শুভদীপ শর্মা, লাটাগুড়ি: দুই দশকের স্মৃতি চিরতরে মুছে গেল গরুমারায় (Gorumara)। আর রইল না আকাশছোঁয়া গাছবাড়ি। শাল গাছের ডালপালার মাঝে তৈরি কাঠের বাড়িটি একসময় ডুয়ার্সপ্রেমী দেশি–বিদেশি পর্যটকদের কাছে ছিল স্বপ্নের গন্তব্য। প্রায় ৩০ ফুট উঁচুতে জঙ্গলে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছবাড়ি ঘিরে ছিল কৌতূহল, রোমাঞ্চ ছিল ভরপুর। ২০০৫ সালে বন দপ্তরের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই আকর্ষণ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দীর্ঘদিন ধরেই পর্যটকদের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। অবশেষে গোটা কাঠামোটিকেই সম্প্রতি ভেঙে ফেলা হল। তার ঠাঁই হল ইতিহাসের পাতায়। এনিয়ে গরুমারা বন্যপ্রাণ বিভাগের সাউথের রেঞ্জ অফিসার বিশ্বজ্যোতি দে বলেন, ‘ওই গাছবাড়ির কাঠামোর বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়ছিল। যার জেরে দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছিল। আমাদের কাছে পর্যটকদের নিরাপত্তাই আসল। তাই এটি ভেঙে ফেলা হল।’ তবে ভবিষ্যতে নতুন করে গাছবাড়ি তৈরি করা হবে কি না সে বিষয়ে এখনও কোনও স্পষ্ট উত্তর মেলেনি।
গন্ডার, হাতি, হরিণ সহ বন্যপ্রাণ এবং নানা প্রজাতির পাখি দেখার লোভে পর্যটকরা গরুমারা জাতীয় উদ্যানে ভিড় জমান। জঙ্গলের নিসর্গ উপভোগের জন্যই পর্যটকদের থাকার বিশেষ ব্যবস্থা করে বন দপ্তর গাছবাড়িটি তৈরি করে। চালু থাকা অবস্থায় দুজন পর্যটকের থাকা-খাওয়ার জন্য প্রায় ৩ হাজার ৬০০ টাকা খরচ দিতে হত। স্থানীয়দের মতে, এটি শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, বরং এলাকার গর্ব ও পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। ২০১২ সালের ১২ জুলাই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেখানে এক রাত কাটানোর পর গাছবাড়িকে ঘিরে কৌতূহল আরও বেড়ে যায়। বুকিং পেতে হিমসিম খেতে হত পর্যটকদের। সৌরবিদ্যুৎচালিত আলো, নিরিবিলিতে থাকার ব্যবস্থা, আলাদা টয়লেট সহ সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল কাছ থেকে হাতিদের স্নানের দৃশ্য উপভোগ করা। এছাড়া জঙ্গলের নির্জনতায় পাখির ডাক, দূরে হাতির চলাফেরা আর উঁচু গাছের ডালে বসে রাত কাটানোর রোমাঞ্চ, সবমিলিয়ে গাছবাড়িতে রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা ছিল অনন্য।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জীর্ণ হয়ে পড়ে বাড়ির কাঠামোটি। ধীরে ধীরে পচে যেতে থাকে কাঠ, দুর্বল হয় সিঁড়ি, ছাদে ফাটল দেখা দেয়। ঝুঁকি বাড়তে থাকায় কয়েক বছর আগে পর্যটকদের জন্য গাছবাড়ি বন্ধ করে দেওয়া হয়। স্থানীয় বাসিন্দা থেকে পর্যটন ব্যবসায়ীদের একাংশ বাড়িটি সংস্কার করে পুনরায় চালুর দাবি তুললেও শেষপর্যন্ত তা আর হয়নি। এই সিদ্ধান্তে ক্ষোভ ছড়িয়েছে পর্যটন মহলে। লাটাগুড়ি রিসর্ট ওনার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক দিব্যেন্দু দেব বলেন, ‘এটি শুধু একটি থাকার জায়গা নয়, ডুয়ার্স পর্যটনের এক পরিচিত মুখ ছিল। আমরা আশা করেছিলাম নতুনভাবে সাজিয়ে আবার এটি চালু করা হবে কিন্তু সেটি আর হল না।’ পর্যটন ব্যবসায়ী উজ্জ্বল শীলের অভিযোগ, হঠাৎ করে বাড়িটি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হল, তা স্পষ্ট নয়। গাছবাড়ির পাশে ছ’টি কটেজে পর্যটকদের থাকার সুযোগ রয়েছে। তবুও রোমাঞ্চপ্রিয় পর্যটকদের কাছে গাছবাড়ির অভিজ্ঞতা ভোলার নয়।
