হায়দরাবাদ: ভারতের বুক থেকে বামপন্থী চরমপন্থা বা মাওবাদী আন্দোলন সম্পূর্ণ মুছে ফেলার লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা আগামী ৩১ মার্চের যে চরমসীমা বা ‘ডেডলাইন’ বেঁধে দিয়েছিলেন, তার আগেই ঐতিহাসিক সাফল্য পেলেন গোয়েন্দারা। তেলেঙ্গানায় ২০ জন সশস্ত্র অনুগামী-সহ পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন সিপিআই (মাওবাদী)-এর সর্বোচ্চ স্তরের নেতা থিপ্পিরি তিরুপতি ওরফে দেবুজি (High Maoist chief give up)। উচ্চপদস্থ গোয়েন্দা সূত্রের খবর, মাওবাদী দলটির ইতিহাসে এত বড় মাপের কোনও নেতার স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণের ঘটনা এই প্রথম। আগামী দু-একদিনের মধ্যেই তাঁর আত্মসমর্পণের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে।
সংগঠনের অন্দরে এবং পুলিশের খাতায় দেবুজি (Thippiri Tirupathi alias Devuji) একটি অত্যন্ত পরিচিত ও ভয়ংকর নাম। তেলেঙ্গানার জগতিয়ালের বাসিন্দা, ৬২ বছর বয়সী এই নেতার মাথার দাম ছিল এক কোটি টাকা। গত প্রায় দুই দশক ধরে তিনি নিষিদ্ধ এই সংগঠনের সামরিক শাখা বা ‘সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশন’ (Central Navy Fee)-এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব সামলেছেন। গত বছর মে মাসে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে মাওবাদীদের সাধারণ সম্পাদক নাম্বালা কেশব রাও ওরফে বাসবরাজু (CPI Maoist common secretary) নিহত হন। এরপর দেবুজিকেই দলের সর্বোচ্চ পদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বলে মনে করেন গোয়েন্দারা। আশির দশকে ‘পিপলস ওয়ার গ্রুপ’-এর ছাত্র সংগঠনের হাত ধরে চরমপন্থী রাজনীতিতে প্রবেশ করা এই দলিত নেতার প্রান্তিক আদিবাসী ও ক্যাডারদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ছিল।
কীভাবে ভাঙল মাওবাদীদের এই দুর্ভেদ্য দুর্গ? গোয়েন্দা তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া ‘অপারেশন কগার’ (Operation Kagar)-এর সাঁড়াশি আক্রমণেই কোণঠাসা হয়ে পড়ে লাল ফৌজের শীর্ষ নেতৃত্ব। ছত্তিশগড় ও অন্যান্য রাজ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর লাগাতার অভিযানে গত দুই বছরে বাসবরাজু-সহ অন্তত ৫২০ জন মাওবাদীর মৃত্যু হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শুরুতে মাওবাদীদের অত্যাধুনিক অস্ত্রধারী ক্যাডারের সংখ্যা ছিল ২২০০, যা বর্তমানে তলানিতে ঠেকে মাত্র ১৮০ জনে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি, ৭০০০ জনের বিশাল মিলিশিয়া বাহিনী কমে হয়েছে মাত্র ১০০০। অর্থাৎ, সংগঠনটি তার মূল শক্তির এক-দশমাংশে এসে ঠেকেছে।
দলের অন্দরের আদর্শগত সংঘাতও এই পতনের অন্যতম কারণ। একাংশ চাইছিল ক্যাডারদের প্রাণ বাঁচাতে আত্মসমর্পণ করতে, অন্যদিকে দেবুজির গোষ্ঠীর জেদ ছিল জঙ্গলেই আজীবন লড়াই চালিয়ে যাওয়ার। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতির চাপে, লাগাতার এনকাউন্টার এবং ক্যাডারদের ক্রমাগত মৃত্যুর জেরে খোদ দেবুজিই এবার অস্ত্র সমর্পণের পথ বেছে নিলেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা ভারতের বুকে দীর্ঘ কয়েক দশকের মাওবাদী সন্ত্রাসের কফিনে কার্যত শেষ পেরেকটি পুঁতে দিল।
