুবের এখানে দেড়শো বিঘার মতো জমি ছিল। সেই ব্যক্তির নাম থেকেও গ্রামের নাম বংশীধরপুর হতে পারে।’
